কবিগুরু তুমি রবে নিরবে, হৃদয়ে মম—রাসেল মাহমুদ

‘তুমি রবে নিরবে, হৃদয়ে মম/ নিবিড় নিভৃত পুর্ণিমায়; তুমি রবে নিরবে। মম জীবন যৌবন, মম আঁখি’র ভুবন/ তুমি ভরিবে গৌরবে, নিশিথে নিষম;/ তুমি রবে নিরবে।’
‘উদয় দিগন্তে ওই শুভ্র শঙ্খ বাজে
মোর চিত্ত-মাঝে
চির-নূতনের দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ।’
আজ বুধবার ২৫ বৈশাখ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫২তম জন্মতিথি। বাঙালির চিন্তা-চেতনায় চির উদ্ভাসিত তিনি। তাঁর অমর প্রতিভা আজও তাড়া করে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে। কখনও ভালবাসায়। পরম আবেগে। অব্যক্ত বিরহে। নতুন সৃষ্টিতে।
১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ (১৮৬৮সালের ৭ মে) কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে। জন্মেও বহু বছর পার হয়ে গেলেও তিনি রয়েছেন বাঙালির হৃদয় মাঝে।
বৃটিশবিরোধী আন্দোলন, ২৪ বছরের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের লেখনী আমাদেরকে উজ্জীবিত করেছে। জীবনের প্রতিটি সমস্যা-সঙ্কট, আনন্দ-বেদনা এবং আশা-নিরাশার সন্ধিক্ষণে রবীন্দ্রসৃষ্টি আমাদের চেতনাকে স্পর্শ করে।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার,গল্পকার, , নাট্যকার, গীতিকার, অভিনেতা, চারুশিল্পী, বাংলাভাষার আধুনিক রূপকার এবং মানবতাবাদী দার্শনিক। জমিদার বাড়ির সন্তান হয়েও সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ বিশ্বমানবতার জন্য বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে কবি বিশ্বে অমর হয়ে আছেন। শুধু এশিয়াতেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ কবিকে স্মরণ করছে নানা ভাবে।
কবির গান-কবিতা, বাণী এই বাংলার মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তির ক্ষেত্রে সাহস যোগায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে শুধু নয়, চিরকালই কবির রচনাসমূহ প্রাণের সঞ্চার করে। আমাদের প্রতিটি সংগ্রামেই শুধু নয়, কবির রচনাসমগ্র সারাজীবন স্মরণের র্শীষতায় আবিষ্ট হয়ে আছে।
রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশকে কতটা হৃদয়ের গভীরে স্থান দিয়েছেন তা বোঝা যায় কবির অসাধারণ গানে ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ কিংবা ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি তুমি এই অপরূপ রূপে আমায় দেখলে জননী।’
‘আমি ভয় করব না, ভয় করব না, দু’বেলা মরার আগে মরব না ভাই মরব না’ কিংবা ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলরে।’ এইভাবে অসংখ্য গানের বাণীতে কবি মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন যুগে যুগে।
‘আজি এই প্রভাতে রবির কর, কেমনে পশিল প্রাণের পর, কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাত পাখির গান, না জানি কেনরে এতোদিন পর জাগিয়া উঠিল প্রাণ, জাগিয়া উঠিল প্রাণ, ওরে উথলি উঠিল বারি।’ কবিতার এমনি অনুষঙ্গের মাধ্যমে বাঙালি জাতিতে সমৃদ্ধ করেন কবি।
বিশ্ববরেণ্য এই কবি শিল্পের প্রতিটি শাখায় সাফল্যের শিখর স্পর্শ করেন। সীমার মাঝে অসীমকে স্পর্শ করাই ছিল তার আজীবনের সাধনা।
তার লেখা ‘আমার সোনার বাংলা/আমি তোমায় ভালোবাসি’ বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও প্রেরণা যুগিয়েছিল তাঁর অনেক গান। তার লেখা গান ভারতেরও জাতীয় সংগীত।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়ায় রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন স্মরণীয় শিক্ষাতাত্ত্বিক। মাতৃভাষাকে শিক্ষার বাহন করে নেন। জালিয়ানওয়ালাবাগের নির্মমতার প্রতিবাদ করতে যখন এগিয়ে আসেননি কোনো রাজনীতিবিদ, তখন তিনি নাইট উপাধি ফিরিয়ে দিয়ে নির্যাতিত মানুষের কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ এই বাংলাদেশ ও দেশের মাটি, মানুষের এমন কোন দিক নেই, যা নিয়ে লিখেননি। তার ক্ষুরধার লেখার গতি এই অঞ্চলের জীবনধারা, কৃষ্টি-সংস্কৃতির প্রাণভাণ্ডার চিরায়ত হয়ে ধরা দিয়েছে তার সৃষ্টিকর্মে।
জাতি আজ এক চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। অনিশ্চয়তার অন্ধকারে অস্পষ্ট আমাদের নিকট এবং দূর ভবিষ্যৎ। এ দুঃসময়ে চিরনতুনের অভিসারী রবীন্দ্রনাথের সীমাহীন সৃষ্টি সম্ভারই হতে পারে আমাদের চলার পথের পাথেয়। জাতির ক্রান্তিলগ্নে পথ দেখাতে পারে আমাদের নতুন প্রজš§, আমাদের তরুণ সমাজ। রবীন্দ্রনাথ তো বলেই রেখেছেন : ‘ওরে নবীন ওরে আমার কাঁচা,/ ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ/আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাই এই মহামানবের উপস্থিতি আমাদের উৎসাহিত করে,প্রেরণা জোগায় সামনে এগিয়ে যাবার।
এত কিছুর সমন্বয়ে একজন রবীন্দ্রনাথ বাঙালি মননের কেন্দ্রভূমি। তার জন্মদিন বাঙালির জীবনে উৎসবের আবহ নিয়ে আসে। তাকে স্মরণ ও পাঠ করার মধ্য দিয়ে আমরা উদ্বীপ্ত হওয়ার চেষ্টা করি।
জাতির সামনে বিরাজমান অমানিশা বিদীর্ণ করে রবীন্দ্র চেতনায় উজ্জীবিত তরুণ সমাজ জাতিকে আলোর পথ দেখাবে মহামানবের জন্মদিনে এমনটিই জাতির প্রত্যাশা।

লেখক-রাসেল মাহমুদ
শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply