চট্টগ্রামে দুই হত্যা মামলায় ৫ জনের ফাঁসির আদেশ

চট্টগ্রাম :–

নগরীতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী মিদাত সারিমা রহমান এবং জেলার চন্দনাইশে আইনজীবীর মা বৃদ্ধা চেমন আরা বেগম হত্যা মামলায় পৃথকভাবে দুটি আদালতে ঘোষিত রায়ে পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। চেমন আরা হত্যা মামলায় আরও পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

রোববার চাঞ্চল্যকর মামলা দুটির রায় ঘোষণা করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী মিদাত হত্যা মামলায় তার বন্ধু সৌরভ প্রকাশ এস এম তোহাকে (২৩) কে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক রেজা তারিক আহমেদ। একই রায়ে আদালত তাকে ১০ হাজার জরিমানারও আদেশ দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) মো. নজরুল ইসলামের মা চেমন আরা বেগম হত্যা মামলায় চট্টগ্রামের তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ লা মং ঘোষিত রায়ে আসামি জোহরা বেগম, আবু মোকাররম, শাহ আলম ও শহীদুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। যাবজ্জীবন দণ্ডে দণ্ডিত করা হয় আসামি ইউনুস, মো. আরিফ, মিন্টু দাশ, সাবু ও জাহাঙ্গীরকে। আদালত যাবজ্জীবন প্রাপ্ত পাঁচজনের প্রত্যেককে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছর করে কারাদণ্ড দেন আদালত।

এছাড়া চারজন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের বেকসুর খালাস দিয়েছেন।

দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট মো. আইয়ূব খান জানান, ‘মিদাতের ঘাতকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হওয়ায় তাকে দন্ডবিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন আদালত।’

আদালত সূত্রে জানা গেছে, মিদাত সারিমা রহমান নগরীর ওআর নিজাম রোড আবাসিক এলাকার এক নম্বর সড়কের এক নম্বর বাড়ি ইক্যুইটি সেন্টিরিয়াম অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দা মো. মিজানুর রহমান এবং ডা. শাহনাজ আহমেদ দম্পতির মেয়ে। মিদাত বেসরকারি ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির বিবিএ’র ছাত্রী ছিলেন।

২০১০ সালের ২১ অক্টোবর কোতয়ালী থানার আমিরবাগ হাউজিং সোসাইটির জনৈক সামশুল আলমের আইডিয়াল হাউসের পঞ্চম তলায় বাসার ছাদে খুন হন মিদাত। পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে বিরোধের জের ধরে মিদাত তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সৌরভের ছুরিকাঘাতে খুন হন।

এ ঘটনায় ওই বছরের ২২ অক্টোবর মিদাতের বাবা বাদি হয়ে নগরীর কোতয়ালী থানায় সৌরভকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। এছাড়া হত্যাকান্ডের দু’দিনের মাথায় সীতাকুন্ডের ফৌজদারহাট বিএমএ গেট এলাকা থেকে সৌরভকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর সৌরভ মিদাতকে হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দীও দেন।

মামলা দায়েরের পর তদন্ত শেষে কোতয়ালী থানা পুলিশ ২০১০ সালের ১৪ নভেম্বর সৌরভকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১১ সালের ৩ মে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ এস এম মুজিবুর রহমান। এরপর ওই বছরের ২১ নভেম্বর থেকে ওই আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।

এরমধ্যে ২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি মামলাটি বিচারের ভার বিভাগীয় দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করা হয়। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা ২৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ট্রাইব্যুনালে ২০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে রোববার আদালত রায় ঘোষণা করেন।

রায় ঘোষণার সময় আসামি সৌরভ আদালতে হাজির ছিলেন না। ২০১২ সালের ২৫ অক্টোবর হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে সৌরভ পালিয়ে যায়।

মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে মিদাতের বাবা মো. মিজানুর রহমান জানান, ‘আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি। এখন আমার দাবি আসামি গ্রেপ্তার করে ফাঁসি কার্যকর হোক।

চট্টগ্রাম জেলা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম জানান, ‘চেমন আরা বেগম হত্যা মামলার ১৩ আসামির মধ্যে ৯ জনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারায় আদালত তাদের সাজা দিয়েছেন। চট্টগ্রাম আদালতের একজন সরকারি আইনজীবীর বৃদ্ধা মা নৃশংসভাবে খুনের ঘটনায় এ রায় হয়েছে। সে অর্থে চট্টগ্রাম আদালতের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক রায়। আশা করি উচ্চ আদালতেও এ রায় বহাল থাকবে।’

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ১০ নভেম্বর চন্দনাইশ উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের দক্ষিণ মুজাফফরাবাদ গ্রামের ৫৮ বছর বয়সী বৃদ্ধা চেমন আরা বেগম ওরফে ছেনুয়ারা বেগম নৃশংস খুনের শিকার হন। তিনি চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর নজরুল ইসলাম সেন্টু’র মা।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যাকে পুঁজি করে সেগুলো সমাধানের নামে চেমন আরার সঙ্গে তাদের প্রতিবেশী শাহআলম ও তার স্ত্রী জোহরা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছিলেন। তারা আবু মোকাররম নামে একজনকে ভন্ড বৈদ্য সাজিয়ে চেমন আরার কাছ থেকে প্রায় চার ভরি স্বর্ণালংকার এবং নগদ প্রায় ৪২ হাজার ৫শ’ টাকা হাতিয়ে নেন। পুরো ঘটনার সঙ্গে ১৩ জনের একটি গ্রাম্য টাউট সিন্ডিকেট জড়িত ছিল।

ঘটনার দিন ২০০৯ সালের ১০ নভেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে চেমন আরাকে মাজারে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে যান ভন্ড বৈদ্য আবু মোকাররম। রাতের কোন এক সময়ে মোকাররমসহ কয়েকজন মিলে চেমন আরাকে নৃশংসভাবে শ্বাসরোধ করে খুন করে লাশ ফেলে রেখে যায় চন্দনাইশে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির পশ্চিম পাশে বেরুনীবিলের একটি ধানক্ষেতে। খবর পেয়ে পরদিন পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করেন।

এ ঘটনায় ২০০৯ সালের ১১ নভেম্বর অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম বাদি হয়ে সাতজনকে আসামি করে দন্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় চন্দনাইশ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

এ মামলা প্রথমে পুলিশ এবং পরে সিআইডি তদন্ত করে ২০১০ সালের ৭ আগস্ট আদালতে ১৩ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ওই বছরের ১৮ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়।

অভিযোগপত্রে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ থাকা ৪০ জনের মধ্যে ৩৮ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে রোববার রায় ঘোষণা করেন আদালত। ২০০৯ সালের ১০ নভেম্বর রাতে চন্দনাইশের মুজাফ্ফরাবাদ গ্রামের বাড়ি থেকে চেমন আরা বেগমকে গুপ্তধনের লোভ দেখিয়ে বিজিসি ট্রাস্টের পাশে বিলে নিয়ে হত্যা করা হয়। এ মামলায় ৩৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন।

রায় ঘোষণার পর মামলার বাদি অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply