‘‘ রাখে আল্লাহ, মারে কে ???’’

—–আবদুর রহমানঃ
রাখে আল্লাহ মারে কে? অর্থাৎ- আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে পৃথিবীর কোন শক্তিই কাউকে মারতে পারে না। আমরা প্রায়ই এমন একটি প্রবাদ বাক্য বলতে শুনে থাকি। আবার প্রয়োজনে নিজেও উদাহরণ স্বরুপ কথোপকোথনে ব্যবহার করে থাকি। ঘটনা ২৪ এপ্রিল ২০১৩ দিনটি ছিল বুধবার। সাভারের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত রানা প্লাজায় বিভিন্ন গার্মেন্ট ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে কাজে যোগ দেয় হাজার হাজার শ্রমিকরা। ভোরের সূর্য্যরে তেজ বাড়তে না বাড়তেই হঠাৎ করে শ্রমিকদের সব স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে দিল রানা প্লাজার ইট-পাথর আর কংক্রিট। মুহূর্তের মধ্যে মাটির সঙ্গে মিশে গেল ৮তলা ওই ভবনটি।
একে একে ওই ভবন থেকে জীবিত উদ্ধার করা হলো প্রাায় তিন হাজার আর মৃতের সংখ্যা ১১৭৫ জনেরও বেশি। প্রায় ১৬ দিন উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরে ১৭তম দিনে ঘটে একটি অলৌকিক ঘটনা। উদ্ধারকর্মীরা যখন রানা প্লাজার বেইজমেন্টের ধ্বংসস্তুপ সরাচ্ছিল তখন একটি লোহার কাঠি নাড়াতে দেখে দৌড়ে উদ্ধারকর্মীরা ছুটে যায় সেই কাঠিটির দিকে। কংক্রিটের দেয়াল একটু ছিদ্র করে শুনতে পায় রানা প্লাজার ধ্বংসস্তুপের অন্ধকারে ৪০৮ ঘণ্টা আটকে থাকা রেশমা আক্তারের বাঁচার আকুতি। মৃত্যুঞ্জয়ী রেশমা ১৭ দিন পরেও অক্ষতভাবে আলোয় ফিরে আসা এটা আসলেই অলৌকিক ঘটনা। যাহা রাখে আল্লাহ মারে কে??? প্রবাদ বাক্যটিকে হার মানিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে গার্মেন্টে এতবড় জীবন হানি স্মরণকালে কখনো ঘটেনি। সারা জাতি টানা ১৭ দিন ছিল শোকার্ত। অথচ ১৭তম দিনে রেশমার অলৌকিকভাবে জীবিত ফেরা হাজারো শ্রমিকের জীবনের শোককে একদিনের জন্য হলেও স্লান করে দিয়েছে।
পৃথিবীর বুকে রেশমা হলো তিন নাম্বার ব্যক্তি যিনি কোনো বড় দুর্ঘটনা থেকে ১৭ দিন পরে জীবিত ফিরে এলেন। দিনাজপুরের মেয়ে পোশাক শ্রমিক রেশমাকে হাজারো দুঃখিনীর চির বিদায়ের মিছিলে সবাই তাকেও গণনা করেছিল। সে কিনা ১৭ দিনের মাথায় বের হলেন আলোকিত এক বিস্ময় নিয়ে। না নিজে বিস্ময় নিয়ে নয়, বিশ্বকে বিস্ময় শব্দটি বোঝানোর জন্য। অবিশ্বাস্যভাবে ১৭ দিন (৪০৮ ঘণ্টা) ধ্বংসস্তুপের মধ্যে আটকে থাকার পরেও জীবিত উদ্ধার হওয়া পৃথিবীর বুকে রেশমা তৃতীয়। এর আগে ২০০৫ সালে পাকিস্তানে ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তুপ থেকে ৬৩ দিন পর উদ্ধার করা হয় নকশা বিবি নামে এক মহিলাকে। তিনি রান্নাঘরে চাপা পড়েছিলেন। সেখানে থাকা খাবার খেয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন। ২০১০ সালে হাইতিতে ২৭ দিন পরে উদ্ধার করা হয় ইভান মনসিংগনাককে। তিনি ড্রেনে জমা পানি খেয়ে বেঁচে ছিলেন। ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি সুপার ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ধসে পড়ায় পার্ক সুং হুনকে ১৬ দিন পর উদ্ধার করা হয়। তিনি বৃষ্টির পানি খেয়ে বেঁচে ছিলেন। গত ২৪ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে ১০ মে বিকাল ৪টা ২৫ পর্যন্ত ধ্বংসস্তুপের নিচ থেকে অক্ষত অবস্থায় বেড় হয়ে সবাইকে অবাক করে পৃথিবীর বুকে পুনর্জীবিত হয় পোশাক শ্রমিক রেশমা বেগম।
রানা প্লাজার ধ্বংসস্তুপে কেউ জীবিত মানুষ নেই ভেবে সেখানে উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন সেনাকর্মীরা। এমন ভাবনা অস্বাভাবিক নয়, কারণ দীর্ঘ ১৭ দিন পর ধ্বংসস্তুপে কেউ জীবিত থাকতে পারে এমন কল্পনা করেনি। কিন্তু ওই ধ্বংসস্তুপে হঠাৎ আওয়াজ এলো আমি এখনো ভালো আছি, আমার নাম রেশমা।
সাভারের ভবন ধসের দীর্ঘ ১৭ দিন (৪০৮ ঘন্টা) পরে সাভারে ধ্বংসস্তুপ থেকে লাখ লাখ মানুষের সব কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সবাইকে অবাক করে রেশমা জানান দিল তার বেঁচে থাকার খবর। রেশমার বেঁচে থাকার খবরে আনন্দে কেঁদে ফেলল উদ্ধারকর্মীরা। আনন্দে কাঁদলেন রেশমাকে দেখতে আসা হাজার হাজার মানুষ ও সমগ্র দেশবাসী। রেশমার সন্ধান পাওয়ার পর ভবনের বেজমেন্টটিতে একটি সুড়ঙ্গ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালান উদ্ধারকর্মীরা। দীর্ঘ ৪৫ মিনিট শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের পর তাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। পৃথিবীর মধুমাখা স্বর্ণালি আলো দেখতে পেয়ে হেসে ফেললেন রেশমা। রেশমার সঙ্গে প্রশান্তির হাসি হাসলেন সমগ্র পৃথিবীর কৌতূহলী মানুষ।
রানা প্লাজার দ্বিতীয় ফ্লোরে ছিলেন রেশমা। দ্বিতীয় ফ্লোরে একটি মসজিদ ছিল। সেই মসজিদটিকে রেশমা নিরাপদ ভেবে দৌড়ে সেখানে আশ্রয় নেয়। দীর্ঘ ১৫ দিন তার সঙ্গে চাকরি করা শ্রমিকদের ফেলে রাখা খাবার খেয়ে বেঁচে ছিলেন রেশমা। প্রতিদিন গার্মেন্টকর্মীরা দুপুরের জন্য খাবার নিয়ে আসতেন ভবন ধসে সেই খাবার না খেয়েই হয়তো নিহত বা জীবিত উদ্ধার হয়েছেন তারা। দুই চোখ জুড়ে কান্না এলেও বেঁচে থাকার তাগিদে রেশমাকে খেতে হয়েছে সেসব খাবার গুলো। খাবারের মধ্যে ছিল বিস্কুট, রুটি ও ভাত। ভাত ও রুটি একদিন পরেই নষ্ট হয়ে গেলে পরে বিস্কুট খেয়েছেন রেশমা। তাও শেষ হলে ১৫ দিন পর্যন্ত শুধু পানি খেয়ে বেঁচেছেন রেশমা। ১৬ ও ১৭তম দিনে তার পেটে কিছুই পড়েনি। ১৭তম দিনে উদ্ধারকর্মী সেনাবাহিনীর মেজর মোয়াজ্জেম বেইজমেন্ট ভাঙতে গেলে দেখতে পায় একটি ছিদ্র দিয়ে কে যেন লোহার রড নাড়ছে। একটু কাছে গিয়ে ভেতরে শুনতে পায় রেশমার কণ্ঠস্বর। তখন উদ্ধারকর্মীরা সেখানে একটি মসজিদের ভেতর থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে জীবিত রেশমাকে। ১৭ দিন পর মায়াময় পৃথিবীর আলো আর মানুষের কণ্ঠস্বর শুনে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন রেশমা। পায় নতুন জীবন।
এমনিভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া মানে ‘‘রাখে আল্লাহ মারে কে’’ অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা যদি কাউকে বাঁচিয়ে রাখেন তাহলে পৃথিবীর কোন শক্তিই তাকে মারতে পারে না। কোন না কোন ভাবে রক্ষা হবেই। সৃষ্টিকর্তার এমন মহিমা ও নিদর্শন বুঝার আমাদের সকল মুমিন বান্ধার তৌফিক দান করুক। আমীন।
লেখকঃ আবদুর রহমান, কলাম লেখক
E-mail: m.a.rahman33@gmail.com
মাছিমপুর, তিতাস, কুমিল্লা।
মোবাঃ ০১৫৫২ ৪৬ ৩৬ ১১

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply