কুমিল্লার চান্দিনা আল-আমিন কামিল মাদ্রাসা: অনিয়মই যেখানে নিয়ম

মাসুমুর রহমান মাসুদ, চান্দিনা :–
৬ জন শিক্ষক অনুপস্থিত ! অজুহাত হরতাল। ৫ জন শিক্ষক দস্তখত করে মাদ্রাসা ত্যাগ করেছেন। ১০ম শ্রেণীর ক্লাস হয়নি তাই দুই ঘন্টা শ্রেণি কক্ষে অলস সময় কাটিয়ে তৃতীয় ঘন্টায় মাদ্রাসা থেকে চলেগিয়েছে ৫ জন ছাত্রী। প্রধান গেটেই তাদের সাথে কথা হয় সাংবাদিকদের। পরে সরেজমিনে চান্দিনা আল-আমিন কামিল মাদ্রাসায় গিয়ে দেখাগেলো ৯ম শ্রেণিতে কোন শিক্ষক নেই, উপস্থিত ছিল ২ জন ছাত্রী। ১ম, ২য় ও ৩য় শ্রেণিতেও কোন শিক্ষক নেই। ক্লাস হয়নি বলে কোমলমতি শিশুরা শ্রেণি কক্ষে দুষ্টামি করে সময় কাটাচ্ছে। গতকাল বুধবার (২৯ মে) সময় তখন সকাল সাড়ে ১০টা। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে ৪র্থ শ্রেণিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা রুহুল আমিন ও ৯ম শ্রেণিতে সহকারী শিক্ষক মো. সফিকুর রহমান পাঠদান করতে যান।
শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই এমন ছবি তুলতে গেলে বাঁধা দেন ওই মাদ্রাসার প্রভাবশালী শিক্ষক সফিকুর রহমান। এসময় সাংবাদিকদের সাথে তিনি অশোভন আচরণ করেন। এমনকি উল্টো তার মোবাইলে সাংবাদিকদের ছবি তুলে বিভিন্ন হুমকি দেন। এদিকে সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে শ্রেণি কক্ষে বসে বসে পাঠ দান করেন শিক্ষকরা। নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় ছাত্র-ছাত্রীদের অনুপস্থিতর হার ক্রমেই বাড়ছে। কামিল শ্রেণিতে দ্বিতীয় বর্ষের নিয়মিত ছাত্র-ছাত্রী ৬৮ জন হলেও উপস্থিত ছিল মাত্র ১জন ছাত্র। কামিল প্রথম বর্ষে কোন ছাত্র-ছাত্রী উপস্থিত নেই। মাদ্রাসার এমন চিত্র শুধু গতকালের নয়। প্রতিদিন একই চিত্র বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, মাদ্রাসা চলাকালে অনেক শিক্ষকরা মাদ্রাসার বাইরে আড্ডা দিয়ে সময় কাটান। প্রতিষ্ঠাতা দাবিদার ২ ব্যক্তির মৃত্যুর পর মাদ্রাসাটির নজরদারি করার মত দায়িত্বশীল কেউ নেই। অধ্যক্ষ বহাল থাকলেও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে চলছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
চান্দিনা উপজেলা সদরে অবস্থিত উপজেলার মাদ্রাসা শিক্ষার সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান চান্দিনা আল-আমিন ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা। দীর্ঘ কয়েক বছর আগে কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাদ্রাসাটি কামিল শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত হয়। এবারের দাখিল পরীক্ষায় মাদ্রাসার ফলাফলও সন্তোসজনক নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দাখিল পরীক্ষায় ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের ফলাফলে শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ এলাকাবাসী হতাশা প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ঢাকা’র অধীনে অনুষ্ঠিত দাখিল পরীক্ষায় এবছর ওই মাদ্রাসায় পাশের হার ৫৪%। এবছর দাখিল পরীক্ষায় ওই মাদ্রাসা থেকে মাত্র ২৬ জন ছাত্র-ছাত্রী অংশ গ্রহণ করে। এর মধ্যে ১১ জন ফেল করে এবং ১ জন অনুপস্থিত থাকে। এদিকে বিজ্ঞান বিভাগের ১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৯ জনই ফেল করেছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে রসায়ন বিজ্ঞান বিষয়ে। রসায়ন বিজ্ঞানের লেকচারার থাকলেও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ওই বিষয়ে ফেল করায় এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অভিভাবকরা। যা অত্যন্ত হতাশাজনক বলে একাধিক পরীক্ষার্থীর অভিভাবকরা জানিয়েছেন।
অপরদিকে উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় হরতালের দিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের হাজিরা মনিটরিং করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও তা কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। আল-আমিন কামিল মাদ্রাসা গতকালের এই চিত্র উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জাকির হোসনকে জানালেও উপজেলা মিলনায়তনে সমন্বয়, আইন-শৃঙ্খলাসহ একাধিক জরুরি সভা থাকায় এ বিষয়ে তিনি কোন পদক্ষেপ নিতে পারেননি।
এ ব্যাপারে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা রুহুল আমিন জানান, হরতালের কারণে ৬ জন শিক্ষক অনুপস্থিত। ছাত্র-ছাত্রী না থাকায় কয়েকটি ক্লাসে শিক্ষক যাওয়ার প্রয়োজন হয় নি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার কানিজ আফরোজ জানান, ওই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের ঐক্য নেই। ভাল ফলাফল করার চেষ্টাও নেই। তারা কোন নিয়ম-শৃঙ্খলাও মানে না। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply