ধুমপান বন্ধে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তিই প্রবল

—-আবদুর রহমান
১৯৮৭ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে প্রতি বছর ৩১ মে পালিত হয়ে থাকে বিশ্বতামাকমুক্ত দিবস। এবারে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত প্রতিপাদ্য হলো ‘‘তামাকের ব্যবহার প্রতিরোধে বিজ্ঞাপন ও স্পনসরশীপ বন্ধ করা জরুরি।’’ শুধু আমার কথা নয়, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে তামাকে ৪০০০ এর বেশি কেমিক্যালস আছে যার মধ্যে কমপক্ষে ২৫০টি কেমিক্যালস স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত এবং ৫০টির বেশি কেমিক্যালস যা ক্যানসার সৃষ্টির জন্য দায়ী। বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে অল্প বয়সের ছেলে মেয়েদেরকে তামাক চাষে নিয়োগ দেয়া হয় যারা ‘গ্রীন টোব্যাকো’ নামের এক প্রকার অসুখে আক্রান্ত হয়। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ তামাকের ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্যান্সার, হার্টের বিভিন্ন রোগ, স্ট্রোক, চুলপড়া, চোখে ছানি পড়া, শ্বাসকষ্ট ও পায়ে পচন সবই তামাক ব্যবহারের কারণে হয়ে থাকে। জর্দা ও সাদা পাতা ব্যবহারের ফলে খাদ্যনালীতে ক্যান্সার হয়। গর্ভবতী মা ও শিশু তামাকের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতি বছর বিশ্বে ৬০ লক্ষ লোক তামাকের ব্যবহারজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। অনেকে ধূমপান না করলেও ধূমপায়ীর সৃষ্ট ধোঁয়ার কারণে বায়ু দূষণের ফলে অনৈচ্ছিক ধূমপানের শিকার হন। ফলে একজন অধূমপায়ীও তামাকজনিত ধোঁয়ার কারণে বিভিন্ন রোগের শিকার হন। উল্লেখিত ৬০ লক্ষের মধ্যে ৬ লক্ষ লোক নিজে ধূমপান করে না কিন্তু ধূমপায়ীর ধূমপানজনিত কারণে পরোক্ষ ধূমপায়ী হিসেবে মৃত্যুবরণ করে। বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি বছর ৮০ লক্ষ লোক ধূমপানজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করবেন, যার প্রায় ৮০% এর বেশি নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষিতের হার বেশি ও ব্যাপক সচেতনতার কারণে তামাকের ব্যবহার কমলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তামাকের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। এর কারণ হিসাবে তামাক কোম্পানী গুলোর ব্যাপক প্রচারণা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিরক্ষরতাকে দায়ী করা যায়।
বাংলাদেশে ১৩ ই মার্চ ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাস হয়। পরবর্তী সময়ে আইনের সংশোধনী আনা হয়েছে। আইনকে আরো যুগোপযোগী করতে হবে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের জন্য জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলামের অবদান অপরিসীম। ধূমপানের লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ধূমপানের যত ক্ষতি সবই নিজের, পরিবারের ও রাষ্ট্রের। লাভ শুধু তামাক কোম্পানীর। ধূমপায়ী নিজের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করেন এবং পরিবেশকে দূষিত করেন। তাছাড়া সীমিত আয়ের লোক তাঁর আয়ের একটি অংশ ধূমপানে খরচ করেন। ফলে তার পরিবার প্রয়োজনীয় ভোগ থেকে বঞ্চিত হয়। একজন ধূমপায়ী বিভিন্ন সময় অসুস্থ থাকেন বিধায় কর্মস্থলে ঘন ঘন অনুপস্থিত থাকেন। তাই তামাকের অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেক বেশি। অনেকে বলেন থাকেন চেষ্টা করেও ধূমপান ছাড়তে পারছি না। তামাকে নিকোটিন নামে যে রাসায়নিক উপাদান বিদ্যমান থাকে তা আসক্তি সৃষ্টি করে। ফলে তামাক বর্জন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তবে দৃঢ় ইচ্ছশক্তি, সহকর্মী, পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবের উৎসাহজনক সহযোগিতা নিশ্চিত করে ধূমপান বর্জন করা সম্ভব। তবে এ ব্যাপারে প্রবল ইচ্ছশক্তিই বেশি কার্যকর।
তামাকের বিজ্ঞাপন ও স্পনসরশীপ বন্ধ করে অপরদিকে তামাকের ক্ষতিকর বিষয় ও কুফল গুলো ছবিসহ তুলে ধরলে এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের ছবি এঁকে কোথায় কী কী রোগ হয় ইত্যাদি বর্ণনা করে, বিভিন্ন সাইজের পোস্টার, লিফলেট বিলি-বণ্টন করা হলে এবং সিগারেটের প্যাকেটে এই সমস্তসতর্কবাণী বড় বড় অক্ষরে লিখে দৃষ্টিগোচর করতে পারলে জনগণ তামাকের কুফল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারবেন এবং তামাকের কুফল তথা এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করে নিজেদের অজান্তে মনের মধ্যে একটি ভয়-ভীত জেগে উঠবে। এভাবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে তামাকের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা গেলে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন ও স্পনসরশীপ বন্ধ করে তামাকমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব হবে। সম্প্রতি আইনে সংশোধনীও আনা হয়েছে। প্রকাশ্যে ধূমপানের জরিমানা ৫০ টাকা থেকে বেড়েছে এখন ৩০০ টাকা। দোকানদার, ব্যবস্থাপকদেরও জরিমানার আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্যে ধূমপান নিয়ন্ত্রণে এই আইন কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে, এ নিয়ে বিভিন্ন মহলের প্রশ্ন উঠছে। ২০০৫ সালে আইন প্রনয়নের পর প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা বা জরিমানা আদায় সম্পর্কে কোনো তথ্য পায়নি। ‘প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধে প্রশাসন ও পুলিশের যৌথভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার কথা। দেখা যায়, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অন্যান্য প্রয়োজনে সরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা ব্যস্ত থাকেন। ধূমপান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে’। প্রকাশ্যে ধূমপান নিয়ন্ত্রণে রোজ রোজ অভিযান দরকার। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন সব সময় কাজ করতে পারে, আইনে এ সুযোগ থাকা দরকার। ধূমপান আইন মেনে না চলার প্রবণতা, জরিমানার পরিমাণ কম হওয়াএবং তামাক উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান গুলোর দাপটে এসব কারণে আইন প্রয়োগে হিমশিম খাচ্ছে সরকার।
বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সী চার কোটি ১৩ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে তামাক সেবন করছে। তারা পরোক্ষভাবে ক্ষতি করছে প্রায় এক কোটি ১৫ লাখ মানুষের। ধূমপান না করেও কেউ যেন পরোক্ষভাবে এর কুফলের শিকার না হন, এ লক্ষ্যে প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়। আইনে খোলা জায়গায়, পার্ক, মাঠ, বাস টার্মিনাল, স্টেশন, লঞ্চঘাট, রেস্তোরাঁ, খাওয়ার জায়গায়, যেখানে মানুষ জড়ো হয়, সেখানে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের সহোযোগিতায়, গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বিভিন্ন জেলায় মোট ২৫৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে সরকার। দেশে ৬৪টি জেলা থাকলেও অভিযান পরিচালিত হয়েছে মাত্র ২৯টি জেলায়। জরিমানা আদায় হয় মাত্র ৩৪ হাজার ৪২২ টাকা। এর মধ্যে ঢাকায় অভিযান হয়েছে মাত্র একটি। অভিযানটি পরিচালিত হয়েছে সদরঘাটে। প্রায়শঃ সব ক্ষেত্রে যাঁদের আইন মেনে চলার কথা, তাঁরা আইন মানছেন না। বাংলাদেশের যেকোন জেলা প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ভাষ্যমতে, তাঁরা আদালত চত্বরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে গিয়ে আইনজীবীদের রোষের শিকার হয়েছেন।
ইসলামি শরিয়তের বিধানমতে, ‘যে জিনিস নেশার উদ্রেক করে সে জিনিসের পরিমাণ কম হলেও তা হারাম।’ এ নীতিমালার আলোকে ধূমপানে নেশা কম হলেও এটা নিষিদ্ধ। কারণ, ধূমপানের বদভ্যাস মানুষকে আসক্ত করে আর সব ধরনের আসক্তিই হারাম। তাই ধূমপান নিষিদ্ধ ও বর্জনীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নেশাজাতীয় বস্তুু নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বলেছেন, ‘যাবতীয় নেশার বস্তু হারাম।’ (মুসলিম শরীফ) ইসলামের দৃষ্টিতে সব ধরনের অপব্যয় ও অপচয় পরিত্যাজ্য। আর্থিক অপচয়ের দিক বিবেচনায় ধূমপানজনিত ব্যয় একজন ব্যক্তির জন্য বড় ধরনের অপচয়। ধূমপানজনিত রোগের চিকিৎসার পেছনে ব্যয় আরও কয়েক গুণ বেশি। ধূমপানে অহেতুক প্রচুর অর্থ-সম্পদ অপব্যয় হয়। নেশার খরচ জোগাতে অনেক সময় ধূমপায়ীকে পরিবার থেকে জোরপূর্বক অথবা অন্য কারও কাছ থেকে ছিনতাই-চাঁদাবাজির মাধ্যমে অন্যায়ভাবে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়। নেশাগ্রস্ত হয়ে তারা ধর্মকর্ম ভুলে থাকে এবং নানা ধরনের অপকর্ম করে নিজের ও পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষতি, দুঃখ ও দারিদ্র্য ডেকে আনে। অনর্থক অপব্যয় অত্যন্ত গুরতর অপরাধ। পবিত্র কোরআনে অপচয় করতে নিষেধবাণী ঘোষিত হয়েছে, ‘তোমরা কিছুতেই অপব্যয় করবে না। নিশ্চয়ই যারা অপব্যয় করে, তারা শয়তানের ভাই।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৬-২৭)। এমনকি সিগারেটের বিজ্ঞাপনেও লেখা থাকে ‘সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।’ ধূমপান ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর, তেমনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও অমঙ্গলজনক। যেকোনো রোগীকে সর্বাগ্রে ধূমপান না করার চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া হয়। একখন্ড পরিচ্ছন্ন কাগজে মোড়া সিগারেট সুদৃশ্য হলেও তা জনস্বাস্থ্যের জন্য এমন ক্ষতিকর উগ্র নিকোটিনের বিষে ভরা, যা ইনজেকশনের মাধ্যমে কোনো সুস্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করালে তার মৃত্যু অনিবার্য।
ধূমপান ও তামাককে বিষপানের সমকক্ষ বললেই যথার্থ হয় না, বরং ধূমপান বিষপানের চেয়েও মারাত্মক। কেননা বিষপানে শুধু পানকারীরই ক্ষতি হয় আর ধূমপানে তার পরিবেশে অধূমপায়ী এমনকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও সর্বনাশ হয়ে থাকে। প্রত্যেক নাগরিকেরই নির্মল পরিবেশে সুস্থ-সুন্দরভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। একজন ধূমপায়ী নিজেকে নিঃশেষ করার পাশাপাশি অন্যদের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে পারে না। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে ধূমপানের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারণা ও গণসচেতনতা চালিয়ে ধূমপান প্রতিরোধ করা যায়। তা ছাড়া ধর্মীয় অনুশাসন মেনে সুস্থ জীবন যাপন করলে এবং ধূমপান ও তামাকমুক্ত স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখলে এ সমস্যার সমাধান করা যায়।
কাজেই শিক্ষক সমাজ যদি আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে, সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের একটি সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এবং তাদের তামাক, ধূমপান ও মাদকের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে সতর্ক করে তাহলে ছাত্র সমাজের মধ্যে তামাক ও মাদক সেবনের প্রবণতা কমে যাবে। মসজিদের ইমাম বা ধর্মীয় নেতারা জুমার খুতবাসহ বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠানে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নেশার অপকারিতা তুলে ধরে মানুষকে ধূমপান করা থেকে বিরত রেখে তাদের হেদায়েত করতে পারেন। ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’ (৩১ মে) কে আমাদের দেশে আরো ব্যাপকভাবে পালন করতে হবে। সকলে এই কুফল সর্ম্পকে সচেতন হতে হবে। আগামী জুলাই মাসে ৮/৯ তারিখে পবিত্র মাহে রমজান শুরু হলে তখন মুসলমানদের ধূমপান বর্জনের উপযুক্ত সময়। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ইচ্ছাই বেশি প্রয়োজন। যেহেতু ধূমপান কোনো উপকারে আসে না, বরং এতে মানুষের অনেক ক্ষতি হয়, তাই ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী সবারই স্বেচ্ছায়-সজ্ঞানে ধূমপানের বদভ্যাস অবশ্যই পরিত্যাগ করা বাঞ্ছনীয়।

————————
লেখকঃ আবদুর রহমান, কলাম লেখক
মাছিমপুর, তিতাস, কুমিল্লা।
ই-মেইল: m.a.rahman33@gmail.com
মোবাঃ ০১৫৫২ ৪৬ ৩৬ ১১

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply