ইসলাম শান্তির পথ দেখায়

—–মো. আলী আশরাফ খান
অতি সাধারণরাই বুঝবেন যে, পৃথিবীতে কোন মানুষই সন্ত্রাসী হয়ে জন্ম নেয় না। বরং সমাজের মানুষ সর্বোপরি পরিবেশই তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে তৈরি করে। সমাজের কারো না কারো সংস্পর্শে একজন নিষ্পাপ মানুষ খারাপ কর্মের প্রথম ছবক পায়। আর এভাবেই ছোটখাটো অপরাধ কর্মের ধারাবাহিকতার ফল হয়ে দাঁড়ায় ধ্বংস আর উন্মাদনায়; বড় ধরনের অপরাধ কর্মে জড়িয়ে সমাজকে কলুষিত করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায় একদল মানুষ। ওইসব সন্ত্রাসীদের কারণেই বিষিয়ে ওঠে সাধারণের জীবনযাত্রা এবং একসময় সমাজের গলার কাঁটা হয়ে দেখা দেয় এবং যারা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয় তারাও ছাড় পান না ওইসব সন্ত্রাসীদের হাত থেকে। আজ অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই যে, সমাজের, রাষ্ট্রের ও বিশ্বের কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠী তাদের হীন স্বার্থকে চরিতার্থ করতে এই ছোটখাটো অপরাধীদের দ্বারা ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে ব্যবহার করে অপস্বার্থ হাসিল করে। বিনিময়ে অর্থ-বিত্ত, যশ-খ্যাতি, ক্ষমতা ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীর লোভে অন্ধ করে রাখে তাদের। ওইসমস্ত স্বল্প জ্ঞানের মানুষদের নির্দ্বিধায় কাজে লাগিয়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চরম ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হয় তারা। আবার অনেক ক্ষেত্রে কিছু ভ্রান্ত্রপথ অনুসারী ব্যক্তি-গোষ্ঠী দ্বারা সন্ত্রাসী কর্মযজ্ঞ সংঘঠিত হতে দেখা যায়। আসলে ধর্মের কোনো ছিটাফোঁটাও থাকেনা এ সকল ব্যক্তি-গোষ্ঠীদের মাঝে। যে কারণে মানবতা বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত হতে দ্বিধা করেনা ওই সমস্ত ব্যক্তি-গোষ্ঠী।
আজ কি কেউ অস্বীকার করতে পারবে, সন্ত্রাসের করালগ্রাসে ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সমাজ, দেশ, জাতি তথা বিশ্ব যারপরনাই অস্থির যে হয়ে উঠেছে? বিশ্বের এমন কোনো স্থান নেই যেখানে সন্ত্রাসের ভয়াল থাবায় বিপর্যস্ত নয় মানুষ। স্বয়ং আমেরিকা ও ব্রিটেনসহ যারা বিশ্বক্ষমতাধর এবং বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে বলে দাবি করেন, তাদেরও নিস্তার নেই এই সন্ত্রাস নামের হিংস্রতা থেকে। যদিও বিশ্বশান্তিকামী মানুষ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার, কিন্তু কিছুই করার থাকছে না-মানুষ নামের লেবাসপরা অমানুষদের কুটচাল অপশক্তির কারণে। হাস্যকর ব্যাপার, ভ্রান্তপথে সন্ত্রাস নির্মূলে সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে কিছু সুবিধাবাদি রাষ্ট্রসমূহ কিন্তু তাদের বহু আয়োজনেও সন্ত্রাসকে দমন করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং মহামারি আকারে সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়ছে জাতিতে-জাতিতে, দেশে-দেশে সর্বোপরি সমগ্র বিশ্বে। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, সন্ত্রাস কেন হয়? সন্ত্রাসের মূলে কোন কোন ব্যক্তি-গোষ্ঠী দায়ী? আর কেনই বা এই মানবতা বিনাশী কর্মযজ্ঞকে দমন করা যাচ্ছে না, বরং দিনে দিনে বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে তা। এর কারণ খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করছি।
আমরা এখন লক্ষ করবো যে, ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের ঘিরে এসব সন্ত্রাসী কর্মকা- চলছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এ ক্ষেত্রে ‘মৌলবাদ’ শব্দটির সঙ্গে ‘জঙ্গীবাদ’ শব্দটিকেও যোগ করা হয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় লেবাস পরিয়ে মানবতার শত্রুরা যে ভয়াবহতা ছড়াচ্ছে বিশ্বমাঝে, এটি খেয়াল করার মানুষ হাতেগোনাই বলা যায়। এ বিষয়টির গভীরে না গিয়ে সকল দোষ (নামধারী) মুসলিম জন-গোষ্ঠীর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করছে একটি মহল। শুধু তাই নয়, এ অপশক্তিটি দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে সকল অর্থও যোগান দিচ্ছে কিছু বিকৃতমনা মানুষ। বরাবরই ওইসব মানুষ নামধারী হিংস্র পশুরা ইসলাম-মুসলমানদের কলুষিত করার লক্ষ্যে যে নীল নকঁশার মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে।
আসলে ওইসব লেবাসপরা ব্যক্তি-গোষ্ঠী-দেশের কাজ হলো, সমগ্র বিশ্বে তাদের আদিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে সকল সম্পদ ও অর্থনীতির মূল বিষয়টিকে কুক্ষিগত করা। তারা ভুলে গেছে ইতিহাস। ইতিহাস প্রমাণ করে, ইসলামই সর্বপ্রথম সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছে। ইসলাম কখনো সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয়নি-দেয়না। সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্ব গঠনে ইসলাম যে বিজ্ঞান সম্মত ব্যবস্থাপত্র দিয়েছে মানব জাতির কাছে, তাতে মানুষের মর্যাদা নিরুপিত হয়েছে ব্যক্তির চরিত্র ও গুণ দ্বারা। এতে ধন-সম্পদ, বংশ-গৌরব বা রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অবস্থানকে সামনে রেখে নির্ণিত হয়নি। ইসলাম সকলকেই শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে সন্ত্রাস-হানাহানি খুনখারাবি সর্বোপরি বিশৃংখলাকে ব্যতিরেকে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দেয়।
ইতিহাস স্বাক্ষী, যুগ-শতাব্দীতে ইসলামের শান্তিরবাণী প্রচার করে চলছেন আমাদেরই স্রষ্টাপ্রেমী মনিষীগণ। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে মানবতার মুক্তির দিশারী, সকল মানুষের কল্যাণকামী মানুষ হযরত মুহাম্মদ (স.) ঘোষণা দেন, “সকল মানুষই আদমের সন্তান এবং আদম মাটির সৃষ্টি। হে আদম সন্তন আজকের এই দিন, এই মাস, এই নগরী যেমন তোমাদের নিকট পবিত্র, ঠিক তেমনিভাবে তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ ও পবিত্র। মনে রেখো, অন্ধকার যুগের সকল নীতি, সকল আচার অনুষ্ঠান আজ আমি রহিত করছি। অন্ধকার যুগের রক্তপাত এবং তার প্রতিশোধের সকল ঘটনা অদ্য থেকে ভুলে যাও। সর্বপ্রথম আমার পিতৃব্য ভ্রাতা ইবনে রাবিয়া বিন হারিসের খুনের দাবি প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।” রাসূলে পাক (স.)-বিশ্ববাসীকে এক শান্তির পতাকা তলে সমবেত করতে; সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্ব উপহার দিতে এভাবেই সাম্য, মৈত্রী এবং নিরাপত্তার অমিয় বাণী শুনিয়েছেন। কাজ করে গেছেন বিরামহীন। তিনি কখনই ন্যায়-অন্যায়কে বিচার করতে মুসলিম-অমুসলিম প্রার্থক্য করেননি।
আমাদের জন্য সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দিক-নির্দেশক মহানবী (স.) ইহুদীদের আতিথেয়তায় এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি ইহুদী অতিথির মল-মূত্র নিজে পরিস্কার করেছেন। ইহুদী ও খৃস্টানদের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। এই মহাপুরুষের মধুর ব্যবহারে বিমোহিত হয়ে অনেকেই শান্তির ধর্ম ‘ইসলাম’ গ্রহণ করেছেন। তিনি সকল জাতের সকল মানুষের সাথে মিলেমিশে সদ্ভাবে জীবনযাপন করার নজীরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেগেছেন মানবজাতির জন্য। একদা এক জনৈক সাহাবী তার অধিনস্ত ব্যক্তিকে প্রহার করছিলেন, তা দেখে দয়াল নবী (স.) তাকে বলেছিলেন, ‘সে তোমার ভাই, তুমি যা খাও তাই তাকে খেতে দিও; তুমি যা পরিধান কর তাই তাকে পরতে দিও’। বিবাদ মেটাতে আমাদের প্রিয় নবী (স.)-এর কোনো জুড়ি ছিল না। মদিনায় হিজরতের পর মহানবী (স.) আউস ও খাজরাজ গোত্রের শতাব্দী ধরে চলে আসা বিবাদ ভুলিয়ে শান্তির সুবাতাস বইয়ে তাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেন। আর এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা পাক রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন,‘তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করো, তোমরা ছিলে পরস্পরের শত্রু এবং তিনি তোমাদের অন্তরে সম্প্রতির সঞ্চার করেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পরের ভাই হয়ে গেলে। (আল ইমরান-১০৩)।
সমাজে সন্ত্রাস বিস্তার লাভে-অর্থ-বৈভব, মান-সম্মান, পদমর্যাদার অবস্থানসহ চারিত্রিক উৎকৃষ্টতার হানি ঘটিয়ে কিংবা মোহ সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাই সন্ত্রাস সৃষ্টি হতে পারে এমন সব ধরনের পন্থা যেমন, অপপ্রচার, গুজব, নিন্দা, তিরস্কার, বিকৃত নামকরণ, মিথ্যা ও অপবাদ প্রভৃতি ইসলামে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। একমাত্র ইসলামই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে সকল জাতের সকল মানুষের সমান অধিকার প্রদান করেছে। ইসলামে রয়েছে সকল মানুষের ধন-সম্পত্তি, বিষয় আশয়, প্রাণের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আত্মবিকাশের সুযোগ-সুবিধা, শান্তি-শৃংখলা স্থাপন এবং প্রকৃত কল্যাণের সু-শৃংখল সুব্যবস্থা।
আমাদের প্রিয় মহানবী (স.) থেকে শুরু করে শান্তির ধর্ম-ইসলামের ধারকবাহক সকল মনীষীরাই সন্ত্রাস বিরোধী ছিলেন। এখন যদি সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে কোন নামধারী, মুখোশধারী ও লেবাসধারী ব্যক্তি-গোষ্ঠী মুসলিম পরিচয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তাহলে ধরে নিতে হবে তারা কোনোভাবেই শান্তির ধর্ম-ইসলামে বিশ্বাসী নয়। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়, একজন লোককে টুপি, দাড়ি, পায়জামা-পান্জাবী পরিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দেয়া হলো, আর সে যাচ্ছেতাই কর্ম চালিয়ে যেতে লাগলো। এখন আমরা ওই লোকটিকে কোন ধর্মে বিশ্বাসী ভাবতে পারি? প্রকৃত কথা হলো, নামে বা পোশাক আশাকে মুসলমানের পরিচয় নয়। তার কর্মেই হয় ধর্মের পরিচয়।
ইসলামের অমিয় বাণী প্রচারে উম্মতের কারী হযরত মুহাম্মদ (স.) উপদেশ স্বরূপ বলেছেন,‘তোমরা তোমাদের কৃত ক্ষতির প্রতিশোধ নিতে গিয়ে ঘরের ভেতর অবস্থানকারীদের গায়ে হাত দিবে না। নারীদের অক্ষমতার সম্মান করবে, দুগ্ধপোষ্য শিশু ও রুগাক্রান্তদের শরীরে আঘাত করবে না। যারা তোমাদের বাধা দেয় না, তাদের বসবাসের ঘর ভাঙ্গবে না। তাদের জীবন ধারণের উপকরণ ও ফল-ফলাদির গাছ-গাছালি বিনষ্ট করবে না। নষ্ট করবে না কোন শস্যও। প্রসঙ্গক্রমে হুজুর পাক (স.)-এর হাদিসটি তুলে ধরা যায় এখানে। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোন জিম্মির প্রতি অন্যায় করবে এবং সাধ্যের বাইরে তার উপর বোঝা চাপাবে কিয়ামতের দিন আমি নিজে তার অভিযোগকারী হব’। এভাবেই ইসলাম মানুষকে সাম্য-মৈত্রির বন্ধনে আবদ্ধ করে সমাজের সর্বত্র শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপন করেছে। দেখিয়েছে সুস্থ-সুন্দরভাবে কি কের পথ চলতে হয়। এবং শিক্ষা দিয়েছে শান্তিতে বসবাস করার উপায় সম্পর্কে। ইসলাম বরাবরই জনগণের জানমাল ও ইজ্জতের দায়িত্ব ও বাস্তব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মানুষের আর্থিক দুরবস্থা নিরসনে সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
বিশেষ করে বাক স্বাধীনতাতে বাধাদান, পরিবেশ ক্ষুন্ন সর্বোপরি অস্তিত্ব বিনাশ প্রক্রিয়া চালু হলে অনেকেই সন্ত্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। যে কারণে ইসলাম ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে বাক স্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে। হযরত আবুবকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.) সর্বদা জনসাধারণের মতামত গ্রহণ করতেন, তিনি প্রায়শই বলতেন, ‘তোমাদের কল্যাণ নেই যদি তোমরা আমাদের সমালোচনা না করো …. এবং আমাদের কল্যাণ নেই যদি আমরা তা না শুনি’। ইসলাম চায়, সকলের ঐক্যেরভিত্তিতে সমাজ-দেশ-জাতি তথা বিশ্বের সকল প্রকার নাগরিক সমধিকার ভোগ করুক; মানবিক ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে ভৌগলিক সীমারেখা, জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদের উর্দ্ধে উঠে একটি ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার; বিশ্বময় শান্তির ছায়াতলে বাস করুক সকল মানুষ। আর নিজ নিজ চিন্তা-চেতনার ভিত্তিতে অন্বেষণ করুক আলোক দীপ্ততার। যার মধ্যে মানুষ পাবে প্রকৃত শান্তি। সোজা কথায়, ইসলাম শান্তির পথ, শাশ্বাত চিরন্তন সত্য এটি।

============================
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply