স্বাধীনতার জন্য

—-মোঃ জালাল উদ্দিন

ভাবছি আর কখনো লিখবো না। কিন্তু তবু তো লিখি। কেনো লিখি জানিনে। হয়তঃ মনের আবেগ, ক্ষোভ প্রশমিত করার জন্যে! কারো ভাল লাগা না লাগায় কিছু যায় আসে না। কিন্তু এত লিখালিখির পরও প্রতিকার কিছু হচ্ছে কি? র্দু ছাই, এত লিখেই বা …………..

: কি ব্যাপার? একা একা কার সাথে এত রাগ, এত ক্ষোভ দেখাচ্ছো? এভাবে বিড় বিড় করছো কেনো?

: তুমি বুঝবে না মাধবী, তুমি বুঝবে না। এ হৃদয়ে বড় ব্যথা মাধবী, বড় ব্যথা! দেশটা যে গোল্লায় গেলো! এজন্য কী ওঁরা দেশটাকে স্বাধীন করেছিলো!! এজন্যই কী যুদ্ধ করেছিলাম!!!

: প্লিজ লক্ষীটি আমার, প্লিজ; শান্ত হও। ডাক্তার যে উত্তেজিত হতে বারণ করে গেছেন। এতে যে তোমার অসুস্থতা বেড়ে যাবে।

মাধবী সযত্নে তার স্বামীকে শয্যায় শুইয়ে দিল। মাথায় হাত বুলাচ্ছে। তার কোমল পরশে শাওন ঘুমিয়ে পড়ল। ফাল্গুনের মধুময় রাত। অথচ মাধবীর চোখে ঘুম নেই। শত সহস্র ভাবনা সমুদ্র-তরঙ্গের ন্যায় তার হৃদয়ে আছাড় খেয়ে পড়ছে। বাহিরে ফুটফুটে জোছনা। দক্ষিণা বাতাসে হাস্নাহেনার গন্ধে সারাটি কক্ষ যেন এক স্বর্গীয় আবেশে ভরে উঠেছে। মাধবী খোলা জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছে। আর শাওনের মাথায় আল্তোভাবে তখনো কোমল পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। শাওন প্রায়ই বলে “মাধবী, তুমি বুঝবে না।” কিন্তু আমি যে বুঝেও বুঝি না। এক রাতে শাওনের মা আর যুবতী বোনকে হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে গেল; বাবাকে গুলি করে হত্যা করলো। তাদের আর কোন খোঁজ পাওয়া গেল না। একমাত্র ভাইটি আমার “আসছি” বলে শাওনের সাথে যুদ্ধে গেল। আর ফিরলো না। অবশেষে দীর্ঘ নয় মাস পর আমার একমাত্র আশ্রয়স্থল শাওনকে পেলাম ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাক্ত ও অজ্ঞান অবস্থায়। পরম করুণাময় তাঁকে আমার বুকে ফিরিয়ে দিলেন। দেশ স্বাধীন হলো। বিনিময়ে হারালাম মা-বাবা, ভাই-বোন, শ্বশুড়-শ্বাশুড়ী; আরও কত স্বজন! এত ব্যথা বুকে চাপা দিয়ে রেখেছি একমাত্র তোমারই জন্যে শাওন! কারণ, তুমি অসুস্থ। আমার একমাত্র আশ্রয় তুমি। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না শাওন! মাধবীর চোখ দুটো অশ্র“তে ভরে উঠলো। গভীর মমতায় শোকাচ্ছন্ন মাধবী শাওনের বুকে মাথাটি রেখে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো।

গভীর রাত। শাওন ও মাধবী পরম তৃপ্তিতে ঘুমোচ্ছে। বাহিরে দিবালোকের ন্যায় জোছনার স্নিগ্ধ আলো। শয়ন কক্ষের একটি জানালা খোলা। তার পাশেই ফুলের বাগান স্বর্গীয় পরশ বুলাচ্ছে সারাটি বাড়িতে।

শাওন গভীর ঘুমে মগ্ন। এক স্বর্গীয় উদ্যানে তাঁর মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনরা স্বর্গীয় সাজে সজ্জিত! “বাবা শাওন, শাওন, এজন্য কী তোকে পেটে ধরেছিলাম! তুই না প্রতিজ্ঞা করেছিলি এদেশের কোন অমঙ্গল হতে দিবি না। দেশে আজ এ কী হচ্ছে! বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি আর শিক্ষার অবমূল্যায়ন। পুলিশ হেফাজতে থেকে সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত হয় ব্যবসায়ী। দুই নেত্রী জিম্মী করে রেখেছে আমার দেশের বারো কোটি মানুষকে। ভিন্দেশীরা আসে তাদের বিরোধ নিস্পত্তির জন্যে! ছি!! ধিক্ তাদের অসৎ চিন্তা-চেতনাকে। ক্যান্সারের ন্যায় আজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে সন্ত্রাসের জীবাণু। প্রধানমন্ত্রীর ভ্রাতুস্পুত্র অতনুকে সন্ত্রাসীরা আটকে রাখেÑ মুক্তি পণ দাবী করে! বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়েছে রণাঙ্গন। হাজারো মায়ের সন্তান সেখান থেকে মায়ের বুকে ফিরে আসে লাশ হয়ে। হরতাল, অবরোধ, ভাঙ্গচুর, রাহাজানি আর ক্ষমতার লোভ আমাদের দেশটাকে ঝাঁঝড়া করে ফেলছে শাওন। এ জন্যেই কী আমরা জীবন দিয়েছিলামÑ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলি তুই! আমাদের অর্জিত স্বাধীনতার এ কী প্রতিদান শাওন!! জেগে উঠ্ শাওন, জেগে উঠ্। দেশের বারো কোটি মানুষকে বাঁচাÑ তাঁদের জাগিয়ে তোল্।”

: মাগো, মা; আমি ভুল করে ফেলেছি মা! আমি আমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করবোই মা!! আমি আবার অস্ত্র ধরবো, আবার …………. । শাওনের আর্তনাদে মাধবীর ঘুম ভেঙ্গে গেল। শাওন শয্যার উপর বসে দিকভ্রান্তের ন্যায় অস্থির হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। মাধবী শাওনকে জড়িয়ে ধরে প্রবোধ দিচ্ছে। “শাওন, কী হয়েছে! কিছু স্বপ্নে দেখেছো!! আমাকে বলো। প্লিজ, অস্থির হয়ো না শাওন, প্লিজ …………………..”

: আমাকে ছেড়ে দাও মাধবী, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি ঐ নরপিচাশ, ক্ষমতালোভীদের ক্ষমা করবো না। ওরা আমার মা-বাবা, ভাই-বোন সবার অর্জিত স্বাধীনতাকে হত্যা করেছে। কারো জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই। এভাবে আমরা বাঁচতে চাই না মাধবী, বাঁচতে চাই না! মা যে আমায় ডাকছে মাধবী “ খোকা, জেগে ওঠ্। দেশের বারো কোটি মানুষকে জাগিয়ে তোল্।” না, না, আমি আবার অস্ত্র ধরবো মাধবী, আমাকে ছেড়ে দাও! স্বাধীনতার জন্যে আবার আমি ………..

শাওন হঠাৎ শয্যায় লুটিয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। মাধবী কান্না জড়িত কন্ঠে শাওনকে বারবার ডাকলো। কিন্তু শাওন কোন সাড়া দিল না। অবশেষে ডাক্তার এলো। মাধবী অস্থির হয়ে বারবার ডাক্তারের মুখের দিকে তাকাচ্ছে।

: ঔষধ দিয়েছি। আমি সাধ্যমত চেষ্টাও করছি। তবে ভয় এখনো কাটেনি। সংজ্ঞা ফিরে পাবার পর কিছুতেই যেন রোগী উত্তেজিত না হয়, সে দিকে সতর্ক থাকতে হবে। নতুবা তাকে বাঁচানো ………………….

ডাক্তার চলে গেলো। মাধবী ব্যথার পাহাড় বুকে নিয়ে শাওনের শিয়রে বসে রইল। তার হৃদয়ে শত সহস্র ভাবনা এসে ভিড় করছে। আর সমুদ্র তরঙ্গের ন্যায় একের পর এক মিলিয়ে যাচ্ছে। তার চোখ দুটো অশ্র“তে সিক্ত হয়ে উঠলো। মসজিদের মিনার হতে ভেসে এলোÑ “আচ্ছালাতু খায়রুম মিনান্নাওম……………….।” রাত্রি পোহাল। কিন্তু মাধবীর ব্যথার রজনী কিছুতেই পোহাচ্ছে না।

মোঃ জালাল উদ্দিন
গ্রামঃ বড়ইয়াকুড়ি, পোঃ জাহাপুর
উপজেলাঃ মুরাদনগর, জেলাঃ কুমিল্লা।
মোবাইল নম্বরঃ ০১৮১৯-৬০৩৮০২

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply