মানবাধিকার পরিস্থিতি: আর কত উৎকণ্ঠা

—-এম.আবদুল হাই

আবেশ প্রাণে আমরা ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ পড়ে-শুনে আসলেও সি বাস্তবতার বিপরীত মেরুতে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিনা বিচারে হত্যা, গুম ও নিপীড়নের ঘটনা সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক সম্প্রতি ১৫৯টি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনটি মানবাধিকার লংঘনের ভয়াবহতায় উদ্বেগ জানিয়ে এর বাংলাদেশ অংশে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীকার সত্ত্বেও এখানে ভয়াবহ মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটছে। গত বছরের ঘটনাসমূহের উপর ভিত্তি করে প্রস্তুতকৃত বার্ষিক এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনা বিচারে ৩০ জনকে হত্যা করা হয়েছে, গুম হয়েছে ১০ জন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবাহিনীর হাতে অসংখ্য মানুষ নির্যাতনের শিকার। একইভাবে রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু, নারী নির্যাতন, আদিবাসীদের রক্ষায় ব্যর্থতা, কারখানায় অগ্নিকান্ডে মৃত্যু ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনারও উল্লেখ রয়েছে। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরে গুম হওয়া অধিকাংশ হতভাগ্যেরই কোন সন্ধান মেলেনি। নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামকে তুলে নিয়ে যাওয়া ও পরবর্তী সময়ে তার লাশ পাওয়ার ঘটনাটিও প্রতিবেদনে যুক্ত হয়েছে। এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর ক্রসফায়ারের দাবিকে নিহতদের স্বজনরা যে নাকচ করে ভিন্ন কথা বলেছেন, তারও উলে¬খ আছে এ প্রতিবেদনে।
একইভাবে এ বছরও কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন একাধিক ব্যক্তি। যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা সাঈদীর মৃত্যুদন্ডাদেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতাসহ বেশ কিছু সংঘর্ষের ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে শতাধিক ব্যক্তির এবং ৫ মে’ হেফাজতের অবস্থান কর্মসূচির ওপর আইন-শৃংখলা বাহিনীর ক্র্যাকডাউনে মারা গেছেন অনেকে। কয়েকদিন পূর্বে যুগান্তরে দেখা গেছে, হত্যা মামলায় জড়িত সন্দেহে এক যুবককে গ্রেফতারের পর তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে পুলিশ। একই দিনের পত্রিকায় আরো উল্লেখ রয়েছে, চট্টগ্রামে হাত-পা বাঁধা অজ্ঞাতনামা দু’জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যেদিন এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, সে দিনও রাজধানীর উত্তরায় র‌্যাবের ক্রসফায়ারে দু’জন নিহত হবার ঘটনা ঘটে। অথচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেনেভায় মানবাধিকার বিষযয়ে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বলেছিলেন, দেশে কোনো ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটছে না। আর প্রধানমন্ত্রী ২০১২ সালে জানুয়ারিতে মন্তব্য করেছিলেন, দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরও যখন অস্বীকার করা হয়, তখন বহির্বিশ্বে আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের ভাবমূর্তি। বহির্বিশ্বে আমাদেও জাতীয় ভাবমূতি কোথায় গিয়ে দাড়াচ্ছে। বিভিন্ন মিডিয়ার প্রতিবেদন ও মন্তব্যে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশে আইনের শাসন ও মান নিয়ে ভাববার কি কেউ নেই?
বলতে গেলে বর্তমানে দেশে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিনা বিচারে হত্যা ও গুমের ঘটনার অভিযোগ যেমন বেড়ে চলেছে, তেমনি পুলিশি নিরাপত্তায় মৃত্যুর অভিযোগও কম নয়। অপরদিকে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের রিমান্ডের নামে নির্যাতন এমনকি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে হাজির করা হচ্ছে। এত নিপীড়নমূলক শাসনে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার নানাভাবে খর্বসহ জরুরি অবস্থা জারি না করেও মানুষের সভা-সমাবেশ করার মতো মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে। তবে স্বাধিন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে কেউ অস্থিতিশীল কিংবা কোনপ্রকার নৈরাজ্য সৃষ্টির মত মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথে উস্কে দেয়া বা ধাবিত করাকেও কোনমতেই সমর্থনযোগ্য নয় এবং রুখতে হবে আলোচনা ও কৌশলের মাধ্যমে শান্তি বজায় রেখে। একই প্রতিবেদনে বেশ কিছু অপমৃত্যুর কথা বলা হলেও মূলত: অপমৃত্যুই যেমনি দেশের মানবাধিকার লংঘনের একমাত্র দিক নয় তেমনি পুলিশি নির্যাতন ও হয়রানি, নারী নির্যাতন, শিশুশ্রম ব্যবহার, সংখ্যালঘু নির্যাতন ইত্যাদির চিত্র পাল্টায়নি এ বছরও। তম্মধ্যে সাভারের রানা প¬াজা ধসে সহস্রাধিক পোশাককর্মীর মৃত্যু ছিল এ বছরের মানবাধিকার লংঘন সংশ্লিষ্ট সবচেয়ে বড় ঘটনা হলেও এর উদ্ধার ও উত্তরণে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সকললের গভীর আন্তরিকতার পরিচয় অশ্রুস্নাত-লক্ষণীয় এক সাফল্য।
এক দিকে রাজপথে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মানুষকে গুলি করে হতাহত করা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বাংলাদেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও জীবনের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলছে। জনসমাবেশ ভূল করার জন্য রাতের আঁধারে বাতি নিভিয়ে নজিরবিহীন অভিযান চালানোর ঘটনায় আহত-নিহতের সমম্বিত সঠিক ও সুনির্দিষ্ট সঠিক তথ্য না থাকায় সৃষ্ট ধুম্রজালে নিহতের চেয়ে আশংকা ছড়িয়েছে অধিক। যে কোন সংকট, অচলবস্থা, অস্থিরতা নিরসনে ঐক্যমতে পৌচতে নাপারলে দেশে অবাঞ্ছিত ও অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সর্বোপরি মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার এদেশের সাধারণ নাগরিকগণই তথা গণমানুষই অধিকতর ভুক্তভোগী। শুধু লন্ডনভিত্তিক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালই নয় প্রতিবছর মানবাধিকার বিষয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে অন্যান্য দেশী ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণও প্রায় একই রকম প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। এ অবস্থার অবসানে মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে পুরোপুরি। তাছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে যেসব মৃত্যু ঘটছে, রাজনৈতিক পরিবেশের উন্নয়ন ঘটিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তা’ও তো রোধ করা সম্ভব। সরকার অন্তত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা রোধে আরো অধিক দৃষ্টি দেবে বলে আমরা জনগণ আশঅবাদী। ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ অন্তরে লালন সাপেক্ষে মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকার, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ দেশের সর্বস্তরের জনগণ আন্তরিক স্বচেষ্ট-সজাগ থাকব এই প্রত্যাশা।

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply