বাঘের চামড়া বিছিয়ে পালা ক্রমে ঘুমায় বনদস্যু বাহিনীর সদস্যরা

কাজী নূর আলম, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) :–

বেপরোয়া সুন্দরবেন অস্ত্রে সজ্জিত বন দস্যুদের কাছে জেলে বাওয়ালির পাশাপাশি বাঘ হরিণও রেহাই পাচ্ছে না। মুক্তিপনের দাবিতে অপহরণ, লুটপাট করা সহ অস্ত্রের মুখে বাঘ, হরিণ হত্যার পর চামড়া মাংশ ও হাড় পাচার কাজে জড়িয়ে পড়েছে বনদস্যুরা। তাছাড়া তাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় থাকে হরিণের মাংশ। আন্তর্জাতিক চোরাকারবারীর চক্রের সাথে সখ্যতা রেখে মোটা টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে হত্যাকৃত বাঘের চামড়া, হাড়, মাংশ সহ নানা অঙ্গ প্রতঙ্গ। বনদস্যু বাহিনীর কবলে জিম্মি থাকা একাধিক জেলে বাওয়ালিরা এ তথ্য দিয়েছে। প্রতিনিয়ত সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়ে বাঘ প্রবেশের কারণে নির্ঘূম রাত কাটাতো গ্রামবাসীরা। ২০১৩ সালে এখনও একবারো বাঘ প্রবেশ করেনি সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাভুক্ত শ্যামনগরের কোন গ্রামে। বাঘ প্রতিরোধ কমিটির সদস্যরা সুন্দরবনের বনদস্যুদের তৎপরতার কারণে বাঘ নিধনের আশংঙ্কা বোধ করেছেন।
সম্প্রতি মুক্তিপনের টাকা দিয়ে ফিরে আসা জেলে সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার হরিনগর গ্রামের আক্কাস গাজী (৪০), চুনকুড়ি গ্রামের ফজের আলী (৫০), ধুমঘাট গ্রামের ভোলানাথ মন্ডল (৩৫) জানান, সুন্দরবনে অস্ত্রধারী মজিদ,আলামিন, জাহাঙ্গীর ও আমির আলী বাহিনী বে-পরোয়া হয়ে উঠেছে। সারা সুন্দরবন দাপিয়ে তারা জেলে অপহরণ, লুটপাট, ছিনতাই অব্যহত রেখেছে। জেলেরা জানাই গত ২৪ জুলাই ২০১৩ মজিদ, জাহাঙ্গীর বাহিনীর কবল থেকে মুক্তিপণ দিয়ে তারা বাড়ি ফিরে এসেছেন। সুন্দরবনের মালঞ্চ, ডিঙ্গিমারী, ও পশুর তলা খাল এলাকা থেকে তাদেরকে অপহরণ করা হয়। ৫ দিন বনদস্যুদের ট্রলারে জিম্মি ছিল তারা। জেলেরা জানায়, মজিদ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৩৫ জন। তাদের কাছে দেশীয় বন্দুক, টুটুবার রাইফেলস্ সহ উন্নত ধরণের অস্ত্র রয়েছে ৪০ টির উর্দ্ধে। বনদস্যুদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় থাকতো জেলেদের কাছ থেকে ছিনতাইকৃত বনের মাছ, মায়াবি হরিণের মাংশ। প্রায় বনে ঢুকে বনদস্যুরা অস্ত্রের মুখে হরিণ শিকার করত, এমনকি সামনে বাঘ পড়লে গুলি করে বাঘ হত্যা করে চামড়া, হাড় ও বিভিন্ন অঙ্গ প্রতঙ্গ ছাড়িয়ে নিয়ে মাংশ নদীতে ফেলে দিত। তারা আরো জানায়, মজিদ বাহিনীর ট্রলারে ১৫ ফুট লম্বা ২ টি বাঘের চামড়া দেখেছে। ট্রলারে ভিতরে দিনের বেলায় বাঘের চামড়া বিছিয়ে পালা ক্রমে ঘুমাতো বনদস্যু বাহিনীর সদস্যরা। তাছাড়া ১০/১৫ টি হরিণের চামড়া ও ১০/১২ টি শিং সহ হরিণের মাথা ও দেখেছে জেলেরা। সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে ভারত মায়ানমার সহ বিভিন্ন দেশের চোরাকারবারীদের ট্রলার ও জাহাজ প্রায়ই বাংলাদেশে প্রবেশ করে থাকে। এ সময় তারা সুযোগ বুঝে বাঘের চামড়া, হাড়, মাংশ, হরিণের চামড়া সহ অঙ্গ প্রতঙ্গ নির্বিঘেœ পাচার করে থাকে। ঈদ কে সামনে রেখে পাচার কারীদের পাশা পাশি সুন্দরবনে বনদস্যুদের তৎপরতা ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক মাসে সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ, গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী ও কৈখালী ইউনিয়নের অর্ধ শতাধিক জেলে মুক্তিপনের দাবিতে অপহরণ হয়। অনেকেই মুক্তিপনের টাকা পরিশোধ করে বাড়িতে ফিরে এসেছে। মুক্তিপনের টাকা দিতে না পারায় গত ২৫ জুলাই উপজেলা গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া গ্রামের মুরশিদ গাজীর পুত্র রবিউল ইসলাম (২৮) কে গুলি করে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয় রাজু বাহিনীর সদস্যরা।
উপজেলা গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জি,এম মাসুদুল আলম জানান, গত ৫/৬ মাস সুন্দরবন থেকে বাঘ লোকালয়ে এসেছে এমন খবর পাওয়া যায়নি। তবে জেলেদের মুখে শুনেছি বনদস্যুরা নিয়মিত হরিণ শিকার করে থাকে। এমনকি সুযোগ পেলে বাঘ শিকার করে পাচার করে থাকে। একটি বাঘের চামড়া দেশে ৬০/৭০ হাজার টাকা হলেও বিদেশে এর মূল্য ৫/৬ লক্ষ টাকা। এ কারণে বনদস্যুরা বাঘ হরিনের চামড়া পাচার কাজে জড়িয়ে পড়েছে। বনদস্যুদের ব্যাপক তৎপরতার কারণে সুন্দরবনের কর্মরত জেলে, বাওয়ালী ও বন কর্মচারীরা প্রতিনিয়ত আতঙ্ককের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তিনি আরো জানান, বন বিভাগের তৎপরতা না থাকায় সারা সুন্দরবন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বনদস্যুরা। গত ২৪ জুলাই ২০১৩ উপজেলা আইন শৃঙ্খলা মিটিংয়ে অস্ত্রধারী বনদস্যুদের তৎপরতার বিষয়টি উল্লেখ করে দ্রুত একটি অভিযান চালানোর প্রস্তাব দিয়েছি। বিষয়টি রেজুলেশন পূর্বক স্ব-রাষ্ট্র মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনারও পরামর্শ দেওয়া হয়। সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন বাঘ প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ওসমান গনি জানান, দীর্ঘ ৭/৮ মাস সুন্দরবনের কোন বাঘ লোকালয়ে আসেনি। ইতিপূর্বে প্রতিনিয়ত বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের এ সময়টাতে বার বার বাঘ লোকালয়ে ঢুকে মানুষ হত্যাসহ ছাগল ও গরু ধরে নিয়ে যেত। আকর্ষিক লোকালয়ে বাঘ আসা বন্ধ হওয়ায় তারা বাঘ নিধনের আশংঙ্খা বোধ করেছেন। তিনি আরো বলেন, সুন্দরবনের অস্ত্রে সজ্জিত বনদস্যুদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা অপহরণ, লুটপাট, চাঁদাবাজি সহ প্রাণী হত্যা করে সুন্দরবনের জীব বৈচিত্রকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। লোকালয়ে বাঘ না আসার কারণ হিসাবে তিনি বলেন, বাঘের বসবাস স্থান গুলো বনদস্যুরা দখল করে নেওয়ায় বাঘ লোকালয়ের নিকটবর্তী এলাকা ছেড়ে গভীর বনে চলে গেছে। অন্যথায় ব্যাপক ভাবে বাঘ নিধনের কারণে সম্প্রতি লোকালয়ে বাঘ প্রবেশ বন্ধ হয়েছে। এ দিকে সুন্দরবন সংলগ্ন একাধিক গ্রামের সাধারণ মানুষ অনেকটা চিন্তিত, হঠাত বাঘ লোকালয় ছেড়ে কোথায় গেল তা নিয়ে। সুন্দরবন সংলগ্ন উপজেলার হরিনগর গ্রামের ক্ষুদ্র জেলে সমিতির সভাপতি মোঃ আইয়ূব আলী জানান, গত ৫/৬ মাসের মধ্যে বাঘের আক্রমনে কেউ নিহত না হলেও জেলেরা বনদস্যুদের কবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। তিনি বলেন, তার সমিতি ভুক্ত সদস্য হরিনগর গ্রামের আব্দুর রহমান (৪০), রবীন্দ্রনাথ মন্ডল (৪৫), সামছুর গাজী (৫০), রহমত আলী (২৫) বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর কবল থেকে গত ২৬ জুলাই মুক্তি পনের টাকা পরিশোধ করে বাড়িতে ফিরেছে। তিনি ও বাঘের আকর্ষিক আক্রমণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বনদস্যুদের দ্বারা বাঘ নিধনের চাঞ্চল্যকর তথ্য অপহৃত জেলেদের কাছ থেকে পেয়েছেন বলে জানান। শ্যামনগর উপজেলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আনিছুজ্জামানের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বেশ কিছু দিন যাবৎ বাঘের আক্রমণে কোন জেলে বাওয়ালী মারা গেছে, এমন সংবাদ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া লোকালয়ে বাঘ প্রবেশের কোন খবর এখন আর পাওয়া যায় না। তবে নির্বিঘেœ বনদস্যুদের তৎপরতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, অস্ত্রের মুখে বনদস্যুদের বাঘ, হরিণ হত্যার খবর জেলেদের মুখে শুনেছি। উপজেলার নাগরিক ফরমের সাধারণ সম্পাদক ও মৎস্য ঘের ব্যবসায়ী শেখ আফজাল হোসেন জানান, সুন্দরবনে বনদস্যুদের সংখ্য দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় অপহরণ আতঙ্কিত জেলে বাওয়ালীরা সুন্দরবনে না যেয়ে অনেকেই পেশা বদল করছেন। তিনি আরো বলেন, গত দু দিন আগে উপজেলার গোলাখালী গ্রামের আমজাদ হোসেন (৩৮), মিজান গাজী (৩৫) ৫০ হাজার টাকা মুক্তি পনের দাবিতে বনদস্যু আলামিন বাহিনীর কবলে অপহৃত হওয়ার পর মুক্তি পনের টাকা পরিশোধ করে ফিরে এসেছে। ফিরে আসা ওই দু জেলের কাছ থেকে তিনি শুনেছেন বনদস্যু আলামিন বাহিনীর ট্রলারে লবন দিয়ে দুটি বাঘের চামড়া শুকানোর খবর। এ ধরনের তথ্য জেলেদের কাছ থেকে প্রায় শোনা যাচ্ছে। যার কারণে বলা যায় বনদস্যুদের হাতে বাঘ হত্যার ঘটনা অহরহ ঘটায় সুন্দরবনে দ্রুত বাঘের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বনদস্যুদের তৎপরতাকে রুখতে না পারলে জেলে বাওয়ালীদের পাশা পাশি সুন্দরবনের অতন্ত্র প্রহরী রয়েল বেঙ্গল টাইগারের কোন অস্তিত্ত পাওয়া যাবে না বলে তিনি আশংঙ্কা করেছেন। সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন কর্মকর্তা মোঃ কেরামত আলী জানান, জনবল কম থাকায় ও উন্নত অস্ত্র না থাকায় বনদস্যুদের অবাধ বিচরণ থামানো যাচ্ছে না। তবে মাঝে মধ্যে যৌথ অভিযানে অস্ত্র সহ বনদস্যুদের আটক করা হচ্ছে।

Check Also

নাসিরনগরে শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী পালিত

  আকতার হোসেন ভুইয়া,নাসিরনগর :– নাসিরনগরে সনাতন ধর্মালম্বীদের উদ্যোগে শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী পালিত হয়েছে। শনিবার ...

Leave a Reply