দায়িত্ববোধ সম্পর্কে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে —মাসুমুর রহমান মাসুদ

ইংরেজি ভাষায় একটি প্রবাদ আছে ‘Oil in your own machine’. বাংলায় এর পরিভাষা ‘নিজের চরকায় তেল দাও’। থাকলেই তো দিবে…..। পরের চরকায় তেল দিতে দিতে কৌটা খালি। এখন নিজের বেলায় তেল নেই ! বড় বাবুদের সদিচ্ছার উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। সামাজিক সচেতনতা, উন্নয়ন, মূল্যবোধ সৃষ্টি, ন্যয়পরায়নতা, জবাবদিহীতা ইত্যাদি। আর রাজনীতিক নেতাদের উপর নির্ভর করে কর্মীদের সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চার দেখা পাওয়া না পাওয়া।
আমরা পরের সমালোচনা করতে বড়ো ভালবাসি। নিজের দোষ দেখিই না ! তবে, এক্ষেত্রে মনে রাখা ভলো যে, সমালোচনা প্রয়োজন, যদি তা গঠনমূলক হয়। অনেকে আবার বিরোধীতার খাতিরে সমালোচনা করেন। যা গঠনমূলক তো নয়ই যৌক্তিকও নয়। সে থেকে আমাদের পরিত্রাণ পেতে হবে। তবে গঠনমূলক সমালোচনা যদি আমার ক্ষেত্রেও হয়, তা আমি মেনে নেবো। শুধু আমার ক্ষেত্রে নয় ব্যক্তিমাত্রই ওই মনোভাব থাকা প্রয়োজন। অনেকেই বিরোধীতার জন্য সমালোচনা করেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় একদল অন্যদলের সমালোচনা করছে। কিছু যৌক্তিক আবার কিছু হয়তো বিরোধী দল হিসেবে বিরোধীতা। তবে, ভাল কাজের কদর আজও আছে। মেঘ যেমন সূর্যকে সব সময় ঢেকে রাখতে পারে না, তেমনি সত্যও কখনও চাপাপড়ে থাকে না। প্রাশ্চাত্যের এক মহা-দার্শনিকের মতে ‘তর্কও এক ধরনের জ্ঞান’। কিন্তু সে তর্ক যদি ফলপ্রসু হয় এবং তর্কের মধ্য দিয়ে যদি মূল বিষয়টি উদঘাটিত হয়।
সাংবাদপত্রকে সমাজের দর্পণ বলা হয়, আর সাংবাদিকরা জাতির বিবেক। তবে সে সাংবাদিকতা অবশ্যই রাষ্ট্রীয় ও সংবাদপত্রের জন্য প্রযোজ্য আইন মেনে সুস্থ ধারার হতে হবে। কেউ অপসাংবাদিকতা করলে সে জাতির বিবেক হতে পারে না। কারণ কারো ব্যক্তি অনৈতিক কার্যাবলী বা দোষের জন্য গোটা জাতি কলঙ্কের বোঁঝা মাথায় নেবে তা কাম্য নয়।
দেশের বিভিন্নস্থানে যখন নাশকতা, নৈরাজ্য, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করছে তখন তার তুলনায় আমরা চান্দিনাবাসী ভাল আছি- একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সরকারি দল ও জোট এবং বিরোধী দল ও জোটের স্থানীয় নেতারা এ ক্ষেত্রে ভ্রাতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলকে তার দলীয় দায়িত্ববোধ সম্পর্কে আরও সচেতন থাকা আবশ্যক।
দলের ভেতরে ও বাইরে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। কর্মীদের কাছে নেতাদেরও জবাবদিহীতা নিশ্চিত করতে হবে। সম্প্রতি বিএনপি আহুত ৩৬ ঘন্টা হরতালে একেবারেই নিরব ছিল উপজেলা ও পৌর বিএনপি নেতৃবৃন্দ। হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল পর্যন্ত বের করা হয়নি। হরতালের নামে নাশকতা কাম্য নয়। অন্য দলের কর্মীদের সাথে সংঘর্ষও কাম্য নয়। ব্যবসায়ীরা ভাংচুরের মধ্যদিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হোক তাও কাম্য নয়। তবে রাজনীতিক দল হিসেবে দলীয় কর্মসূচি, জাতীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করা সমীচিন। বর্ষীয়ান রাজনীতিক এ দলে কম নয়। দীর্ঘ সময়ের ওই হরতালে রাজপথে বিএনপি’র কারও দেখা মিলেনি। দলীয় কর্মকান্ডে মন নেই এমনও বলা যাবে না। ২৬ এপ্রিল উপজেলা ও পৌর স্বেচ্ছাসেবকদল এর সম্মেলন হয়েছে। এটি একটি ভাল পক্রিয়া। সম্মেলনও সফল হয়েছে বলে নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন। কোন মতানৈক্য ছাড়াই সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক পদগুলোতে নেতাকর্মী মনোনয়ন করা হয়েছে। বক্তৃতার সময় নেতা অভাব নেই। আগে-পরে নিয়েও জটিলতা দেখা দেয়। দলীয় শীর্ষ নেতারা মঞ্চে থাকলে তাদের খুশি করতে যত রকমের বক্তৃতা দেওয়া যায় তা দিতে কেউই কার্পণ্য করেন না। বাড়িয়েও অনেক কথা বলা হয় যা হয়তো না বললেও হতো।
আজকাল অনেককেই বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর বলা হয়। সেটা সত্য না মিথ্যা এ নিয়ে আমার কোন প্রশ্ন নেই। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর একজন প্রকৃত ঘনিষ্ঠ সহচর প্রয়াণ করেছেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান। আওয়ামীলীগের একজন অন্যতম কান্ডরী ছিলেন তিনি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে অদ্যাবধি তার জন্য একটি স্মরণসভা বা শোকসভা করার দায়িত্ব অনুভব করেননি চান্দিনা উপজেলা ও পৌর আওয়ামীলীগ বা সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এবছরের একটি জাতীয় দিবসে উপজেলা আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে আলোচনা সভাও করেনি দলটি। যা অচিন্তনীয়। এদিকে পৌর স্বেচ্ছাসেবকলীগের সম্মেলনে নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা গেছে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ বিনাদ্বিধায় মনোনয়ন হয়েছে। এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের ক্ষেত্রে উদাসিনতার পরিচয় দিয়েছেন অনেক কর্মকর্তাই। অল্পকিছু দিন আগে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’ গেল। চান্দিনাবাসী পত্রিকার মাধ্যমেই জানতে পেরেছে দিবসটির কথা। অনেক পত্রিকা পাঠকরাই ফোন করে বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন। চান্দিনা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ওই বিভাগের বড় বাবু) এ উপলক্ষ্যে কোন সচেতনতা মূলক কর্মকান্ড তো দূরের কথা ঘরোয়া একটি আলোচনা সভাও করননি। কিন্তু আমাদের অনেকেই তাদের পেয়ে কি খুশি ! যা বলি তাইতো হয় !
গত ২৫ এপ্রিল উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় পুলিশের বড় বাবু অর্থাৎ অফিসার ইন চার্জ কে অনেক বক্তাই খুব বাহবা দিয়েছেন। তার বলিষ্ঠ ভূমিকায় নাকি চান্দিনা ও দেবিদ্বারের দুটি গ্রামের অধিবাসীদের মধ্যে সংঘর্ষটি ভয়াবহ রূপ নিতে পারেনি। অবাক হলাম। ঘটনাক্রমে সেদিন আমিও ওই সভায় উপস্থিত। তিনি যদি তাৎক্ষণিক কার্যকর পদক্ষেপ নিতেন তাহলে ব্যবসায়ীদের এত বড় ক্ষতির সম্মুখিন হতে হতো না। ডিম বেপারী, তরমুজ বেপারী, ফুটপাতের দোকানী, মোবাইল ব্যবসায়ী কেউ রক্ষা পায়নি। রক্ষা পায়নি রাজনীতিকরাও। লুট হয়েছে, ভাংচুর হয়েছে। অস্ত্রের মহড়া হয়েছে। অদ্যাবধি বাহবা পাওয়া ওই বড় বাবু অধীনস্থদের দিয়ে একটি অস্ত্রও উদ্ধার করাতে পারেননি। মোটরসাইকেল পোড়ানোর সহ নানা অভিযোগে মামলা হয়েছে। কেউ গ্রেফতার হয়নি ! বিজ্ঞ সাংবাদিক বড় ভাই মামুনুর রশিদ সরকার যথার্থই বলেছেন সেদিন। তাঁর মতে ‘সমাজে ভাল মানুষের সংখ্যা বেশি, খারাপ মানুষের সংখ্যা কম এবং তাদেরকে সবাই চেনে।’ তিনি ওই সময় অবৈধ অস্ত্রগুলো উদ্ধার এবং লুটেরা ও দোষীদের গ্রেফতারের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবিও জানিয়েছেন। এ কথাগুলো লিখলে আবার অনেকেই সমালোচনা করেন। বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে একটি ছোট সংবাদ ছাপা হলো কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত একাধিক পত্রিকায়। চান্দিনায় ১৬ জুয়াড়িকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। এই শিরোনাম দেখে আগ্রহের সাথে অনেকেই সংবাদটি পড়েছে। একাধিক পাঠক আমাকে ফোন করে জানতে চেয়েছেন ‘কেন ছেড়ে দিল ! এই ব্যাখ্যা সংবাদটিতে নেই’। এতে সংবাদটি পড়ে তাদের তৃপ্তি মিটেনি। বললাম ভাই এটি ওপেন সিক্রেট।
বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলার মাঝে আরও কত খেলা লুকিয়ে আছে কে জানে ! প্রচন্ড তাপদাহ। লোডশেডিং এমন অবস্থায় পরিণতি পেয়েছে যে, এখন আর বিদ্যুৎ যায় না। মাঝে মাঝে আসে। অফিসে খোঁজ নিলে লাইনম্যানরা বলেন ইরিগেশন (সেচ) এর কথা। কয়েকদিন আগে এক লাইনম্যানকে আমাদের এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন এক টানা চার ঘন্টা ধরে লোডশেডিং কি ব্যাপার ? তিনি বললেন, ইরিগেশন এর কারণে। বিজ্ঞ সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন- বোরো ধান কাটা প্রায় শেষ এখন কিসের ইরিগেশন ? পরে লাইনম্যান বললেন ভাই বিদ্যুতের জেনারেশন (উৎপাদন) কম।
কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১। সেখানেও জিএম পদে এক বড় বাবু আছেন। তিনি সকলকেই আশ্বাস দেন, কাজ হয় কিনা ভুক্তভোগীরাই বলতে পারবে। কোন কারণ ছাড়াই এক বছর ধরে নতুন সংযোগ প্রদান বন্ধ। আমার এক প্রিয় ব্যক্তি বলেন- মানুষের তিন হাত, ডান হাত, বাম হাত আর অজুহাত। সকল ফিডার ওভার লোড, ফিডার লাইন নির্মাণের কাজ চলছে-এমন নানা অজুহাতে নতুন সংযোগের আবেদন নেয়াও বন্ধ। পুরাতন আবেদনকারীদের মধ্যে হাজার হাজার গ্রাহকের সিএমও হয়ে আছে। আবেদন অনুযায়ী সিরিয়ালে মিটার লাগানো হবে বলে যা হচ্ছে তা সকলেরই জানা। চাবি নেই, তার নেই, মিটার নেই……অজুহাতের শেষ নেই। বড় বাবুই জানেন তার লক্ষ্য কি ? মিটার পাওয়ার আগে নির্ধারিত ফি দিয়ে গ্রাহকদের সমিতির সদস্য হতে হয়। সে সদস্যরা প্রতিনিধি (এলাকা পরিচালক) নির্বাচিত করে তাদের মাধ্যমে সমিতির কাছ থেকে ন্যায্য হিস্যা তথা জবাবদিহীতা নিশ্চিত করবেন। কিন্তু আরেক বড় বাবু অন্য এক জনৈক পরিচালককে উৎসাহ দিয়ে উচ্চ আদালতে যে মামলা করিয়েছেন তাতে সে পথও বন্ধ। পরিচালকরা নির্বাচিত হয়েও ‘ফ্রেমে বাঁধাই করা ছবি’ হিসেবেই আছেন। ফলে বড় বাবুই সর্বেসর্বা। সংসদ সদস্যদের বরাদ্দ নিয়েও তেলেসমাতি আছে। কে কতটুকু পান এ নিয়ে কেউ প্রশ্নও তুলেন না। কারণ প্রত্যেককে খুশি রাখার পদ্ধতি জানাআছে। এখানকার গ্রাহকরাও খুবই নিরীহ। জিএম সাহেবের রুমে গেলে কিছু সময় পর তিনি বলেন ‘আপনি আসেন, আপনার সাথে আর কথা বলতে পারবো না’। এমন অভিযোগ আমরা অনেক পেয়েছি। অনেকেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কি লাভ, দুঃখ প্রকাশ করলেও কোন ফল পাওয়ার আশা নেই। যে সদস্য বা গ্রাহকদের সার্ভিস চার্জ, মিটার ভাড়া, জামানত এর মুনাফা ইত্যাদি থেকে সেই বড় বাবুসহ অধীনস্থদের বেতন দেওয়া হয় সে গ্রাহক বা সদস্যদের কথা ভাবার সময় কোথায় ! বড় কোন দুর্ঘটনা না ঘটলে তার (বড় বাবুর) অফিস বা বাসভবনে তো বিদ্যুত বিভ্রাট হয়না। তার তো মিটার নামানোর প্রয়োজনও পরেনা !
এমন যদি হয়- ‘যে সরষে দিয়ে ভূত তাড়াবেন, সে সরষেতেই ভূত !’ তাহলে কি কাজ করা সম্ভব ? অন্যের খয়ের খাঁ হয়ে নিজের দায়িত্বটা সঠিকভাবে পালন না করলে নিজের সাথেই যে প্রতারণা হচ্ছে তার কি হবে ?
গত ২৮ এপ্রিল উপজেলার বাতাঘাসী ইউনিয়নের শব্দলপুর এলাকা থেকে ৬টি তাজা ককটেল উদ্ধার হয়েছে। এর আগে পুলিশের উপর হামলা হয়েছে। দুই উপজেলার দুটি গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। দৃষ্টান্তগুলো মোটেও শুভ নয়। প্রয়াত বরেণ্য সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ এর ভাষায় বলতে চাই ‘পাগলা ঘোড়া এখনও লাগামহীন হয়নি’। এখনই এই পরিস্থিতিকে দমিয়ে রাখতে হবে। তা করতে ব্যর্থ হলে উদ্ভুত পরিস্থিত সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

লেখক-
সাধারণ সম্পাদক
চান্দিনা রিপোর্টার্স ইউনিটি

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply