অতিগুরুত্বপূর্ণ কৃষি খাত নিয়ে ভাবতে হবে

—মো. আলী আশরাফ খান

সরকার বদল হয়, হয় ক্ষমতার বদল। ব্যক্তি, এমপি-মন্ত্রী পদপদবী বদলায়, আইনেরও বদল হয়। নিজেদের স্বার্থে নতুন আইনকানুন করা হয়, করা হয় সংযোজন-বিয়োজন। আইনের দোহাই দিয়ে জনগণের বারোটা বাজানো হয় কিন্তু নিজেদের স্বার্থহানী হয় এমন আইনের প্রয়োগ হয় না, প্রয়োগ করে না সরকার। দেশের সব খাত থেকেই (জোর যার মুল্লুক তার) সরকার তথা সরকার দলীয়রা অনৈতিকভাবে ফায়দা লুটায়। শিক্ষা. বাসস্থান, চিকিৎসাসহ যতসব গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় দিক রয়েছে সব দিক নিয়েই মহাবাণিজ্য চালায় ওইসব কথিত রাজনীতিসেবীরা। সাধারণের রক্ত চোষে টাকার পাহাড় গড়ে ওরা। জনগণের সমস্যার কথা শোনার কেউ নেই। কথা বলবেন তো চাই টাকা! পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, শিক্ষা, চিকিৎসা, রাস্তা-ঘাট যেকোন সেবা চাইতে গেলেই টাকা আর টাকার খেলা। এককথায়, ঘুষ ছাড়া এদেশের কোথাও কোন সেবা-কাজ পাওয়া যেন অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। সরকারের সাধারণ কর্মচারি থেকে শুরু করে এমপি-মন্ত্রীদেরও পোষানো কঠিন হয় টাকা দিয়ে। তাদের চাহিদা এতই বেশি যে, যত পাই আরো চাই আরো চাই! তাদের এ অবস্থার ফলে আজ জাতি দিশেহারা হয়ে পড়েছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আমজনতার। তারপরেও তাদের দৌঁড় থেমে নেই।
অথচ, জাতি বহুবিধ সমস্যায় বিপর্যস্ত। সমস্যার অন্ত নেই। একের পর এক ভয়াবহ সমস্যায় পতিত হয়ে দিগি¦দিক হারিয়ে আজ দেশ বেসামাল। নিগুঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে এ জাতি চরম এক কঠিন অবস্থার সম্মুখীন সামগ্রিকজীবনে। এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণের সকল পথই যেন ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানে কেউ এগিয়েও আসছে না। সিংহভাগ সাধারণ ছোটোখাটো বিষয় এবং বেফাঁসমার্কা কথাবার্তা নিয়ে মাথা ঘামাতে ঘামাতেই দীর্ঘ সময় পার করছে দেশের নেতা-নেত্রীরা। অতিগুরুত্বপূর্ণ যেসব বিষয় রয়েছে জাতির অস্তীত্বকেজুড়ে, তা নিয়ে ভাবার কিংবা জাতীয়ভাবে ঐক্যমতেরভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কোন প্রয়োজনই মনে করছেন না তারা। তাদের চাই ক্ষমতা আর ক্ষমতা! দেশের এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা জাতীয়জীবনে মহাবিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে-এটা কি দেশকর্ণধার ও তথাকথিত সচেতনজনরা ভাবছেন?
এসব বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দল না ভাবলেও প্রত্যেক দেশপ্রেমিকদের ভাবতে হবে। বুঝতে হবে শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, বস্ত্র ও বিনোদেনের মত প্রয়োজনীয় দিকগুলোর জোগানদাতা অতিগুরুত্বপূর্ণ কৃষিখাতকে যেকোন মুল্যে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। কৃষিখাতকে রক্ষা না করতে পারলে আমাদের অস্তিত্ব¡ বিলীন হয়ে যাবে তা বুঝতে হবে। কৃষিখাত যে আমাদের বেঁচে থাকার জন্য কতটা গুরুত্ব বহন করে তা সাধারণ মানুষদের বোঝাতে না পারলে মহাসর্বনাশ আসন্ন তা বুঝতে হবে-বোঝাতে হবে। সময় ও চাহিদার প্রয়োজনে আমাদের পরিবর্তন স্বাভাবিক। কিন্তু দেশে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ তাতে মনে হচ্ছে, স্বল্পসময়েই আমাদের মহাসর্বনাশ হয়ে যাবে। কোনো নিয়ম-নীতির ধারধারে না কেউ। কেউ কাউকে তোয়াক্কা না করেই ভরাট করে ফেলছে কৃষিজমি, পুকুর, খাল-বিল ও ডোবা। দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে দেশের অমূল্য সম্পদ নদ-নদীসহ বহু জলাশয়। অপরিকল্পিতভাবে এসব ভরাট হয়ে এখন মহাসমারোহে যত্রতত্র গড়ে ওঠছে রাস্তাঘাট, সরকার ও বিরোধী দলীয় কার্যালয়, ঘর-বাড়ি, বিনোদনপার্ক, কল-কারখানা, দোকানপাট, বিলাসবহুল মার্কেট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
কুমিল্লা দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুরে আমার বসবাস। এ এলাকায় মহাধুমধামে একশ্রেণীর অতি মুনাফালোভী মানুষ অনৈতিকভাবে এবং কোন নীয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বহু কৃষিজমি, পুকুর, খাল-বিল, ডোবা, জলাশয় ও গোমতী-কালাডুমুর নদীর বিভিন্ন অংশ বালি দিয়ে ভরাট করে ফেলছে। এসব ভরাটকৃত জায়গায় রাতারাতি আলিশান অট্টালিকা গড়ে ওঠছে। এমনও দেখা গেছে, ধনাঢ্যরা ভূমিহীন পরিচয়ে সরকারি জায়গা লিজ নিয়ে ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে-হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা, চলছে পূর্বেকার ন্যায় সরকারি নেতা-কর্মীদের মধ্যে দখলদারিত্বের মহোৎসব। পয়:নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও রাখা হয়নি-হচ্ছে না এসব স্থাপনাগুলোতে। যার ফলে একটুআধটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার কঠিন মাশুল দিতে হচ্ছে কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র গৌরীপুর বাজারের ব্যবসায়ীদের এবং পৌরসভাসহ স্থানীয় অনেক পরিবারকে। এসব সমস্যা সমাধানে স্থানীয়রা প্রশাসনের বরাবরে অভিযোগ করলেও কোনো রকম উদ্যোগ নেয় না প্রশাসন। বরং প্রশাসন নাকি টাকা খেয়ে চুপ থাকে এবং দেখেও না দেখার ভাণ করে, এমন মন্তব্য অনেকের। শুধু কুমিল্লার দাউদকান্দি তথা গৌরীপুরেই নয়, দেশের প্রায়সব জায়গায়ই এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এখন। অনেকেই মনে করেন, বেড়ায় যখন ক্ষেত খায়, তখন আর কি বা করার থাকে? তারপরেও কথা থাকে, এই কৃষিখাত ধ্বংস হওয়া মানে মহাবিপর্যয় সৃষ্টি হওয়া। এই গুরুত্বপূর্ণ খাতকে রক্ষা করতে হলে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে; সরকারকেও চোখ খুলতে হবে এবং কঠোর ও কঠিন নীতি অবলম্বণের মাধ্যমে দেশের সর্বত্র নজর দিতে হবে।
বলাবাহুল্য যে, গত দুই যুগে নানা কারণে দেশে কৃষিজমির পরিমাণ কমে গেছে প্রায় ৬০ লাখ একর। এসব ভরাটকৃত জমিগুলোয় অপরিকল্পিতভাবে বিস্তৃৃতি ঘটেছে নগরায়ন, জনবসতি এবং শিল্পায়নের। এতে কৃষিজমির ওপর যেমন প্রভাব পড়ছে তেমনি কৃষকরাও সব ধরনের অধিকার হারিয়ে ফেলছেন। শুধু দেশের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় পর্যটন ও হোটেল ব্যবসার জন্যই নয়, দেশের যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মত বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানি, রিয়েল এস্টেট ও ধনাঢ্য ব্যক্তি এবং বেশ কিছু সিন্ডিকেট স্ব-স্ব উদ্যোগে জমি, পুকুর, খাল-বিল-ডোবা অধিক দামে ক্রয় করে ভরাটের মধ্যদিয়ে মিল-ফ্যাক্টরি, বিলাসবহুল মার্কেট, হোটেল-মোটেল, সিএনজি-তেলের পাম্প ও বাড়ি-ঘর তৈরিসহ নিজেদের দখলে নিয়ে নিচ্ছে অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন স্থাপনা নিমার্ণ করে। তারা বিভিন্ন ছলচাতুরীর মাধ্যমে ১ টাকার সম্পদ ৫ টাকায় বা কখনো কখনো বিভিন্ন ভয়-ভীতি দেখিয়ে সম্পদ ক্রয় করে নিচ্ছে এবং তা ভরাট করে বেশি দামে বিক্রি করছে। শুধু তাই নয়, সুযোগ বোঝে এসব সম্পদ অধিক মূল্যে প্লট কিংবা নিজেদের খেয়ালখুশী মত চড়া দামে বিক্রি করছেন এসব অতিলোভী ব্যবসায়ীরা। এভাবেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেদের শেষ সম্বল জমি, পুকুর-ডোবা, জলাশয় এমনকি বাড়ি-ঘরের পাশের জায়গাটিও বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এতে করে যেমন কমছে কৃষিজমি, পুকুর, ডোবা ও জলাশয় তেমনি সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, পরিবেশ হচ্ছে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে এবং পাশাপশি জায়গার মালিকরাও সহায়-সম্বল হারিয়ে নি:স্ব হচ্ছেন।
এক গবেষণার তথ্য থেকে জানা যায়, দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫০ হেক্টর শুধু কৃষিজমি চলে যাচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে, দ্রুত সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে দেশের কৃষিখাত। এছাড়াও দেশের কিছু ভূমিখেকো প্রভাবশালী ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান ফসল ফলানোর নামে এবং হাউজিং ব্যবসা ও ল্যান্ড বিজনেসের নামে চুক্তিভিত্তিক গ্রামের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সব কৃষিজমি একেবারেই কিনে ফেলছেন। আর এভাবে কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। সাধারণদের ফাঁদে ফেলে বিভিন্নভাবে মালিকানা বদল হওয়াতে কৃষিজমি কমে যাওয়ার পাশাপাশি জমির ওপর কৃষকের সব ধরনের অধিকার বিপন্ন হচ্ছে। যদিও কৃষিজমি রক্ষা ও ভূমির যথেচ্ছ ব্যবহার রোধে ভূমি মন্ত্রণালয় সারাদেশে ল্যান্ড জোনিং কর্মসূচী নিয়েছেন কিন্ত তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করছে না সরকার নিজেদের লাভেই। এভাবেই স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির কালোছায়ায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিখাত। অথচ এই জমি থেকেই খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এমনকি জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজনীয় উপাদানের সব চাহিদাই আমরা পেয়ে থাকি। আয়তনে ছোট আমাদের এই দেশের মতো জনবহুল দেশে ভূমির গুরুত্ব যে কতটা তা আর বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই। সুতরাং সময় থাকতে এ অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে সকলকে ভাবতে হবে, সর্বোপরি ভাবতে হবে সরকারকে।

=======================
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমি¬ল্লা।
মুঠোফোন:০১৮১৬ ২৫৯৫৩২

Check Also

সভাপতি শাকিব খান ও সম্পাদক অমিত হাসান

বিনোদন ডেস্ক :– বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন দ্বিতীয়বারের মত সভাপতি পদে বিজয়ী হয়েছেন শাকিব ...

Leave a Reply