এক বৃদ্ধের আত্মকাহিনী

—–রাশিদা আক্তার টম্পী

গ্রামের নাম পাড়াতলী। এ গ্রামে থাকে আমার ছোট এক ফুফু। দিনটি ছিল ইংরেজি সনের ০২/০৩/২০১২ তারিখ, আমি আমার ফুফু বাড়িতে যাচ্ছিলাম। গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা রাস্তা হেটে যেতে হয়। কিছুটা রাস্তা হাটার পর পাশের একটি বাড়ির দিকে আমার নজর পড়ল। বাড়িটাতে একটি বৃদ্ধ লোক বসে চাটাই বুনছে। তখন ঐ খানে আমি বেশকিছুক্ষন দাড়াই। আরও কিছুটা পথ হেটে চলে গেলাম ফুফুর বাড়ি। ফুফুর বাড়িতে যাওয়ার পর হঠাৎ মনে পড়ল সেই বৃদ্ধের কথা, কেন তিনি চাটাই বুনেন? এ নিয়ে নানান প্রশ্ন জাগতে শুরু করল আমার মনে। একবার মনে হলো হয়ত চাটাই বুনাটা বৃদ্ধের একটি শখ। কিন্তুু এ উত্তরটা কিছুতেই আমার কাছে সত্যি বলে মনে হচ্ছিল না। আসলেই কি শখ বলে তিনি চাটাই বুনেন নাকি অন্য কিছু? এ প্রশ্নের উত্তরটা জানতে আমার অনেক ইচ্ছে করছিল। তাই ফুফুকে বললাম, আমি একটু সামনে থেকে ঘুরে আসছি। ফুফু বলল-এই মাত্র এলি এখন কোথায় যাবি আর তাছাড়া তুই তো এ গ্রামের কিছুই ভালো করে চিনিস না। ফুফু আমি একটু পড়েই এসে পরব। বলেই হাটতে হাটতে গেলাম সেই বৃদ্ধের বাড়ি। গিয়ে দেখি বৃদ্ধ এখনো চাটি বুনছে। তারপর বৃদ্ধের সামনে গেলাম, তাকে সালাম দিলাম। বৃদ্ধা সালামের উত্তর দিয়ে বলল কে তুমি? আমি বললাম পাশের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। তারপর বৃদ্ধা একটা পিড়ি দিয়ে বলল মা বস। তখন আমি বৃদ্ধাকে জিজ্ঞাস করলাম, আচ্ছা আপনি এ বৃদ্ধ বয়সে চাটি বুনেন কেন? বৃদ্ধ একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল এমনি! আমার চাটি বুনতে ভালোলাগে তাই চাটি বুনি। কিন্তুু বৃদ্ধের দীর্ঘ নিঃশ্বাসের পেছনে লুকিয়ে থাকা একটি কষ্ট দেখতে পাই। তাই বৃদ্ধাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম সত্য করে বলুন না আপনি চাটি বুনেন কেন? ভালোলাগে বলেই কি চাটি বুনেন নাকি অন্য কিছু? বৃদ্ধ বলল তুমি এতো কিছু শুনে কি করবে? এমনিতেই শুনতে চাচ্ছিলাম । প্লীজ বলুন । বৃদ্ধ তখন বলল শোন তাহলে আমার দুই চেলে এক মেয়ে। আমি কৃষিকাজ করে আমার ছেলেমেয়ের লেখাপড়া করিয়েছি। সংসারে যতই অভাব হক না কেন আমার ছেলেমেয়ের লেখাপড়া আমি পেছ পা হইনি। আমার মেয়েটি যখন মেট্রিক পাস করেছে তাকে বিয়ে দিয়ে দেই। আর ছেলেদের অনেক কষ্ট করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করি। আমার বড় ছেলে যখন চাকরি পেয়েছে তখন সে ঢাকায় চলে গেছে। চাকরি পেয়ে প্রথম-প্রথম আমাদের জন্য গ্রামে টাকা পাঠাতো। তারপর বিয়ে করে নিজের পছন্দে। বিয়ের ব্যাপারে আমাদেরকে জানানো তো দুরের কথা বিয়েতে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেনি। বিয়ের পর সে কিছুদিন আমাদেরকে টাকা দিয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে এক সময় আমাদের টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিল। বড় ছেলের এ অবস্থা দেখে ছোট ছেলের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লাম। ছোট ছেলেকে নিয়ে কিছুদিন ভালই দিন কাটালাম, কিন্তুু সুখ যে কপালে সয় না। ছোট ছেলে ও চাকরি পেয়ে চলে গেল ঢাকা শহরে। ঢাকা যেয়ে বলল আমাদের কিছু দিনের মধ্যে ঢাকা নিয়ে যাবে। তারপর গ্রামেই বিয়ে হল ছোট ছেলের। কিছু দিন পর সেও বউ নিয়ে ঢাকা চলে গেল। ঢাকা গিয়ে বলল বাবা ঢাকা শহরের পরিবেশ তেমন ভালো নয়, তোমরা এখানে এসে থাকতে পারবে না। কিন্তুু হঠাৎ একদিন আমার বউও আমাকে ছেড়ে চলে যায়, না ফেরার দেশে। আমার কোনো ছেলেই আমাকে এখন আর টাকা-পয়সা দেয় না। আমি এখন পড়ে থাকি আবর্জনার মতো। কেউ আমার কোনো খোঁজ-খবর নেয় না। ছেলেরা এখন বড় হয়ে গেছে তারা এখন আর বাবার প্রয়োজন বোধ মনে করে না। তাদের বউ-ই এখন সব। ছেলেদের এই নির্মম আঘাতে এখন আমি মৃত্যুর কামনা-ই সৃষ্টি কর্তার নিকট প্রতি মুহুর্তে করি। যতদিন বেঁচে থাকি কিছু না কিছু খেয়েতো বাচঁতে হবে, তাই বাধ্য হয়ে চাটি বুনা শুরু করলাম। বৃদ্ধের এ করুন কাহিনী শুনে আমার চোখের জলকে আর থামাতে পারলাম না। এক সময় দেখলাম বৃদ্ধের চোখ বেয়ে জল পড়ছে। কিন্তুু এ-তো জল নয়, যেন কষ্টের নদী থেকে বয়ে আসা রক্তের ঢেউ। সকলের কাছে আমার একটি-ই প্রশ্ন এরই নাম কি সমাজ? এরই নাম কি নৈতিকতা?

========================
লেখক-রাশিদা আক্তার টম্পী
শ্রেণী-দ্বাদশ, বিভাগ-ব্যবসায়ে শিক্ষা
শিক্ষাবর্ষ:-২০১২-১৩
দেবিদ্বার আলহাজ্ব জোবেদা খাতুন মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply