অশ্রুসিক্ত পিতা বুক চাপড়ায়! —-মো. আলী আশরাফ খান

শেষ পর্যন্ত ছেলেটার অবস্থাও তাই হলো। যেমনটি আশঙ্কা করেছিলেন তাদের আত্মীয়-স্বজন। হবিউল্লাহও এমনই দু’টি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটিয়ে যারপরনাই ব্যথিত করেছিলেন গোটা সরকার পরিবারকে।
হবিউল্লাহ তার সন্তানকে এসএসসি পাশ করার পর উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্যে শহরের একটি ভালো কলেজে ভর্তি করেছিলেন। টাকা পয়সার কোনো কমতি ছিল না ছেলের। যখন যা চেয়েছে-কোনো আবদারে না শব্দটি পর্যস্ত করেননি তার বাবা। সৎ মাকে না জানিয়ে কত টাকা যে তিনি ছেলেকে দিয়েছেন, এর হিসেব মেলানো বেশ কঠিন। বাবা চেয়েছেন, ছেলে যেন মায়ের অভাব বোধ না করে। টাকা পয়সা যাই লাগুক ছেলে খুশি থাকলে পড়াশোনাও ভালো হবে-এমনটাই তার ধারণা।
যদিও কলেজ ছুটিতে এসে নাছির একবেলা ভাত বাবার সঙ্গে খেতে পারেনি-বদ মেজাজি মায়ের আচরণের কারণে। তারপরেও মায়ের প্রতি ছেলের আদব-কায়দার কমতি ছিল না। মাকে দেখামাত্র নাছির বিনম্রভাবে সালাম ও কুশল বিনিময় করেন। মাঝে মধ্যে মায়ের পছন্দের খাবারদাবার পাঠাতেন। বিশেষ উৎসবে পোশাক আশাকও কিনে দিতেন। কিন্তু কি হবে নাছিরের ভালো আচরণে! রূপে-অহংকারী মায়ের টনক নড়েনি কখনো।
হবিউল্লাহ পেশায় শিক্ষক বলে, সন্তানের ভবিষ্যৎ মজবুত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তার ইচ্ছে ছিল, ছেলে নাছিরকে শিক্ষক বানাবেন। এইচএসসির পর অনার্স-মাস্টার্স শেষে ছেলে তারই স্কুলে যোগ দেবে-এমন ইচ্ছা ছিল তার। দুর্নাম গোচবে তার বিগত দিনের। পরিবারের জন্য বয়ে আনবে সুনাম। নিজের অসম্পর্ণ কাজগুলো সম্পর্ণ করে বাহ্বা হাততালি পাবে এলাকায়। এতে তার ষোলকলা পূর্ণ হবে। সমাজে মুখোশপরা ব্যক্তিদের তালিকা থেকে নিজের নামটি কাটাতে সক্ষম হবেন তিনি।
কিন্তু এত আশার-শখের সন্তানটি তার এ কি করলো! কোনো রকমে টেনেটোনে এইচএসসি পাশ করেছে । এর চেয়েও দুঃখজনক ব্যাপার হলো, পরীক্ষার পূর্বেই কথিত প্রেম প্রেম খেলায় মত্ত হয়ে বিয়ে করে নাছির। মেসের পাশে বাসায় এক ছাত্রীকে শখের বশে প্রাইভেট পড়াত সে। এক সময় ওই ছাত্রীর বড় বোনকে গোপনে বিয়ে করেছে নাছির। যা প্রকাশ পায় মেয়েটির পেটে বাচ্চা আসার পর। মেয়েটি দেখতে ঠিক তার ছোট্ট খালা রহিমার মতো। রহিমা যেমন বিয়ের পর রাগ করে স্বামীর সংসার থেকে একেবারে চলে এসেছিল। শত চেষ্টা করেও তাকে আর শ্বশুর বাড়ি পাঠানো সম্ভব হয়নি। কথা তার একটাই ছিল, স্বামী কালো, তার ভাত খাবো না। তেমনি এ মেয়েটির অবস্থাও একই রকম। এছাড়া ছেলের বয়সের চেয়ে কম করে হলেও ৫ বছরের বড় হবে সে। অতি বিলাসী এ মেয়েটি ছেলে পটাতে বেশ ওস্তাদ। এর আগেও নাকি স্বামীর ঘর থেকে আসর পর এক ছেলের হাত ধরে লাপাত্তা ছিল দিন দশেক।
হন্তদন্ত হয়ে একদিন নাছির বাড়ি এসে তার দাদির পা জড়িয়ে কাঁদা শুরু করল। দাদি তাকে অভয় দিয়ে সবকিছু খুলে বলতে বললেন। দাদির কথায় আশ্বস্ত হয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে নাছির সব ঘটনা খুলে বললেন। দাদি মূর্ছা গেলেন। ডাক্তার তো তাকে ঢাকায় নেওয়ারই পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরে দাদি সুস্থ হয়ে ওঠলেন। এ সংবাদে দু’দিন নাওয়া-খাওয়াই বন্ধ ছিল তার। দাদি কোনোভাবেই সাহস পাচ্ছিলেন না তার ছেলে হবিউল্লাকে এ খবর জানানোর। দাদি দিগি¦দিক হারিয়ে পাগল প্রায়। কারণ, মা মারা যাওয়ার পর এ দাদিই বহু কষ্টে নাছিরকে বড় করেছেন। বুকে আগলে রেখে এসএসসি পাশ করিয়েছেন। অথচ, নাছিরের বাবা হবিউল্লাহ এ মাকে একমুঠো ভাত পর্যন্ত দেননি। সব সময় কারণে অকারণে মাকে তুচ্ছ-তাচ্ছল্য করেছেন। হবিউল্লাহ’র মা এখন সন্তানের ধারধারে না। স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পদের আয় ও হাঁস-মুরগী পালন করে তার দিন বেশ চলে।
এর আগেই হবিউল্লাহ সন্তানের এসব ঘটনা তার এক বন্ধুর কাছ থেকে শোনেন। চতুর হবিউল্লাহ তৎক্ষণাৎ নিজের অপকর্মের মতো সন্তানের অপকর্ম ঢাকতে উঠেপড়ে লেগে যান। রাখঢাক না করে নাছিরকে নিয়ে সোজা চলে যান ছেলের শ্বশুর বাড়ি। বেয়াই ও বেয়াইনকে ভূলিয়েভালিয়ে মেয়েটিকে তাদের এখানেই থাকার পাকা বন্দবস্ত করে চলে এলেন। আর ছেলেকে বললেন, ‘বাবা তোমার কর্মের ফল তোমাকেই ভোগ করতে হবে। তোমার বউ নিয়ে তুমি খাও। আমাকে দশ টাকাও দিতে হবে না। আমার কাছ থেকে তুমিও কিছু পাবে না’।
নাছির বাবার এসব কথা শোনে প্রথমে বেশ মর্মাহত হন। পরে তার বাবার বিগত দিনের ঘটনাসমূহের চিত্রগুলো তাকে সামনে চলার পথ উন্মুক্ত করে। অকপটে নেমে পড়েন জীবন জীবিকার সন্ধানে-কি করে আয় রোজগার করা যায়। ধীরে ধীরে কাজের পরিধিও বাড়ে তার। এখন ভালো অংকের টাকা আয় করে নাছির। শহরের মধ্যখানে দুই রুমের একটি বাসা বাড়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর ভালই সংসার চলছে। ফুটফুটে একটি মেয়ে সন্তানও এসেছে তাদের ঘরে।
বাবা হবিউল্লাহ প্রায় রাতে কাঁদেন-নিরবে কাঁদেন। অল্প বয়স্ক সুন্দরী বউয়ের প্রতি এখন আর লোভ নেই তার। মনে হয় বিগত দিনের কর্মকা- নিয়ে অনুশোচনায় ভোগেন তিনি। প্রায় অন্যমনস্ক হয়ে একা একা কার সঙ্গে যেন কথা বলেন হবিউল্লাহ। মাঝেমধ্যে ছাদের উপরে ওঠে চোখের জল ফেলেন। আর তার নিজের জীবনের কৃতকর্মকে নিয়ে অতীত হাতড়ান। তিনি এখন মনে করেন, তার জীবনে সব চেয়ে ভুল ছিল, প্রথম স্ত্রীকে কষ্ট দিয়ে নবম শ্রেণীর ছাত্রীর সঙ্গে প্রেম প্রেম খেলা। লুকিয়ে নিজের ছাত্রীর পানিপান ও বিয়ে করে সংসার করার ব্যাপারটি; সর্বোপরি গ্রামের সহজ-সরল বধূটিকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করার বিষয়টি।
হবিউল্লাহ এখন বুঝতে শিখেছে, পাপ বাপকেও ছাড়েনা। তার আগেকার সংসারের সন্তান নাছির হয়তো বাবার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই এমন কাজটি করেছে। আর নয়তো মায়ের স্নেহবঞ্চিত মায়ের অবহেলা-অযতনের কারণ এটি। হবিউল্লাহ এসব ভাবে আর নির্ঘুম রাত কাটায়। তার কাছে এখন একটি রাত যেন একছরের মত যন্ত্রণাদায়ক। আহ কি কষ্ট!। নিরবে নির্জনে অশ্রুসিক্ত এক পিতা বুক চাপড়ায়! এসব দৃশ্য দেখে হাসে প্রকৃতি প্রতিক্ষণ-প্রতিদিন।

========================
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
তারিখঃ ২৭/০৮/২০১৩

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply