কুমিল্লার মুরাদনগরের বাখরাবাদ গণহত্যা দিবস আজ স্বাধীনতার ৪২ বছরেও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ হয়নি

মুরাদনগর প্রতিনিধি :–
আজ ২৪মে (শুক্রবার)। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের বাখরাবাদ গণহত্যা দিবস। এখানে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করার জন্য এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রানের দাবি থাকলেও স্বাধীনতার ৪২ বছরেও তা পূরণ হয়নি। এ উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সংরক্ষন পরিষদ ১৯৯৬ ও ৯৭ সালে পর পর ২ বছর আলোচনা সভা, চিত্র প্রদর্শনী ও স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র স্টপ জেনোসাইড প্রদর্শিত হলেও উদ্যোগের অভাবে এখন আর হচ্ছে না। ফলে ভূক্তভোগী পরিবার গুলোর মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক হানাদার বাহিনী রাজাকারদের সহযোগিতায় রামচন্দ্রপুর বাজার সংলগ্ন হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম বাখরাবাদে নৃশংস গণহত্যা চালায়। প্রায় দেড় শতাধিক হিন্দু নারী পুরুষ পাক হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা শেষে বাড়িঘরে আগুন দিয়ে লুটপাট করে। পাক হানাদার বাহিনী হত্যাযজ্ঞের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের ২১ জন ব্যক্তিকে পার্শ্ববর্তী দেবিদ্বার ক্যাম্পে ধরে নিয়ে পরদিন ১৮ জনকে এক সাথে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। এদের মধ্যে দক্ষিণ বাখরাবাদ গ্রামের শহীদ হরেন্দ্রচন্দ্র সাহার ছেলে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া হরেকৃষ্ণ সাহা জানান, ৭১’র ২৪মে সোমবার ভোর ৫টায় পাক হানাদার বাহিনী আমাদের গ্রামে প্রবেশ করে হত্যাকান্ড চালায়, হত্যাকান্ড চলে দুপুর ২টা পর্যন্ত। বাড়ী ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং লুটপাটসহ নারী ধর্ষণ করে। তিনি আরো জানান, তখন সে মেট্রিক পরীক্ষার্থী ছিল। পাক বাহিনীরা তার বাবা হরেন্দ্র চন্দ্র সাহাকে হত্যা করে তাকে দেবিদ্বার ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। তিনি আক্ষেপ করে জানান, স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও বাখরাবাদ গণহত্যার স্মৃতি স্বরূপ কোন স্মৃতি সৌধ নির্মান হয়নি। তাছাড়া আমরা ক্ষতিগ্রস্ত শহীদ পরিবারেরা সরকার থেকে এ পর্যন্ত সাহায্য সহযোগিতা পাইনি। তিনি উক্ত হত্যাকান্ডের বিচার প্রার্থনা করেন। তার সাথে বেঁচে যাওয়া অপর ২জন হলো দক্ষিন বাখরাবাদ গ্রামের শহীদ গোপাল শীলের ছেলে তারক শীল (তারক মাস্টার) ও শহীদ মনোমোহন সাহার ছেলে ঢাকা ওয়াসায় চাকরিরত দুলাল চন্দ্র সাহা। তারক শীল জানান, তিনি সন্দেশ তৈরী করে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন যাপন করছেন।
মুরাদনগর প্রেসক্লাবের সভাপতি হাবিবুর রহমান জানান, এ জঘন্য হত্যাকান্ডের ঘটনা স্বাধীনতার ইতিহাসে ঠাঁই পাবার মতো। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাখরাবাদের নির্মম গণহত্যার স্মারক স্বরূপ এখানে কোন স্মৃতি সৌধ নির্মান হয়নি কিংবা তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে কোন পাঠাগারও তৈরী করেনি। স্মৃতি সৌধ ও পাঠাগার নির্মান এখন এলাকাবাসীর প্রানের দাবি। বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার। স্মৃতি সৌধ ও পাঠাগার নির্মানের জন্য তিনি সরকারের নিকট জোর দাবি জানান।
বাখরাবাদ গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী, রামচন্দ্রপুর উত্তর ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সফু মিয়া সরকার জানান, এটি একটি নৃশংস হত্যাযষ্ণ। এ বর্বোরিচিত হত্যাকান্ডের বীভৎস চিত্র প্রত্যক্ষ করে আজো শিহরিত হই। ঝোপ ঝাড়ে আনাচে কানাচে এবং পাশে বয়ে যাওয়া খালে অনেক লাশ পড়ে থাকতে দেখি। বাখরাবাদ গণহত্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক ট্র্র্যাজেডি। আওয়ামীলীগ নেতা ও শিল্পপতি আলহাজ্ব গোলাম তৌহিদ মোবারক জানান, গণহত্যার স্মৃতি রক্ষার্থে এখানে স্মৃতি সৌধ ও পাঠাগার নির্মানের প্রয়োজন। আশা করি সরকার এ ব্যাপারে কার্যকরী প্রদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যাতে ভবিষ্যত প্রজম্নের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্মম সাাক্ষী হয়ে থাকবে। উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা শ্যামল চন্দ্র সরকার জানান, বাখরাবাদ গণহত্যা দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সংরক্ষন পরিষদ ১৯৯৬ ও ৯৭ সালে পর পর ২ বছর আলোচনা সভা, চিত্র প্রদর্শনী ও স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র স্টপ জেনোসাইড প্রদর্শিত হয়। স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সংরক্ষন পরিষদের সভাপতি সমীর বরণ সরকার জানান, বাখরাবাদ গণহত্যায় স্বজন হারাদের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য স্থানীয়ভাবে কোন প্রকার উদ্যোগ নেয়া হয় নেই।

Check Also

দেবিদ্বারে অগ্নিকান্ডে ১কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি

দেবিদ্বার প্রতিনিধিঃ– কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামে রান্না ঘরের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরনে ১৫টি ...

Leave a Reply