প্রতিষ্ঠার ৭ম বর্ষে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

কামরুল হাসান, স্টাফ রিপোর্টার :–

পথচলার ৭টি বছর কাটিয়ে দিল দেশের ২৫ তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৭ সালের ২৮ মে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম। মাত্র ৭ বছর অতিক্রম করলোও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। পাকিস্তান শাসনামলের প্রথম থেকেই শুরু হয় স্বপ্ন দেখা। তারপর রাজপথের আন্দোলন। কুমিল্লবাসীর প্রানের দাবী প্রাচীন সমতট ভূমির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন অঞ্চল কুমিল্লায় ১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। ১৯৬২ সালে সময় আসে স্বপ্ন বাস্তবায়নের। সিদ্ধান্ত হয় কুমিল্লায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। কিন্তু হায় ! কুমিল্লাবাসীর সেই স্বপ্ন ভঙ্গ করে তখনকার পূর্ব বাংলার কয়েকদিনের প্রধানমন্ত্রী ফজলুল কাদের চৌধুরী রাতের গভীরে চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গলে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন। যেটা প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কথা ছিল কুমিল্লায় তা বর্তমানে সুপ্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। চরম আঞ্চলিকতার শিকারে কুমিল্লাবাসীর স্বপ্ন এবং প্রাণের দাবীটি মুখ থুবরে পড়ে যায়। তারপর আবারো আন্দোলন। আবারো অপেক্ষা। দীর্ঘ ৪০ বছরেরও বেশী সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে কাঙ্খিত সেই বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য। দেশ স্বাধীনের পর অনেক সরকার পরিবর্তন হলেও কেউই কুমিল্লাবাসীর এই দাবীটি গুররুত্ব দেয়নি। অবশেষে চারদলীয় জোট সরকারের কুমিল্লার ১২ জন এমপির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০০৬ সালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাশ হয়। একই বছর ৭ ফেব্রুয়ারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঐতিহাসিক লালমাই ময়নামতির পাদদেশে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। অতি দ্রুত নির্মান কাজ সম্পন্ন করে ৩০০ জন ছাত্র ভর্তি, ৩০ জন শিক্ষক কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে ২০০৭ সালের ২৮ মে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম। শুরু হয় পথচলা।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ হলেও এর পথচলার ইতিহাস খুব বেশীদিনের নয়। এই স্বল্প ইতিহাসে শিক্ষার্থী এবং কুমিল্লাবাসী মিলাতে পারছে না তাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব। বাজনীতি ও ধুমপানমুক্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার ১ম বছর ভালভাবে কেটেছে। তারপরই শুরু হয় স্বার্থান্বেসী মহলের ষড়যন্ত্র। ষড়যন্ত্রের কবলে পডে বিদায় নিতে হয় প্রতিষ্ঠাতা ভিসি ড.গোলাম মাওলাকে। পরবর্তীতে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় রাবি’র কট্টর আওয়ামীপন্থি শিক্ষক ড. জেহাদুল করিমকে। তাকেও ভালভাবে কাজ করতে দেয়নি ষড়যন্ত্রকারীরা। রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিস্ট আন্দোলনের মুখে বিদায় নিতে হয় তাকেও। প্রতিষ্ঠার ৭ বছরের মাঝে গত ২০০৯ সালটি কেটেছে ব্যপক অরাজকতার মাঝে। অনিয়ম, দুর্নীতি, দলীয়করণ, রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষকদের অপরাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সৃষ্টি হয় অচলাবস্থা। ভিসির পদত্যাগ দাবীতে ছাত্রলীগের একাংশের আন্দোলন এবং হল দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ-শিবিরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ থাকে ৬ মাসেরও বেশী সময়। গত ২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর ভিসি পদত্যাগ করলে নতুন ভিসির দায়িত্ব দেয়া হয় জাবি’র পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড.আমির হোসেন খানকে। শিক্ষার্থী এবং কুমিল্লাবাসী আশায় বুক বেধেছিল বিশ্ববিদ্যালয়টি এবার আলোর পথে চলবে। তিনি দায়িত্ব গ্রহনের পর ক্যাম্পাসে অরাজকতা রোধকল্পে সকল প্রকার মিছিল মিটিং নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু এ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ছাত্রলীগের কমিটি গঠন এবং বিভিন্ন সময় ক্যাম্পসে রাজনৈতিক স্লোগানে মিছিল করলেও অজ্ঞাত কারনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিরব ভূমিকাই পালন করেছেন। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন অভিজ্ঞ শিক্ষকরা। শিক্ষক ও শ্রেনী কক্ষ সংকটের ফলে মারাত্মক সেশন জটের কবলে পরে শিক্ষার্থীরা। এ ব্যাপারে বর্তমান ভিসির নেই কোন কার্যকরী পদক্ষেপ। ঠুনকো বিষয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলনে বার বার অচল হয়ে পরছে ক্যাম্পাস। এসব আন্দোলন নিয়ন্ত্রনে পুরোপুরি ব্যার্থ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বর্তমান অবকাঠামো: কুমিল্লা শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে কোটবাড়ির সালমানপুরে ৫০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। ৫টি ব্যাচে ১৪টি বিভাগে প্রায় ৩৬০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। রয়েছে প্রশাসন ভবন, ৩টি একাডেমিক ভবন (১টি নির্মানাধীন) ৩টি ছাত্র হল (১টি নির্মানাধীন), ১টি ছাত্রী হল, কেন্দ্রীয় মসজিদ, ক্যাফেটেরিয়া ও নির্মানাধীন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।

সমস্যাসমূহ :
ক্লাসরুম সংকট: ক্লাসরুম সংকটের কারনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়া হয় দুই শিফটে। মাঝে-মাঝে এক ব্যাচ ক্লাস করে বের হলে অন্য ব্যাচ ক্লাস করতে ঢুকে। ক্লাসরুম না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীদেরকে বারান্দায় বসেই সময় কাটাতে দেখা যায়।
আবাসন সমস্যা : বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আবাসন সমস্যা প্রকট আকার ধারন করেছে। ২টি ছাত্র হলে প্রায় ৩০০ টি সিট এবং একমাত্র ছাত্রী হলে রয়েছে মাত্র ২০০ সিট। যা প্রায় ৩৬০০ শিক্ষার্থীর জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে বাধ্য হয়েই শিক্ষার্থীদের শহরে থাকতে হচ্ছে এবং গুনতে হচ্ছে অধিক ভাড়া।
সেশনজট : মারাত্মক সেশনজটের কবলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে প্রথম তিনটি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা প্রায় এক বছরে জটে পরে আছে। প্রথম ব্যাচ ৭ বছরে অসার্স শেষ করে মাষ্টার্সে আছে। দ্বিতীয় ব্যাচ এখনো অনার্স শেষ করতে পারেনি। এ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা প্রায় দুই বছরের জটে পরে আছে। ফলে চরম অনিশ্চয়তায় তাদের শিক্ষাজীবন।
পরিবহন সমস্যা : আবাসন সমস্যা থাকায় শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়েই শহরে থাকতে হয়। ফলে ক্যাম্পাসে যাতায়াতের একমাত্র অবলম্বন বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহন। কিস্তু ভাড়া করা কয়েকটি বাস দিয়ে কোনরকমে জোরাতালি দিয়ে চলছে পরিবহন ব্যাবস্থা।
লাইব্রেরী সমস্যা: লাইব্রেরীতে নেই পর্যাপ্ত বই। ফলে নিয়মিত লাইব্রেরী ওয়ার্ক করতে না পারায় ভোগান্তির শীকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের চাওয়া পাওয়া :
গিয়ান উদ্দিন
মার্কেটিং, ১ম ব্যাচ :
উচ্চ শিক্ষা ও গবেষনার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা দরকার। ক্যাম্পাসে রাজনীতি, ধুমপান, অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মডেল হওয়া প্রয়োজন।

জিকরিয়া সিদ্দিক
হিসাব বিজ্ঞান, ২য় ব্যাচ:
আমরা জানি এ ক্যাম্পাস রাজনীতি ও ধুমপানমুক্ত। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কেউ-কেউ এ আইন ভঙ্গ করছে। আমরা চাই ক্যাম্পাসে সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আরো কঠোর ভূমিকা গ্রহন করা উচিত।

সাজিদ আলম
মার্কেটিং, ২য় ব্যাচ:
রয়েছে শিক্ষক সংকট, আবাসন সংকট, পরিবহন সংকট। বহুবিধ সমস্যার পরেও আমরা ছাত্রছাত্রীদের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখরিত একটি ক্যাম্পসের স্বপ্ন দেখি।

মো: আতিকউল্লাহ
ব্যবস্থাপনা, ২য় ব্যাচ :
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি লালমাই পাহাড় আর শালবনের পাদদেশে প্রতিষ্ঠিক কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় যেন সবুজে ঘেরা বাগান। এখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে রয়েছে অত্যন্ত সহজ সম্পর্ক, যা পড়াশোনার ব্যাপারে সহযোগীতাপূর্ন।

আব্দুল কাইউম
ইংরেজী, ১ম ব্যাচ :
পড়াশোনার পাশাপাশি সুস্থ সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ তৈরির পয়োজন। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও সহযোগিতার মনোভাব থাকতে হবে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply