প্রকৃত মানুষ হওয়ার জন্য প্রয়োজন ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা

—-মো. আলী আশরাফ খান
একজন মানুষের জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালিত করার জন্য প্রয়োজন সুশিক্ষা। যে শিক্ষার আলোকে ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পরিবার-সমাজ ও দেশকে ভাল কিছু উপহার দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে প্রত্যেকেই। কিন্তু এ প্রকৃত শিক্ষা আমরা পাবো কোথায়? আমাদের দেশে কি এমন শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে যে, যা থেকে আমরা প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি? যে কোন সমাজ সচেতন মানুষ এক বাক্যে স্বীকার করতে বাধ্য, আমাদের দেশে যে ভংগুর শিক্ষানীতির ছত্রছায়ায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষা গ্রহণ করছে তা কোনভাবেই প্রকৃত মানুষ সৃষ্টি করতে পারে না। বলাই বাহুল্য যে, শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য হলো প্রকৃত মানুষ সৃষ্টি করা। কিন্তু খুব দুঃখের সঙ্গেই বলতে হয়, পৃথিবীব্যাপি শিক্ষার যদিও আশাতীত প্রসার লাভ ঘটেছে বলে অনেকে মনে করেন, কিন্তু আমি তা মানতে পারছি না। কারণ, প্রকৃত মানুষ কিংবা পূর্ণাঙ্গ মানুষ পৃথিবীর কোথাও তৈরী হচ্ছে বলে আমি মনে করছি না। কেউ যদি মনে করেন, এটা আমার গোঁড়ামি বা বাড়াবাড়ি তাহলে তাদের ব্যাপারে আমার বলার কিছু নেই। তবে আমি এটা সরাসরি বলতে পারি, পৃথিবীর সর্বশীর্ষে সমাসীন পর্যন্ত শিক্ষা ও পা-িত্যের অধিকারী হয়ে যখন একজন মানুষ হয় লম্পট, চোর, বদমাইশ, দুর্নীতিবাজ এবং অসভ্যতার কোনটাই তার মাঝে বাকি থাকে না, তখন নিশ্চয়ই তাকে মানুষ বলা যায় না; কোনভাবেই তাকে প্রকৃত শিক্ষিত বলে গণ্য করা যায় না। যদি কেউ একে শিক্ষিত বলে মনে করেন, আমি বলবো, তিনি শিক্ষা ও শিক্ষিতের প্রকৃত সংজ্ঞা জানেন না বলেই ‘শিক্ষা ও শিক্ষিত’ শব্দটিকে লেজেগোবরে করে ফেলছেন।
আমি আরো একটু গভীরে গিয়ে যদি বলি, প্রকৃত শিক্ষা ও শিক্ষিত মানুষ দেশ তথা বিশ্বে খুঁজে পাওয়া বিরল। অনেকে হয়তো এ বিষয়টি শুনে আমার প্রতি বিরূপ ধারণাও করতে পারেন। তবে যে যাই বলুক আমার কথা হলো, আমরা প্রত্যেকেই মূর্খ কোনো না কোনো বিষয়ে। যা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই কারো পক্ষে। উদাহরণ স্বরূপ যেমন-আমরা সকলেই জ্ঞান অন্বেষণ কালে জানবার জন্যই অধ্যয়ন করে থাকি। ভাল-মন্দও জানি পড়ার মাধ্যমে। কিন্তু পড়া যখন শেষ করি, তা কি আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে মেনে চলি? নিশ্চয়ই না। আর যদি মেনেই চলতাম, তাহলে কেনই বা মিথ্যার মতো জঘন্য শব্দটি হতো আমাদের নিত্য সঙ্গী? মানুষের অনিষ্ট কেনই বা হতো আমাদের দ্বারা? আর কেনই বা সমগ্র বিশ্বব্যাপি নিজেদের আদিপত্য বিস্তারের অপপ্রয়াসে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো? এমনি করে অসংখ্য বিবেক বর্জিত, মানবতাবিরোধী, সুশিক্ষার পরিপন্থী জঘন্যতম কর্মকান্ড বিশ্বের সর্বত্রই চলছে বিরামহীনভাবে তথাকথিত শিক্ষিত মানুষদের দ্বারা বা চলমান শিক্ষার কারিকুলামে শিক্ষিত ব্যক্তি-গোষ্ঠী দ্বারা। যা কোনোভাবেই প্রকৃত শিক্ষা ও শিক্ষিত ব্যক্তি-গোষ্ঠীর পর্যায়ে পড়ে না।
আর এ কুশিক্ষা বা অশিক্ষার মোহে আমরা অন্ধ হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ভাল মন্দ বাছবিচারের ক্ষমতাও আমরা হারিয়ে ফেলেছি। প্রত্যেক মানুষ জন্ম লাভের পর পরিবেশ থেকেই ভাল-মন্দ বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে। আস্তে আস্তে তার বয়স বাড়ার পাশাপাশি বিবেক-বুদ্ধি, প্রবৃত্তি তথা বোধশক্তি বৃদ্ধি পায় তার মাঝে এটাই স্বাভাবিক। সে যে সমাজে বাস করে যেখানেই ভাল-মন্দ দৃশ্য দেখে, ভাল-মন্দ কথা বলতে শেখে, ভাল-মন্দ চিন্তা করে, ভাল-মন্দ কর্ম করতে শেখে। এমনি করে বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভাল-মন্দ তার মস্তীষ্কে ধারণ হতে থাকে। পাশাপাশি কুপ্রবৃত্তি ও সু-প্রবৃত্তি ভাল-মন্দ বিষয়গুলো ভাগাভাগি করে নেয়। যখন দেখা যায়, খারাপত্বের প্রভাবে কৃপ্রবৃত্তি চাঙ্গা হয়ে ওঠে, তখন সুপ্রবৃত্তি অবদমিত হয়ে পড়ে। যে কারণে ভালদৃশ্য, ভালচিন্তা, ভালকাজ ও ভালকথা শোনাতে তার আর ভাল লাগে না। মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ হয়ে সে তখন দিশেহারা হয়ে ওঠে। তার বিবেক তখন কখনো তন্দ্রাচ্ছন্ন আবার কখনো ঘুমিয়ে পড়ে এবং এমনও দেখা যায় অনেকের বিবেক অর্ধ্বমৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। আর যখন বিবেক সত্ত্বা পুরোপুরী বিনষ্ট হয়ে যায় তখন তার মৃত্যুই অনিবার্য।
যা মানব জীবনের সুস্থ চিন্তা-চেতনা থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দেয় এবং এক পর্য়ায়ে সে এই সুন্দর ধরণী থেকে বিদায় নেয় অপ্রতাশিতভাবে। সে সমাজ ও জাতিকে ভাল কিছু উপহারের বদলে এমন কিছু ব্যধি ছড়িয়ে দিয়ে যায়, যা যুগ-শতাব্দী কিংবা হাজার বছর পর্যন্ত গড়ায়। আর তাহলো নিঃসন্দেহে কুশিক্ষা-অপশিক্ষা। এ থেকে আমাদেরকে পরিত্রাণ পেতে হলে সর্বাগ্রে ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে সত্য ও সুন্দরের চাষাবাদ করতে হবে। পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষা গ্রহন করতে হবে। প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করে প্রকৃত মানুষ হতে হবে। তবে এ কাজটি এতো সহজ নয়। যারা প্রকৃত মানুষ হওয়ার সংকল্প করবে তাদের সর্ব প্রথম নিজের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে; খারাপত্বকে পরিহার করে ভালত্বের সন্নিবেশ ঘটাতে হবে মস্তীস্কের মধ্যে।
এটা অবশ্য হুট করে সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে অনুশীলনে রপ্ত হয়ে যাবে নিজেনিজেই। প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহেও যদি আমরা আমাদের মস্তীস্কে জমে থাকা খারাপত্বের দিকগুলোকে কিছু কিছু করে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করি এবং ভালত্বকে গ্রহণ করি তাহলে দেখা যাবে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই আমাদের সুপ্রবৃত্তি তথা বিবেক নামের পাঠশালার জানালা খুলে যাবে। বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর ভয়ে সকল খারাপত্ব পালিয়ে যেতে বাধ্য হবে। কুপ্রবৃত্তিরও প্রাণ যায় যায় অবস্থা হবে। আর তখনই আমরা যা পড়ব, যা জানবো তা আমাদের জীবনে যথাযথ প্রয়োগ করতে পারবো। এবং তখনই আমরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারবো। এর চেয়েও বড় কথা, ‘সভ্য মানুষ হওয়ার জন্য প্রয়োজন ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা’। এটা আমাদের বুঝতে হবে। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, যে যাই বলুক, ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যতীত কোন ব্যক্তি-গোষ্ঠী প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে না। তাদের দ্বারা দেশ-জাতির কল্যাণ কোন কালেই হয় না-হতে পারে না এবং প্রকৃত সুস্থচিন্তার বিকাশও ঘটে না। আমরাও পারবো না ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া প্রকৃত আলোকিত মানুষ হতে। যে কারণে, একমাত্র ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থাই পারে আমাদের ব্যক্তি-পরিবার-জাতি-দেশ তথা বিশ্বকে সুস্থ ও সুন্দর জীবন-যাপনের পথকে সুগম করতে। পরিশেষে আমারা বলবো, আজকে আমাদের সকলের প্রধান কাজ হলো, ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নে জোরালো প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

========================
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও প্রবন্ধকার
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
মুঠোফোন-০১৮১৬-২৫৯৫৩২

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply