গোলাম আযমের ৯০ বছরের কারাদণ্ড

ঢাকা :–

মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠনসহ মানবতাবিরোধী পাঁচ ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের ৯০ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

প্রায় তিন ঘণ্টার মতো রায় পাঠ করার পর গোলাম আযমের বিরুদ্ধে এই রায় ঘোষণা করেন আদালত।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান বলেছেন, গোলাম আযম যেসব অপরাধ করেছেন তা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য। তবে তার বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাকে ৯০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর রায় ঘোষণার সময় বলেন, ‘অধ্যাপক গোলাম আযম দেশব্যাপি পরিচিত ব্যক্তি। তিনি জামায়াতের সাবেক আমির। তবে আমরা আজ থেকে ৪২ বছর পূর্বে সংঘটিত অপরাধের বিচার করছি। প্রসিকিউশন আনীত অভিযোগ, আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি ও প্রাসঙ্গিক বিষয় পর্যালোচনা করে এ রায় প্রস্তুত করা হয়েছে।’

২৪৩ পৃষ্ঠার রায়ের মধ্যে সংক্ষিপ্ত অংশ পাঠ করা হবে উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান ও সদস্যরা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তা উপস্থাপন করেন। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান রায়ের মূল অংশ পাঠ করেন।

এর আগে রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণার জন্য সোমবার দিন ধার্য করেন।

ট্রাইব্যুনাল তার রায় ঘোষণার সময় বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে আনিত সব অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে আজীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছি। তবে তিনটিতে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও সে অভিযোগগুলোতে কোনো ধরনের শাস্তির রায় দেইনি। কারণ তাকে দুটিতেই আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়ে গেছে।’

সোমবার ট্রাইব্যুনাল বসার আগে ১০টা ৪০মিনিটে গোলাম আযমকে হাজতখানা থেকে ট্রাইব্যুনালের এজলাস কক্ষে নিয়ে আসা হয়। ১১টা থেকে রায় পাঠ শুরু করা হয়। প্রথমে রায় পাঠ শুরু করেন ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি আনোয়ারুল হক, দ্বিতীয় পর্যায়ে অপর সদস্য মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ও সর্বশেষ রায়ের সমাপ্তি ও ঘোষণা করেন চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর।

ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণার সময় রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও প্রসিকিউশনের সমন্বয়ক এমকে রহমান, ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর, তদন্ত সংস্থার প্রধান ককর্মকর্তা আবদুল হান্নান খানসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও বিচারের দাবিতে সোচ্ছার ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ব্যক্তিবর্গরা উপস্থিত ছিলেন।

রোববার প্রথমে গোলাম আযমের মামলার রায় সংক্রান্ত ঘোষণার তারিখ ট্রাইব্যুনাল ঠিক করে দেন। পরে প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম সাংবাদিকদের বলেন, ‘মামলাটির বিচার কার্য শেষে পক্ষগণের যুক্তি-তর্ক শুনানি অন্তে ট্রাইব্যুনাল মামলাটির রায় ঘোষণার বিষয়টি অপক্ষেমাণ রেখেছিল।’

মামলাটির রায় ঘোষণার জন্য আজ কার্য তালিকায় ছিল। এ রায়ের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একাত্তরের অভিযোগে পঞ্চম রায় ঘোষণা করলেন। এর আগে ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে তিনটি এবং ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে একটি রায় দেওয়া হয়েছে।

গত বছরের ১১ জানুয়ারি গোলাম আযমকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে জামিনের আবেদন জানান। এ আবেদন নাকচ করে দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

এরপর ১৩ মে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দিয়ে ৫ জুন তার বিরুদ্ধে (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য তারিখ ধার্য করে দেওয়া হয়। কিন্তু আসামিপক্ষের আইনজীবীরা মামলা স্থানান্তরসহ কয়েকটি আবেদন করায় ওইদিন ওপেনিং স্টেটমেন্ট শুরু হয়নি।

এর আগে ওই বছরের ৯ জানুয়ারি তার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ২০১১ সালের ৩১ অক্টোবর গোলাম আযমের বিরুদ্ধে তদন্ত কাজ শেষ করেন তদন্তকারী কর্মকতারা। পরে তদন্ত কর্মকর্তারা প্রসিকিউশনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে মোট ৩৬০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনের পাশাপাশি ১০ হাজার পৃষ্ঠার নথিপত্র সংযুক্ত করা হয়।

জামায়াতের এই নেতার বিরুদ্ধে গত ১ জুলাই ট্রাইব্যুনালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক ও ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুনের জবানবন্দি পেশের মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। এরপর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবউদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম ওরফে এসপি মাহাবুব, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, মানবাধিকার কর্মী ও মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, বাংলা একাডেমীর সহকারী গ্রন্থাগারিক এজাব উদ্দিন মিঞা, সেলিনা আফরোজ, কাজী আইয়ুব, ডা. মুনিয়া ইসলাম চৌধুরী, ড. স্বপন কুমার বিশ্বাস, এস আই আমিনুল, জামিনুর শেখ, শাফিউদ্দিন আহম্মেদ, সোনা মিয়া, আনোয়ারা বেগম, বিশিষ্ট সুরকার ও গীতিকার মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল এবং শেখ ফরিদ আলম। আসামিপক্ষ তাদের জেরা করেছে।

এ ছাড়া প্রসিকিউশনের ১৬তম সাক্ষী হিসেবে আমেরিকা প্রবাসী মহসিন আলী খানের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া জবানবন্দিকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply