নির্বাচনি আমেজে পুড়ো মালয়েশিয়া : সরকারী দল ও বিরোধীদলের লড়াই হবে হাড্ডা হাড্ডি

এম.আমজাদ চৌধুরী রুনু, মালয়েশিয়া থেকে:–

নির্বাচনি আমেজে পুড়ো মালয়েশিয়া বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচন আগামি ৫ই মে রবিবার। গত ৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার পর দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নির্বাচনের এ তারিখ ঘোষণা করা হয়। আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বিরোধী দলের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে কারণ গত নির্বাচনে কুয়ালালামপুর সহ কয়েকটি প্রদ্বেশে সরকারী দলের ভরাডুবির পর এবার শতর্কাতায় এগুচ্ছে হ্মমতাসীন দল বিএন। প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক সংসদ ভেঙে দেয়ার এক সপ্তাহ পরে নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান আজিজ ইউসুফ ঘোষণা দেন। ২০ এপ্রিল থেকে দু’সপ্তাহব্যাপী আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়েছে। দ্য ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও) ১৯৫৭ সালে দেশটির স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বিভিন্ন জোট সরকারের মাধ্যমে মালয়েশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এবং মালয়েশিয়া কে আজ বিশ্বের কাছে এক উন্নয়শীল দেশ হিসাবে তুলে ধরেছেন তার পরও এবারের নির্বাচনে তারা দুর্দান্ত এক প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। তারা দুর্নীতি ও দলীয়করণের অবসান ঘটিয়ে নির্ভরযোগ্য শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ইউএমএনও’র অধীনে বহুজাতিক মালয়েশিয়া অর্থনৈতিকভাবে সফল এক দেশ হিসেবে সমুজ্জল উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয় ও অন্য সংখ্যালঘুদের মধ্যেও শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। নাজিব রাজাক তার সরকারের নির্বাচনে অপরাজিত থাকার ইতিহাসকে আসন্ন নির্বাচনেও অক্ষুন্ন রাখতে চান। সে লক্ষ্যে তিনি জোর দিচ্ছেন দেশের স্থিতিশীল অর্থনীতির তত্ত্বাবধানে, প্রতিশ্রুতি আর জনসাধারণের মাঝে পর্যাপ্ত অর্থ বিতরণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানে। নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হওয়ার পর নাজিব রাজাকের এক মুখপাত্র বলেন, এই নির্বাচন হচ্ছে, যোগ্য ও সংস্কারপন্থি এক সরকারকে পুনঃনির্বাচিত করা অথবা উগ্র, অনভিজ্ঞ বিরোধী দলের হাতে দেশের উন্নয়ন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া, এ দুইয়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নির্ধারণ। কিন্তু বিরোধী দল স্বচ্ছ নির্ভেজাল শাসন ব্যবস্থা কায়েম, জনসাধারণে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত তথ্য মাধ্যমকে উন্মুক্ত করে ইন্টারনেটে তথ্য প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি জানতে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিরোধী দল এ যাবৎকালের সব থেকে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। ওই নির্বাচনে তারা ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর কয়েক দশকব্যাপী একচ্ছত্র আধিপত্যকে স্লান করে দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্বাদ দিয়েছিল। গত দু’বছর ধরে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছিল। প্রধান মন্ত্রী নাজিব সংসদ ভেঙে দিলে পরে আসন্ন নির্বাচনের বিষয়টি সুষ্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ মাসের শেষেই সরকারের সময়সীমা পূর্ণ হতে চলেছিল। ইউএমএনও নিয়ন্ত্রিত ব্যরিসান ন্যাশনাল কোয়ালিশন (ন্যাশনাল ফ্রন্ট) ২০০৮ এর নির্বাচন পূর্ব সকল নির্বাচনেই স্বচ্ছন্দে জয়লাভ করে। ২০০৮ সালে তারা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। এবারে তারা স্মরণকালের সব থেকে বড় নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহীম নেতৃত্বাধীন পাকাতান রাকায়াত (পিপলস প্যাক্ট) এর সঙ্গে। মালয়েশিয়ার কিংবদন্তী নেতা মাহাথির মোহাম্মদ নিজে আনোয়ার ইব্রাহীমকে ইউএমএনও’র নেতৃত্বের উত্তরসূরী হিসাবে নির্বাচন করেছিলেন। ১৯৯৮ সালে আনোয়ার ইব্রাহীমকে সরকার থেকে বহিষ্কার করা হয়। এই দু’নেতার ক্ষমতার দ্বন্ধে তিনি কারাবরণ করেন। এর প্রভাবে মালয়েশিয়ার রাজনীতি সাংঘাতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আনোয়ার ইব্রাহীম জানান, গণতন্ত্রের আদর্শ বিকল্প ব্যবস্থা উপস্থাপন এবং আরও দায়িত্বশীল সরকার গঠনের জন্য এটাই পাকাতান রাকায়াতের সর্বোত্তম সুযোগ। আমি মনে করি, আমাদের জয়ের সম্ভাবনা ভাল। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে মাথায় রেখে উভয় দলই ভোটারদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন নির্বাচনী অঙ্গীকার করছে। নাজিব তার প্রচারণায় গরিবদের জন্য আরও অর্থ সাহায্যেও প্রতিশ্রুতি দেন। অন্যদিকে পাকাতান প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, আয় বৃদ্ধি কর্মসূচি এবং অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার করে। বিরোধী দল এবং নির্বাচনী সংস্কারপন্থি আইনজীবিদের অভিযোগ হচ্ছে- এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা অবাধ ও সুষ্ঠু নয়। কারণ নির্বাচনী কিছু ব্যবস্থা সরকার সহায়ক এবং ভোটার তালিকায় গড়মিল রয়েছে। ফলে খোলাখুলি কারচুপি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার এ সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলে সাম্প্রতিক সময়ে ভোটগ্রহণ ব্যবস্থায় অনেক সংস্কার করা হয়েছে যেমন অমোছনীয় কালির ব্যবহার যেন একাধিক ভোট প্রদানের সুযোগ না থাকে। নির্বাচন কমিশনার আজিজ বলেন, দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলো ভোটগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করবে। নাজিব ২০০৯ সালে জাতিগত মালয় কর্তৃত্বপূর্ণ শাসক জোট এর হাল ধরেন। এর আগের বছর তার পূর্বসূরি নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার ফলে চাপের মুখে পদত্যাগ করলে নাজিব দায়িত্ব নেন। ভোটারদের কাছে প্রতিশ্রুতিকে মাথায় রেখে নাজিব দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করার জন্য ও জনসাধারণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেন। গতবছর বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫ দশশিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বিরোধী দল নাজিবের সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলোকে দায়সারা বলে আখ্যায়িত করে আরও অভিযোগ করে সরকারের উপর্যুপরি দুর্নীতি কেলেঙ্কারির। বর্তমানে সংসদের ২২২ আসনের মধ্যে ১৩৫টি ও ১৩ রাজ্যেও ৯টি বারিসানের দখলে আর বাকি ৭৫ আসনও চার রাজ্য বিরোধী দলের।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply