শনিবার থেকে ২দিন ব্যাপী দায়সারা অনুষ্ঠান শুরু : জাতীয় কবি নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত কবিতীর্থ দৌলতপুরকে রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি

মো.হাবিবুর রহমান, স্টাফ রিপোর্টার :—

সাম্য, মানবতা এবং দ্রোহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টিতে কুমিল্লা এক গুরত্বপূর্ন অধ্যায়। তারপর মহান এ কবির ১১৪ তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে স্মৃতি বিজড়িত কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার কবিতীর্থ দৌলতপুরে ২দিন ব্যাপী দায়সারা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আজ (শনিবার) উক্ত অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনিছুজ্জামান খান। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিন কাল (রোববার)) জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে কুমিল্লা-৭ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক ডেপুটি ষ্পীকার অধ্যাপক আলী আশরাফ। বিশেষ অতিথি থাকবেন কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর আলম সরকার ও উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব হারুন আল রশীদ। এতে আলোচনা সভা ছাড়াও রয়েছে প্রবন্ধ উপস্থাপন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মুরাদনগর প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি ও রামচন্দ্রপুর অধ্যাপক আব্দুল মজিদ কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ শাহ আলম। স্থানীয় নার্গিস-নজরুল সঙ্গীত একাডেমী, কোম্পানীগঞ্জ বাঁধন সঙ্গীত একাডেমী ও জেলা শিল্পকলা একাডেমীর শিল্পীবৃন্দ এতে একক এবং যৌথ সঙ্গীত পরিবেশন করবে।
কবি নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠান দায়সারা ভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা আনিছুজ্জামান খান বলেন, দায়সারা ভাবে হবে কেন? প্রতিবছরেই এ ধরনের অনুষ্ঠান হচ্ছে। আর দৌলতপুরকে রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি প্রদানের কারণেই আজকের এ অনুষ্ঠান। বলতে পারেন, অনুষ্ঠানটি হচ্ছে সাদামাটা। তার কারণ, ত্রিশালে নজরুলের অনেক স্থাপনা আছে বলেই ওখানে বড় ধরনের অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। দৌলতপুরেও অনুরূপ স্থাপনা নির্মিত হলে এখানেও ভাল অনুষ্ঠান হবে। তিনি আরো বলেন, দৌলতপুরে নজরুলের স্মৃতি রক্ষার্থে কোম্পানীগঞ্জ-নবীনগর সড়কটি নজরুলের নামে নামকরণ করার জন্য সহসাই প্রস্তাব পাঠানো হবে। তাছাড়াও প্রস্তাবিত বাঙ্গরা উপজেলাকে নজরুলের নামে নামকরণের চেষ্টা করবো।
স্থানীয় নার্গিস-নজরুল ভক্তদের জোর দাবি, প্রতিবছরই আলোচকরা জোরালো কন্ঠে নার্গিস-নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত কবিতীর্থ দৌলতপুরকে আধুনিক নার্গিস-নজরুল পল্লীতে রূপান্তরিত করার ঘোষণা দিয়ে আসছে, কিন্তু তা প্রতিনিয়তই উপেক্ষিত। আজ আর কালক্ষেপন না করে জাতীয় কবির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এবং দৌলতপুরের উন্নয়নে কবি নজরুল তার যৌবনের দীর্ঘ আড়াই মাস অবস্থানকালে নার্গিসকে জড়িয়ে রচিত সকল গান, কবিতা ও রচনা সংরক্ষণের জন্য সংগ্রহশালা স্থাপন, নার্গিস-নজরুল চর্চার জন্য গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, অতিথি ভবন, তথ্য কেন্দ্র, প্রদর্শনী কেন্দ্র, গণনাট্য মঞ্চ, আবৃত্তি কেন্দ্র, নার্গিস মাতৃ কল্যাণ কেন্দ্র ও শিশু সদন, পিকনিক কর্ণার, বাংলো, মহিলা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মিলনায়তন নির্মান এবং নির্মিত নার্গিস-নজরুল বিদ্যা নিকেতনের এমপিও ভুক্তিকরণ, নজরুল নিকেতনের সংস্কার ও পরিবর্ধন করা। অবহেলা অনাদরে ধ্বংস প্রায় নার্গিস-নজরুলের মধুবাসর ঘর, মধুবাসর পালঙ্ক, নার্গিসের ব্যবহৃত কাঠের সিন্ধুক, আম গাছ, কামরাঙ্গা গাছ, শান বাঁধানো ঘাট, পুকুর ও আলী আকবর খান মেমোরিয়েল ট্রাস্টের দ্বিতল ভবন সংরক্ষণ এবং পালঙ্ক ও সিন্ধুক যাদু ঘরে রাখা। এ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সম্পত্তি ও স্থাপনা নার্গিস বংশধরদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাদের অন্যত্র পূনর্বাসন করে ঐ সম্পত্তি অধিগ্রহণ পূর্বক রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রক্ষণা বেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয়রা আরো জানায়, নার্গিস-নজরুলের বিবাহ বিতর্কের অবসানসহ তাদের বিবাহের স্বীকৃতি আদায় হয়েছে। তারপরও নজরুল গবেষকদের গবেষণায় সততাসহ স্বচ্ছতা আনয়নপূর্বক আগামী প্রজন্ম যাতে নার্গিস-নজরুল সম্পর্কে সকল তথ্য উপাত্ত জানতে পারে।
মুরাদনগর প্রেসক্লাবের সভাপতি হাবিবুর রহমান জানান, বাংলা সাহিত্যে দৌলতপুরের গুরত্ব অনেক বেশী। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও মুরাদনগরবাসীর সব আশা-আকাঙ্খা এখনো পূরণ হয়নি। তাই ত্রিশালের দরিরামপুরের ন্যায় অবহেলিত দৌলতপুরেও নার্গিস নজরুলের স্মৃতি রক্ষার্থে নানা স্থাপনা নির্মান করে নজরুল চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
কবি পত্নী নার্গিস বংশের উত্তরসুরী বাবলু আলী খান জানান, কবি নজরুল তার যৌবনের ২মাস ১১দিন কাটিয়েছেন এ দৌলতপুরে। এ সময় তার সাথে নার্গিসের প্রেমের ধারাবাহিকতাই নজরুল আজ জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছেন। বাঙ্গালী জাতির সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজ জীবনের চিন্তার প্রধান অবলম্বন এ মহান কবির পদচারণায় দৌলতপুর আজ ধন্য। এ এলাকায় আড়াই মাস অবস্থান কালে নার্গিস প্রেমে অনেক গান ও কবিতা রচনা করে গেছেন।
বাঙ্গরা পূর্ব ইউপি চেয়ারম্যান মাস্টার আব্দুল হাকিম সওদাগর জানান, ময়মনসিংহের ত্রিশালের ন্যায় দৌলতপুরের গুরত্ব অনেক বেশী। ত্রিশালে যদি রাষ্ট্রীয় ভাবে নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান হতে পারে, তাহলে দৌলতপুর এত অবহেলিত কেন? দৌলতপুর গ্রামের নজরুল গবেষক মরহুম বুলবুল ইসলাম নার্গিস-নজরুলের স্মৃতিকে বিভিন্ন পত্র-প্রত্রিকায় ও ম্যাগাজিনে নার্গিস-নজরুল সম্পর্কে অজানা তথ্য প্রকাশ করেছিলেন। বুলবুল ইসলাম ১৯৯৩ সালে মৃত্যুর পর নার্গিস নজরুলের প্রচারণায় স্থবিরতা দেখা দেয়।
স্থানীয় নার্গিস-নজরুল সঙ্গীত একাডেমীর সভাপতি আব্দুল হাই মোশারফ ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম মাস্টার জানান, ‘কবি নজরুল দৌলতপুর থেকে চলে যাবার সময় নার্গিসকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, আমার যাবার সময় হল দাও বিদায়’ গানটি যখন গেয়েছিলেন, তখন নার্গিস বিদায় বেলায় ফেল ফেল করে তাকিয়ে ছিলেন নজরুলের পথ পানে, তখন আরো একটি গান গেয়েছিলেন ‘চেয়োনা সুনয়নে, আর চেয়োনা এ নয়ন পানে।’

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply