‘‘গণতন্ত্র ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্টা’’

—-আবদুর রহমান

সাম্প্রতিককালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বহুল আলোচনায় গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রায়ন একটি আলোচিত বিষয়। গণতন্ত্র বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে কম সমালোচিত এবং জনপ্রিয় ও গ্রহনযোগ্য শাসন ব্যবস্থা হিসাবে পরিগণিত। বর্তমান বিশ্বে ধনী-দরিদ্র, উন্তত-অনুন্নত, বৃহৎ-ক্ষুদ্রাকার সকল রাষ্ট্রই গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোন রাষ্ট্রেই স্বৈরশাসন স্থায়ী হতে পারেনি। ¯œায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বরাজনীতিতে স্বৈর ও সামরিক শাসন বিদায় নিতে বসেছে এবং নব্যস্বাধীন রাষ্ট্রগুলোসহ প্রায় সকল রাষ্ট্রেই গণতন্ত্রায়নের প্রক্রিয়া ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। সাথে সাথে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকেই মানুষ উত্তম হিসাবে বেছে নিচ্ছে। দৈশিক ও বিশ্ব রাজনীতির গতি-প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে তাই বলা হচ্ছে গণতন্ত্রের কোন বিকল্প নেই। বর্তমানকালে গণতন্ত্র তার গতানুগতিক রূপ থেকে বেরিয়ে এসেছে। তাই গণতন্ত্রকে কোন সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। গণতন্ত্র কতগুলো মূল্যবোধের সমষ্টি(ঝবঃ ড়ভ ংড়সব াধষঁবং)হিসাবে। এ মূল্যবোধ হচ্ছে-পরমতসহিষ্ণুতা, আলোচনা-সমালোচনা, পর্যালোচনা, পরামর্শ এবং সর্বোপরি সর্বসাধারণের বাছাইকৃত মতকে গ্রহন করা, বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স¦াধীনতা, জনমতের মূল্যায়ন, আইনের শাসন ইত্যাদি। সাধারণ মানুষ দেখবে, শুনবে, কিন্তু চুপ করে থাকবে। বুঝলেও চুপ, একদম চুপ। কথা বললে রাজাকার? প্রজন্ম নামক নাট্যমঞ্চ থেকে যখন যা খুশি আদেশ করছে সরকারকে। কখনও সবাইকে আদেশ দিচ্ছে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখতে, কখনও কালো ব্যাজ ধারণ করতে। প্রজাতন্ত্রের লোকজনও সেই আদেশ মানছে। দেশটা গোল্লায় গেল নাকি? মগের মুল্লুক বানিয়ে ফেললো নাকি দেশটাকে?
এর নাম গণতন্ত্র, নাকি জোর যার মুল্লুক তার তন্ত্র? বোধহয় আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার জন্য প্রজন্ম নামক নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে মানুষখেকো মানুষ চরিত্রে অভিনয় করছে ওরা। বাহবাও কুড়িয়েছে সরকারের। যারা সত্য কথা বলবে, ইসলামের কথা বলবে— তাদের গুলি করে মারার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে ওরা। কত ছল-চাতুরির আশ্রয় নিচ্ছে ওরা। মুখে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের বুলি আওড়িয়ে ধোঁকা দিচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কষ্টার্জিত স্বাধীনতার এতগুলো বছর পর এই দৃশ্য দেখে আফসোসটুকুও করার ভাষা কিংবা স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে এই শয়তানরা।
স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে মত প্রকাশের অধিকার অন্যতম নাগরিক অধিকার হলেও এই নরকের কীটদের ভয়ে চুপ করে আছে জনগণ। কিছু বললে শান্তি প্রিয় মানুষকে ধরে গুলি করে মারবে, নয়তো ধরে জেলে পুরবে। সত্যি কথা বললে রক্ষা নেই।
যাদেরকে আজকে রাজাকার বলা হচ্ছে তারা অনেকেই হয়তো স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় প্রাইমাররি ছাত্র ছিলেন। তার চোখেমুখেও স্বাধীনতার স্বপ্ন উঁকি দিত। নারকেল গাছের মাথায় উঠে পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের মাথায় ডাব ফেলে মারার পরিকল্পনা করতেন। অনেক প্রকৃত রাজাকার যুদ্ধের পর সার্টিফিকেট নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধার আর রাগে-ক্ষোভে-অভিমানে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা সার্টিফিকেট নিতে যান নাই। যদিও ইতিহাসের কোথাও তাদের নাম নেই। আর এসবের পরও শুধু সুন্নতি পোশাক পরিধানের জন্য এ কথা শুনতে হলে কোথায় ইসলাম? এই আমাদের মুসলিম দেশ? সুন্নতি পোশাক ধারণকারীকে যদি রাজাকার ধরা হয়, ইসলাম প্রচারক শান্তিকামী মানুষদের যদি জেল কিংবা ফাঁসি দেয়া হয় তবে কি ধরে নেব যারা ইসলামকে ভালোবাসে, নবীজী (স.)-এর দেখানো পথে হাঁটে তারা সবাই রাজাকার? জানি আমার এই কথা শুধুই কথার কথা, বৃথা আস্ফাালন মাত্র। সরকারের কানে ঢুকবে না। কারণ যারা এসব করে তারা তো সরকারেরই ছত্রছায়ায় বড় যতেœ লালিত; সমাদৃত। সরকারের শেখানো বুলি এদের মুখে মুখে। আজ চারদিকে মানুষের মুখে মুখে ভয় ছড়িয়ে আছে। কি করবো আমরা সাধারণ মানুষ? জোর যার মুল্লুক তার মানতে না পারলেও কাজে, কর্মে সরকার এটাই দেখাচ্ছে।
ধর্ম থেকে, ইসলামি আদর্শ থেকে, সত্যতা থেকে মুক্তির জন্যই কি আজ ওরা এই যুদ্ধের ডাক দিয়েছে। ধর্মীয় নেতা, ধর্মপ্রাণ মানুষদের বিরুদ্ধে কি আজকের এই যুদ্ধ তাদের? বোধহয় তাই। আর এই ২য় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ নাস্তিক ব্লগার রাজীব। যার স্বীকৃতি দিয়েছে এদেশের সরকার। আর এই নাস্তিক ব্লগারদের কান্ডারি, নরকের দূত, স্বাধীন বাংলাদেশের একচ্ছত্র অধিপতি যার কথায় সরকারও কান ধরে ওঠে, বসে সেই প্রজন্মমঞ্চ। সরকারের থেকেও নাকি সে শক্তিশালী। এরা শিক্ষিত হলেও কলঙ্কিত করেছে এ স্বাধীন ভূমিকে। এর চেয়ে সারাদেশে মূর্খদের ছেড়ে দিলেও বোধহয় এই পরিস্থিতি দেখতে হতো না মানুষকে। আর যার সবচেয়ে নিচের অবস্থানে আছে সাধারণ ধর্ম প্রাণ মুসলমান।
ধর্ম, বিশ্বাসকে ভূলুণ্ঠিত করে, ইসলামকে পদদলিত করে উল্লাস করছে দানবেরা। মিডিয়া, চ্যানেল, সংবাদপত্র গুলোকে দালাল বানিয়ে মাঠে নমিয়েছে সরকার। মনগড়া কথাবার্তা বলে ধোঁকা দিচ্ছে সাধারণ মানুষকে। চোরের মায়ের বড় গলা শুনতে আর ভালো লাগছে না। সাধারণ মানুষ এখন ভালোমতই জানে, ওদের সাজানো নাট্যমঞ্চে চলছে রক্ত পানের নেশা। এই রক্ত সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের। যারা আল্লাহকে ভালোবাসে। নবীজী (স.)-কে ভালোবাসে। আর এই মুসলিম দেশের মানুষ হয়েও সহ্য করতে হচ্ছে এসব নাস্তিকের জয়োল্লাস। সত্য ধর্মের অবমাননা দেখেও চুপ করে থাকতে হচ্ছে আজ। কথা বললে তো ধরে জেলে পুরবে পুলিশ অথবা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের হাতে মরতে হবে অকালে।
আর প্রজন্ম নামক নাট্যমঞ্চ থেকে উল্লাসে ফেটে পড়বে দানবেরা। তাদের উল্লাস, আড্ডা, রক্ত পিপাসু আত্মার তৃপ্তির জন্য আর কত সাধারণ মানুষ প্রাণ দেবে? ইসলামকে তো রক্ষা করতেই হবে। রাজাকারের ফাঁসি কে না চায়। চিহ্নিত অনেক রাজাকার একনো ধঁরাছোয়ার বাইরে। কিন্তু এটা তো তাদের মুখের কথা। এই কথার অন্তরালে যে আরও কথা আছে। ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব ওদের। প্রমাণ দিয়েছে কাজে, কর্মে। পাখির মতো গুলি করে ওরা মারছে মানুষ। মরছে না পাপীরা। ইসলাম ও নবীজী (স.)-কে অবমাননার কোনো দায় নেই তাদের। বরং এই প্রজন্ম নাট্যমঞ্চে অভিনয় কিংবা ভালো দর্শক, বক্তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সুবিধার পাশাপাশি নান্তিকদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে রয়েছে শহীদী খেতাব পাওয়ার সুযোগ। এদেশে গণতন্ত্র বলে কিছু নেই। আছে নাস্তিকতাবাদীদের ও সরকারের প্রদর্শিত, প্রমাণিত জোর যার মুল্লুক তার তন্ত্র। আর ধর্মপ্রাণ মানুষের চাপা আফসোস, হায় মুসলমান, হায় আমার স্বাধীন সোনার বাংলা।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এক ঐতিহাসিক যুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর প্রতিষ্টিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২ সালে যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয় এর মাধ্যমে বহুদলীয় সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তনের কথা বলা হয়। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নানা সংকট ও সমস্যার অজুহাত দেখিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারী জাতীয় সংসদে সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বাতিল করে দেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে মর্মান্তিক ভাবে নিহত করা হয়। খন্দকার মোশতাক আহম্মেদ দেশের রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হন এবং জিয়াউর রহমানকে দেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়। কিছুদিন পরেই জিয়া রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহন করেন। ১৯৭৭ সালের ৩০এপ্রিল জিয়াউর রহমান দেশে গণভোটের আয়োজন করেন। ক্রমাণ¦য়ে জাতীয় সংসদ, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্টানের মাধ্যমে দেশ গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হতে থাকে। ১৯৮১ সালের ৩০মে সামরিক অফিসারের হাতে জিয়া নিহত হন। ১৯৮২ সালের ২৬ মার্চ জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে দেশে সামরিক আইন জারি করেন। দীর্ঘ ৯ বছর এরশাদের স্বৈরশাসন চলে। অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ছাত্র গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ পদত্যাগ করেন। ১৯৯১ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে দেশে প্রথমবারের মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনষ্টিত হলে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্টিত হয়। দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র সংবিধানের ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্টা লাভ করে। মোট ৩ বার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে শান্তিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর হয়। ১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্টিত অবাধ, সুষ্টু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্টার পর বাংলাদেশের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। দেশের মানুষ দীর্ঘকালীন স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পায় এবং গণতন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আরো বেড়ে যায়। বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে দেশের সর্বজনের এমনই প্রত্যাশা।

লেখকঃ আবদুর রহমান, কলাম লেখক
E-mail: m.a.rahman33@gmail.com
মাছিমপুর, তিতাস, কুমিল্লা।
মোবাইলঃ ০১৫৫২ ৪৬ ৩৬ ১১

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply