প্রসঙ্গ: বাড্ডা জেনারেল হাসপাতালের সেবার মান —-মো. আলী আশরাফ খান

স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিকের সেবার মান নিয়ে বিগত দিনে আমার বেশ কয়েকটি লেখা স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। ওইসব লেখার মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করেছি, স্বাস্থ্য সেবার মান বৃদ্ধিতে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সমূহের মালিক-পরিচালদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার। বেশ কিছু ক্ষেত্রে কিছু ওইসব ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের সেবার মানের পরিবর্তনও আমরা লক্ষ করেছিলাম। কিন্তু এ পরিবর্তন অল্প কিছু দিনের মধ্যেই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। আসলে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ তদারকির ব্যবস্থা না থাকলে যা হয় আর কি!
যাক সে কথা, গত ২৯ এপ্রিল রাতে আমার মেজ ছেলে কাউসার খান ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। সারাদিন রোজা রেখে পরীক্ষা দিয়েছে সে। সে ঢাকা ক্যামব্রিয়ান কলেজে পড়ে। থাকে নর্দার ১৯ নম্বর হোস্টেলে। বড় ছেলে ইলিয়াস খান ওইদিন প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটিতে টেক্সটাইল-এর বিএসসি ফাইনাল পরীক্ষা শেষে মহাখালি টিএনটি মহিলা কলেজে আসলো। কাউসারের এইচএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র ওইখানেই। কাউসারের কেমেস্ট্রি পরীক্ষা শেষে ইলিয়াস আমাদেরকে তার বাসা উত্তর বাড্ডায় নিয়ে এলো। অভ্যাস অনুযায়ী কাউছার খান চুড়ান্ত পরীক্ষার সময় রোজা রাখে অষ্টম শ্রেণীতে যখন পড়ে তখন থেকেই। আজকের প্রচ- গরমেও রোজা রেখেছে সে। ইফতারের সময় এক গ্লাস পানি আর একটি মাত্র তরমুজের টুকরো খাওয়ার পরপরই তার পেট ব্যথা শুরু হয়। আমি প্রথমে তাকে বাড্ডার একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ‘উপশম’-এ নিয়ে গেলাম। একজন এমবিবিএস ডাক্তার তার প্রেসক্রিপশন দিলেন। একটি ইনজেকশন ও ১৪ টি সিপ্রোসিন ট্যাবলেট লিখলেন তিনি।
আমরা তাকে বাসায় নিয়ে এলাম। একটু আরাম বোধ করছিল সে। তখন সময় রাত দশটার কাছাকাছি। হঠাৎ আবার তার তীব্র ব্যথা শুরু হল। অসহ্য ব্যথায় হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে ছেলে আমার। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ। কথা বলার ভাষা যেন আমার হারিয়ে গেছে। তারপরও নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলাম। আমি, ইলিয়াস ও তার আম্মু কাউসারকে ঢাকা উত্তর বাড্ডার ‘বাড্ডা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ওইখানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহকারি অধ্যাপক কবির সাহেবকে দেখানো হল। তিনি বললেন, ‘হয়তো পাথরের সমস্যায় প্রশ্রাব হচ্ছে না এবং ব্যথাও বেড়ে গেছে। চিন্তার কারণ নেই সেরে যাবে’। ডাক্তার সাহেব ৫শ’ টাকা ফি নিয়ে একটি ব্যবস্থাপত্র দিলেন। এক্সরে, স্যালাইন ও কয়েক প্রকারের ট্যাবলেট-ক্যাপসুল লিখলেন তিনি। হাসপাতালের বিচিত্র নিয়ম অনুযায়ী এক্সরে করানোর পূর্বেই আমাকে ৬শ টাকা পরিশোধ করতে হল লাইনে দাঁড়িয়ে। রোগী তার তীব্র ব্যথায় কাতরাচ্ছে আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে তাদের নীয়ম-কানুন মানতে বাধ্য করছেন।
এমন সময় ইউনিভার্সিটি পড়–য়া কয়েকজন ছাত্র আমাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে এলেন। তারা যথা সম্ভব তড়িঘড়ি করে আমাদের জন্য ছোট একটি কক্ষের ব্যবস্থা করলেন। ৩য় তলার ৪০৫ নম্বর এ কক্ষটি ৯-১০ ফুট হবে হয়তো। ফ্যানের বাতাস নেই বললেই চলে। বাথ রুমের দরজায় ছিটকানি নেই এবং ময়লা-আবর্জনায় গিজগিজ করছে। রুমের ভেতরে প্রচুর ধুলোবালি। রোগীকে বিছানায় শুইয়ে দেয়া হল। কাউসার প্রচ- ব্যথায় কাঁদছে। ছেলেরা একটি টেবিল ফ্যানের ব্যবস্থা করলো। একটু পরে নার্স এসে বললেন, নিচ থেকে রোগীর ফাইল না আসা পর্যন্ত তিনি কোন ওষধপত্র দিতে পারবেন না। অথচ, আমি নিজেই তাদের নির্দিষ্ট ফার্মেসী থেকে সব ওষধ নগদ টাকায় কিনে নিয়ে আসি ব্যবস্থাপত্র পাওয়ার সাথে সাথেই। আমার এক বোন উপরে-নিচে উঠা নামা করছে রোগীর ফাইলের জন্য। অনেকক্ষণ পরে একজন ভদ্র লোক এসে বললেন, ‘ফাইল তৈরি করতে দেরি হবে’। তখন রাত প্রায় এগারোটা। ভর্তি হওয়ার প্রায় এক ঘন্টা পর আমাদের পিড়াপিড়িতে একজন নার্স এসে একটি স্যালাইন দিয়ে বললেন, ‘ফাইল না আসা পর্যন্ত আর কোন ওষধপত্র দেয়া যাবে না’। রোগীকে নিয়ে কঠিন সমস্যার মুখোমুখি আমরা। স্যালাইন চলছে দ্রুত গতিতে। এক সময় ফাইলও এসেছে। অন্যান্য ওষধও খাওয়ানো হল তাকে। বেশ কিছুক্ষণ পরে আমি হঠাৎ খেয়াল করলাম স্যালাইনটি শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। স্যালাইনের গতি খুব বেশি। আমি দৌঁড়ে গিয়ে নার্সকে বললাম, ম্যাডাম যতটা জানি, স্যালাইনের গতি প্রতি মিনিটে ১০ ফোঁটা হয়। কিন্তু এ স্যালাইনটি তো খুব দ্রুত চলছে। তিনি এসে দেখেন স্যালাইন প্রায় শেষ। স্যালাইনটি খুলে ফেললেন তিনি। এবং ভুল স্বীকার করে বললেন, তার পূর্ববর্তী নার্স এ কাজটি করেছেন।
রাত প্রায় একটা বাজে। কাউসার কিছু খেতে চাচ্ছে। নার্সকে জিজ্ঞাস করলাম, রোগীকে কি খাওয়ানো যাবে। তিনি বললেন, ‘রোগী যা খেতে চায়’। ভাত আর সবজি খাওয়ানো হল তাকে। কাউসার শুয়ে পড়েছে। ঘুমাচ্ছে। রাত আড়াইটা বাজে। আমিও আমার স্ত্রী বসে আছি তার পাশে ফ্লোরে। একটু পরে দেখলাম দরজার পাশে একটি চাদর ও বালিশ রাখা আছে। আমার স্ত্রী বললো কয়েকজন ছাত্র এগুলো রেখে গেছে। চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম। সকাল প্রায় পাঁচটা বাজে তখন। হঠাৎ মনে হল শরীর ভিজে যাচ্ছে। লাইট জ্বেলে দেখি পানিতে ফ্লোর ভেসে গেছে। পাশের রুমের বাথরুম থেকে দেয়াল চুঁইয়ে চুঁইয়ে এ পানি এসেছে। তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকলাম। বাথ রুমের অবস্থাও নাজুক। ময়লা, ধুলাবালি, বালতি, নষ্ট ঝর্ণা সব কিছু মিলিয়ে ব্যবহারের অনুপযোগি। তারপরেও গোসল করলাম এক ছাত্রের আনা সাবান দিয়ে।
সকাল ৬টায় নার্সকে বললাম, রোগীর অবস্থা এখন অনেকটা ভাল। তাছাড়া ক্যামব্রিয়ানের হোস্টেল থেকে ফোন দিচ্ছে তাকে দ্রুত নিয়ে যেতে। এরপরের দিন পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য ট্রিচার এসে বসে আছেন। ক্যামব্রিয়ান কর্তৃপক্ষ চেয়েছিল তাদের নিজ খরচে ইউনাইটেড কিংবা এ্যাপোল হাসপাতালে ভর্তি করাতে। হোস্টেলের তাগিদেই আমরা তাড়াতাড়ি বলেছিলাম আমাদেরকে রিলিজ দেয়ার জন্য। কয়েকবার বলার পর তিনি বললেন ‘অপেক্ষা করুন, আমি ব্যবস্থা করছি’। দুই ঘন্টা হয়ে গেল তার আর দেখা পেলাম না। অন্য এক নার্সকে বললে তিনি বললেন, ‘আমি ব্যবস্থা করছি’। তখন সকাল প্রায় সাড়ে ৯টা বাজে। আমি বিরক্ত হয়ে রুম থেকে বের হতে গেলে একজন নার্স এসে বললেন, ‘বিল পরিশোধ করে রুম থেকে বের হবেন। তাছাড়া আপনাদের ফ্যান, চাদর ও বালিশ রুমে রাখতে পারবেন না। ওইসব রাখলে, আরেক দিনের ভাড়া দিয়ে যেতে হবে’। আমি হতবাক! সকাল ৬টা থেকে বলে আসছি রিলিজের কথা। তাছাড়া যে ছাত্ররা ফ্যান, বালিশ ও চাদর দিয়ে গেছেন তাদেরকে ফোন দেয়া হয়েছে। ওরা আসতে যতক্ষণ সময়। এসময়ের জন্যও নাকি তাদেরকে আরেক দিনের রুম ভাড়া দিয়ে যেতে হবে! আমি তর্ক না বাড়িয়ে ওইসব মালামাল কাঁদে নিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।
আমার হাঁটা দেখে নার্স বলছেন, আমাদের বিলের কি করলেন? বিল কত টাকা সেটাও তিনি বলতে পারলেন না! পরে নিচে নামলে এক ভদ্রলোক আমাকে ১৭শ টাকার একটি রশিদ দিয়ে বললেন, এটি ক্যাশে জমা দিলেই হবে। আর যদি মালিকের সঙ্গে খাতিল থাকে তাহলে ২শ টাকা কমাতে পারবেন। আমি আবার হতবাক!! বড়জোর ওই রুমটির ভাড়া ৫শ টাকা হতে পারে। (অবশ্য রাতে আসা ইউনিভার্সিটির ছেলেরা আমাকে বলেছিল,‘আংকেল যাওয়ার সময় আমাদের ফোন দিয়েন, বিল অর্ধ্বেক কমানোর ব্যবস্থা আছে’।) আমি পুরু টাকা দিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করলাম। আমার স্ত্রীও হাসপাতালের সামগ্রিক বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলো।
পরিশেষে আরো দু’চারটি লাইন দিয়ে শেষ করবো এ লেখা। আসলে বাংলাদেশের প্রায় সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অবস্থা এমনই। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক-পরিচালকরা সেবা নয় রোগীদের গলাকাটার জন্যই এ ব্যবসা দিয়ে বসে আছেন। আমি পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, যে এক্সরেটি করা হল ওইখানে এর মূল্য হতে পারে সর্বোচ্চ ৩শ টাকা। সব জায়গায়ই দুর্নীতি আর মানুষ ঠকানোয় ব্যস্ত ওরা। একটি রুমের ভাড়ার সময়কাল কতটা এটা ওরা জানে ঠিকই কিন্তু সাধারণদের ঠকানোর জন্য এমন সব আচরণ করে। তাদের বোঝা উচিৎ, মানুষকে সেবা করার সুযোগ কিন্তু বারবার আসে না। এমনও হতে পারে একজন রোগী তার জীবনে একবারই যেতে পারে কোন হাসপাতালে। ভাল-মন্দ বিষয়টি তার মনে রেখাপাত করতে পারে দীর্ঘদিন। মানুষ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে যায় সেবা ভাল পাওয়ার জন্য। কিন্তু বাড্ডা জেনারেল হাসপাতাল আমাদেরকে ভাল সেবা দিতে পারেনি। আমার জীবনের প্রায় ১১ ঘন্টা সময় কাটিয়ে এলাম ওই হাসপাতালে। যা মনে থাকবে আজীবন।

লেখক: কবি-কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply