সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভে সিয়াম সাধনা

—-মো. আলী আশরাফ খান
আমরা জানি, প্রত্যেক মানুষের মাঝেই দু’টি প্রবৃত্তি বিদ্যমান। সুপ্রবৃত্তি আর কুপ্রবৃত্তি। সুপ্রবৃত্তি মানুষকে সত্য-সুন্দর আলোর পথে পরিচালিত করে। আর কুপ্রবৃত্তি অন্ধকার-ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে। এই দুই প্রবৃত্তির বৈরীতা একজন মানুষ যতদিন বাঁচবে ততদিন চলবে এটাই স্বাভাবিক। মানুষের মধ্যে যে কুপ্রবৃত্তি রয়েছে, সে কুপ্রবৃত্তি মানুষকে অন্যায়-অনাচারে লিপ্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে। কুপ্রবৃত্তির এই তাড়না থেকে আত্মরক্ষার উপায় এবং উন্নততর আদর্শের অনুসারী হওয়ার উদ্দেশ্যেই রমযানের রোযা পালনের বিধান করা হয়েছে। মানুষ যাতে কুপ্রবৃত্তিকে দমন করতে পারে, শরীয়তের বিধান পালন করতে পারে এবং যাবতীয় অকল্যাণকর কাজ থেকে আত্মরক্ষা করে আল্লাহ পাকের অনন্ত-অসীম রহমতের যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে এ উদ্দেশ্যেই আল্লাহপাক রমযানের সিয়াম সাধনার বিধান প্রর্বতন করেছেন। অন্যান্য ইবাদতে লোক দেখানো ইবাদতের সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু রোযার মধ্যে এই সম্ভাবনা নেই। রোযা শুধু আল্লাহ পাকের জন্যই পালন করা হয়। রোযা মানবের জন্য এক অফুরন্ত নেয়ামত। শুধু তাই নয়, এটি স্রষ্টা প্রদত্ত এক অমীয় সুধা সমগ্র মানবজাতির জন্যই।
রোযার-সিয়াম সাধনার ব্যাপকতা বহুল। মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন রমযানের ঐতিহাসিক পটভূমির প্রতি ইঙ্গিত করে কুরআন পাকে এরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পারো”। এখানে মুসলমানদের প্রতি রোযা ফরজ হওয়ার নির্দেশটি একটি বিশেষ ব্যবস্থার কথা উল্লেখিত হয়েছে। শুধু নির্দেশই নয় এটাও বলা হয়েছে যে, রোযা শুধু তোমাদের উপরই ফরজ করা হয়নি, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের উপরও ফরজ করা হয়েছিল। এই কথাগুলোর দ্বারা যেমন রোযার বিশেষ গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে তেমনি মুসলমানদের এই মর্মে একটা সাস্ত¡নার ইঙ্গিতও রয়েছে যে, রোযা একটি কষ্টকর ইবাদত সত্য, তবে তা শুধু মুসলমানদের উপরই ফরজ হয়নি, তাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর উপরও ফরজ করা হয়েছিল।
বিশ্ববিখ্যাত তাফসীরকার আল্লামা আলুসী (রহঃ)-এর মতে, হযরত আদম (আঃ) এর প্রতি রোযার হুকুম ছিল। কিন্তু সেই রোযার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় না। অন্যান্য তাফসীর বিশারদগণও এ ধরনের মত পোষণ করেছেন। আরেফ বিল্লাহ শাইখুল ছিন্দ আল্লামা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) উপরোক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, ‘রোযার হুকুম আদম (আঃ) এর যুগ হইতে যথারীতি আজ পর্যন্ত বিদ্যমান রয়েছে’। পৃথিবীর প্রথম যুগের প্রথম শরীয়তধারী নবী হযরত নূহ (আঃ)-কে লক্ষ্য করেই আল্লাহ পাক কুরআনে বলেছেন, “লাইইউমিনা মিন কাওমিকা ইল্লামান ক্বাদ আমানা”। অর্থঃ যারা ঈমান এনেছে তারা ছাড়া আর কেহই ঈমান আনবে না”। তখন হযরত নূহ (আঃ) অতিষ্ঠ হয়ে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেন,‘রাব্বিলাতাবার আলাল আরদ্বি মিনাল কাফিরীনা দাইয়্যারা’। অর্থঃ হে আমার পালনকর্তা পৃথিবীর বুকে যেন কোন কাফেরের গৃহ অবশিষ্ট না থাকে”।
কেয়ামতের দিন শাফায়াতের জন্য উন্মতগণ সর্বপ্রথম হযরত নূহ (আঃ)-এর নিকট যাবে। এই কারণেই হযরত নূহ (আঃ)-কে পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম রসূল হিসেব ঘোষণা করে।” ইমাম ইবনে কাসীর (রহঃ) তাফসীরে ইবনে কাসীরে লেখেছেন, হযরত যাহহাক (রহঃ) বলেছেন,“হযরত নূহ (আঃ)-এর যুগ হতে প্রত্যেক মাসেই তিনটি রোজা পালন করার হুকুম ছিল। তারপর যখন রমযানের রোযা পালনের হুকুম হল, তখন হতে প্রতি মাসে তিনটি রোযা পালনের হুকুম প্রবর্তিত হল। হযরত মুসা (আঃ) ও হযরত দাউদ (আঃ)-এর সময়েও রোযা পালনের নির্দেশ ছিল বলে জানা যায়। মহান আল্লাহ পাক যখন হযরত মুসা (আঃ)-কে তুর পর্বতে ডেকে তাওরাত কিতাব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিলেন, তখন আল্লাহ পাক হযরত মুসা (আঃ)-কে সেখানে ৩০ রাত অবস্থানের নির্দেশ দিলেন। এ সম্পর্কে কুরআন মাজীদে এরশাদ হয় যে, “আর স্মরণ কর ঐ সময়কে যখন আমি মূসার জন্য ৩০ রাত নির্ধারণ করেছিলাম এবং আরো ১০ দ্বারা পূর্ণ করেছিলাম। এভাবে তার পালনকর্তার নির্ধারিত ৪০ রাত পূর্ণ হয়।”
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে, হযরত মুসা (আঃ) যিলক্বদ এবং যিলহজ্বের ১০ দিন রোযা পালন করে আল্লাহ পাকের দরবারের হাজির হন এবং তাওরাত কিতাব প্রাপ্ত হন এবং হযরত ইবনে ওমর (রাঃ)-কে প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) রোযা পালনের আদেশ স্বরূপ এরশাদ করেন যে, ‘ছুম আফদ্বালাছ ছিয়ামি ইনদাল্লাহি ছাওমা দাউদা আলাইহিস সালামু কানা ইয়া ছাওমু ইয়াওমাও ওয়াইয়াফতুরুর ইয়াওমান। অর্থঃ আল্লাহর নিকট যে রোযা উত্তম সে রোযা রাখ, আর সেই রোযা হলো-যা হযরত দাউদ (আঃ) রেখেছেন। হযরত দাউদ (আঃ) একদিন রোযা রাখতেন আর একদিন ইফতার করতেন। এই হাদীস দ্বারা জানা যায়, হযরত দাউদ (আঃ) রোযা রাখতেন। শুধু তই নয়, বাইবেল ‘দার’ বাদশাহের যুগে বাইতুল লাহমের বাসিন্দা এবং বনি ইয়াহুদাদের প্রতি রোযা রাখার বিষয় সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এমনি করে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সব শরীয়তেই রোযার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির এই কঠোর সাধনার প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। এছাড়াও ধর্ম, গোত্র নির্বিশেষে সকলের মধ্যেই রোযা পালনের তথ্য পাওয়া যায়। তাকওয়া অর্জন, আত্মশুদ্ধি ও স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনে রোযা আদি যুগ হতেই বিভিন্ন বর্ণক্ষেত্র এবং ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। প্রাচীন চীনা সম্প্রদায়ের লোকেরা একাধারে কয়েক সপ্তাহ রোযা রাখত। অনুরূপ রোযা রাখার রেওয়াজ খৃস্টান পাদ্রী, পারসিক, অগ্নিপূজক এবং হিন্দুযোগীদের মধ্যে লক্ষ্য করা যেত। অবশ্য পারসিক এবং হিন্দু যোগীদের ও রোযা ছিল, কিন্তু তারা রোযা থাকা অবস্থায় মাছ, গোশত, তরিতরকারি ইত্যাদি খাওয়া থেকে বিরত থাকতো বটে, ফলমূল এবং কিছু কিছু পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকত না।
ইসলামে রোযার যে নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা এই দুই বিপরীতমুখী নিয়মের মধ্যপন্থা স্বরূপ। ইসলামে রোযা একদিকে যেমন কঠোরতা বিবর্জিত অপরদিকে এর বাস্তব রূপ আংশিকভাবেও প্রতিষ্ঠা পায়নি। অর্থাৎ এখানে দীর্ঘ সময় একাধারে রোযা রাখাও যেমন নিষিদ্ধ করা হয়েছে তেমনিভাবে রোযাদরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার হতেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। একদিকে সূর্যাস্ত যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যেকোনো বস্তু পানাহার, যেকোনো ভাবেই হোক না কেনো সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ‘ইয়্যাকুম ওয়ালা বিছালা ওয়ালা ছামা মান ছামা দ্বাহারা”।
অর্থঃ একাধারে রোযা রাখা নিষেধ, যারা সব সময় রোযা রাখে, ইসলামের দৃষ্টিতে তা রোযাই নয়।” তিনি আরও বলেন, “লা ইয়াযালুন্নাছু বি খাইরিন আজ্জালু ইফতিরা”। অর্থঃ মানুষের জীবনে সত্যের আলো বিদ্যামান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নির্ধারিত সীমায় গ-িবদ্ধ থেকে যথাসম্ভব ইফতার তাড়াতাড়ি করবে।” রোযার ব্যাপকতা প্রসঙ্গে আরও বলা যায় যে, পূর্বের যুগে রোযা কোন বিশেষ জাতির ওপর জরুরি বিবেচিত হত। যেমন প্রাচীন হিন্দুদের বিশ্বাস ছিল, রোযা শুধু তাদের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিবর্গ ব্রাহ্মণদেরই পবিত্র দায়িত্ব। আবার গ্রীকরা বিশ্বাস করতো, রোযা একমাত্র নারীদের উপর বাধ্যতামূলক, এটা পুরুষদের ইবাদত নয়। কিন্তু ইসলাম এ ব্যাপারেও মধ্যম পন্থা অবলম্বন করেছে।
ইসলাম এত বড় গুরুত্বপূর্ণ এবাদতকে শুধু নারী সম্প্রদায় বা কোন বিশেষ ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং রোযার প্রশ্নে ইসলাম সাম্যের নীতি গ্রহণ করেছে। এখানে ধনী-গরীব, বাদশা-ফকির, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে। সবাইকে রোযার শর্তাবলী অবলম্বনপূর্বক রোযা রাখতে হবে। প্রত্যেকটি মানুষ যেমন যেন রোযার বরকত এবং ফয়েজ লাভ করতে পারে-এটাই রোযার ব্যাপকতার মুখ্য উদ্দেশ্য। বাহ্যত ধনী ব্যক্তি রোযার মাধ্যমে গরীবের দুঃখ কষ্ট বুঝতে পারবে, এটাই শুধু রোযার পবিত্র উদ্দেশ্য নয়। তাকওয়া অর্জনের প্রশ্নে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের জন্যই রোযা ফরজ করা হয়েছে। রোযার ফরজ ও বরকতে প্রত্যেকটি মানুষ সংগ্রামী হবে, সংবেদনশীল হবে, সহানুভূতিশীল হবে। এটাই রোযার প্রকৃত উদ্দেশ্য। সম্পদ ও পদ মর্যাদার প্রশ্ন যাতে মানুষ সমাজে পাহাড়সম পার্থক্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, এরূপ মহৎ উদ্দেশ্যে রোযা ফরজ করা হয়েছ। সমাজে ধনী-দরিদ্র ও উচ্চ-নীচ সকলের জন্য ফরয করা হলেও ক্ষেত্র বিশেষে এই নিয়মেরও শিথিলতা রয়েছে। রোগাক্রান্ত ব্যক্তি, বৃদ্ধ এবং গর্ভবতী নারী অর্থাৎ যাদের রোযা রাখার ক্ষমতা নেই তাদের জন্য রোযা পালনে শিথিলতা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেন, “ফামান কানা মিনকুম মারিদ্বান আওআলা ছাফারিন ফাইদ্দাতুম মিন আইয়্যাম উখারা ওয়া আলাল্লাযীনা ইউতিমুনাহু ফাদ্বিয়াতু ত্বায়ামি মিসকিনিন”।
অর্থঃ তোমাদের মধ্যে যে কেউ অসুস্থ অথবা প্রবাসে থাকবে তার জন্য অন্যান্য দিন উল্লিখিত সংখ্যক রোযা রাখতে হবে। আর যারা রোযা রাখতে অক্ষম হইবে তাদেরকে বদলাস্বরূপ (একদিনের জন্য) একজন মিসকিনকে খাবার দিতে হবে”। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের উপর প্রগাঢ় বিশ্বাস সৃষ্টির অনুপম দৃষ্টান্ত রোযা বা সিয়াম সাধনার প্রথম বৈশিষ্ট্য। রোযা রাখার মধ্য দিয়ে ব্যক্তির অন্তরে আল্লাহর প্রতি ঐকান্তিক বিশ্বাস জন্মে এবং আল্লাহর প্রেমে মত্ত হয়ে তার অন্তর উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। তার অন্তরে বিশ্বাস প্রতিস্থাপন হয় যে, আল্লাহ পাক সর্বশক্তিমান। তিনি বিচার দিনের মালিক। যার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে মানুষ ক্ষুধা, পিপাসা, কাম-ক্রোধ, লোভ-লালসা ইত্যাদি যতরকম স্রষ্টা কর্তৃক নিষিদ্ধ কর্ম পরিত্যাগ করে রোযা পালনে ব্রত হয়ে থাকে।
রোযা বা সিয়াম সাধনার আরেকটি মুখ্য উদ্দেশ্য হল, আখলাক-চরিত্র সংশোধন। রোযা মানুষের ভিতর ও বাহির দুই দিকেই সংশোধন করে থাকে। মানুষের ভেতরের অবস্থা পরিবর্তন করা অর্থাৎ নূরান্বিত করা এবং তার স্বভাব প্রকাশ্যভাবে সুন্দর ও নান্দনিক রূপে গড়ে তোলার মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে এই রোযা বা সিয়াম সাধনার অতি উত্তম পথ অবলম্বন। এই রোযা বা সিয়াম সাধনার চর্চায় মানুষ লাভ করে এক অমিয় সুধা। এটা এক অফুরন্ত নেয়ামত স্রষ্টা প্রদত্ত মানুষের জন্য। এতে মানুষ দুনিয়ার লোভ-লালসা, অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের ব্যাধি হতে পরিত্রাণ পাওয়ার সুযোগ লাভ করে। আর এটা অন্তরের বিশুদ্ধতার দ্বারাই অর্জন হয়। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এ প্রসঙ্গে বলেন, “মানুষের শরীরের মধ্যে একটুকরা গোশত রয়েছে, যতক্ষণ তা ভাল থাকবে সমস্ত শরীর ততক্ষণ ভাল থাকবে। আর এটা যার বিগড়ে যাবে তখন গোটা শরীর বিগড়ে যাবে। শুনে রাখ! সাবধান! তা হচ্ছে ক্বলব।”
রোযা-সিয়াম সাধনায় ক্বলবকে সুষ্ঠু ও পবিত্র রাখার পূর্ণ ব্যবস্থা বিদ্যমান। আর এই ক্বলব’র (অন্তরের) অবস্থানকে পবিত্র ও নির্মল করার জন্য নামাযের পরই রোযার স্থান।
পবিত্র কুরআন ও হাদীসে রোযা সম্পর্কে অসংখ্য ব্যাখ্যা ও প্রমাণ রয়েছে। এক হাদীসে ‘সবর’ আলো অর্থাৎ রুহানী আলো। এমনি করে অসংখ্য হাদীস রয়েছে এই নিয়ামত রোযা বা সিয়াম সাধনাকে ঘিরে।
সবচেয়ে বড় কথা এই রোযা রাখার মধ্য দিয়ে মানুষ তার নিজের ‘নফস’কে পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে অভ্যস্ত হয়। আর এই রমযানের শিক্ষাকে বলা হয় “ধৈর্যের এক অনুপম শিক্ষা”। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, “যারা ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ পাক তাদেরকে পরিপূর্ণ পূণ্যদান করেন”।
রমযানের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এরা অন্তর্ভূক্ত হলো-মানুষ আল্লাহ পাকের অসংখ্য নেয়ামতের শোকর গুজারী করবে বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। “যদি তোমরা শোকর আদায় কর নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য নিয়ামত বাড়িয়ে দিব। আর যদি নিয়ামতের না শোকরী কর তাহলে নিশ্চয়ই আমার শান্তি খুবই ভয়ংকর”। কাজেই রোযার মাধ্যমে মানুষ শোকর আদায় করতে শিখে এবং আল্লাহ পাকের হুকুমের কদর বুঝতে পারে। এ সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও এরশাদ করেন, “আল্লাহ পাকের প্রদত্ত হেদায়েতের উপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এবং কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর। আল্লাহ পাকের মহব্বতে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে তোমারা উন্নত হয়ে যাও”।
হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে যে, ‘তোমার দুনিয়ার চাকচিক্য, আমোদ-প্রমোদ ও ধন-সম্পদের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে নিন্মস্তরের ব্যক্তিকে লক্ষ্য করবে তাহলেই তোমরা আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামত সমূহের মূল্য বুঝতে সক্ষম হবে’। রোযা তথা সিয়াম সাধনার বৈশিষ্ট্য সমূহের মধ্যে এটাও উল্লেখযোগ্য যে, ‘মানুষের মধ্যে পরস্পর স্নেহ ভালবাসা, মায়া, মমতা, আন্তরিকতা এবং সমবেদনার জন্ম দেয়া। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, ‘যে ব্যক্তি রোযাদারকে ইফতার করাবে তাকে রোযাদার ব্যক্তির সমান সওয়াব দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি রোযদারকে খানা খাওয়াবে, আল্লাহ পাক তাকে হাউজে কাওসারের পানি পান করাবেন। অতঃপর তিনি জান্নাতে এমনাবস্থায় প্রবেশ করবেন যে, হাশরের ময়দানে তার পিপাসা লাগবে না। আর যে কেউ রমযানে তার কর্মচারীদের সাথে নম্র ব্যবহার করবে, আল্লাহ পাক তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন’।
ইসলামে নির্ধারিত প্রত্যেকটি ইবাদতই একমাত্র আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভের জন্য হয়ে থাকে। রোযার মাধ্যমেও মানব জাতি আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনকে পাওয়ার জন্য ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালায়। মানুষ তার সমস্ত কামনা বাসনা পরিত্যাগ করে বিভিন্ন কষ্ট সহ্য করে আল্লাহ পাককে পাওয়ার প্রত্যাশী হয়ে এবং এখলাসের সাথে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় রোযা রাখে এবং ধৈর্যের সাথে সমস্ত কষ্ট সহ্য করে তাহলে সে অবশ্যই সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারবে।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, ‘হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ পাক বলেন, মানুষের প্রত্যেকটি কাজই তার নিজের জন্য। কিন্তু রোযা একমাত্র আমার জন্য। অতএব, আমিই রোযার পুরস্কার প্রদান করব”।
হাদীসে আরও বর্ণিত আছে, ‘রোযা মানুষের জন্য ঢাল স্বরূপ, তাই তোমরা রোযা রাখ। রোযা রেখে ভাল কথাবার্তা বল। যদি কেউ গালি গালাজ বা ঝগড়া বিবাদ করে, তাহলে তাকে বলে দাও, ভাই আমি রোযা রেখেছি। ঐ আল্লাহর কসম করে বলছি, যার মুঠোতে আমার প্রাণ রোযাদার ব্যক্তির মুখের গন্ধ মেশক আম্বরের সুগন্ধি হতেও আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। রোযাদারের জন্য দু’টি খুশির সময় একটি ইফতারের সময়, অপরটি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়। অনুরূপভাবে পবিত্র রমযানকে ঘিরে রয়েছে অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি। যা মানব জাতি তথা আমাদেরকে স্রষ্টার নৈকট্য লাভে সর্বোত্তম পন্থার দোর উন্মোচন করে। এক কথায়, সিয়াম সাধনা সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভের অন্যতম উপায়।

লেখক: কবি, কলামিস্ট ও গবেষক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply