প্রধানমন্ত্রী মুরাদনগর সফর: প্রতিষ্ঠার ৭২ বছরেও সরকারিকরন না হওয়া শ্রীকাইল কলেজ নিয়ে নতুন আশা!

মো. শরিফুল আলম চৌধুরী, মুরাদনগর (কুমিল্লা) থেকেঃ–
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে মুরাদনগরের শ্রীকাইল কলেজ সরকারিকরন ও প্রতিটি ঘরে ঘরে গ্যাস সংযোগসহ ২২ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত বিশাল উপজেলা মুরাদনগরের উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে মুরাদনগরবাসী। তারা ৭২ বছরের পূরানো শ্রীকাইল কলেজকে সরকারিকরন ও মুরাদনগরের প্রতিটি গ্রামের ঘরে ঘরে গ্যাস সংযোগসহ এ উপজেলার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে এ দিন জোর দাবি তুলবে এমন আভাস পাওয়া গেছে। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন বিদ্যাপীঠ হিসেবে এশিয়া মহাদেশে পরিচিত ‘শ্রীকাইল কলেজ’। মুরাদনগরসহ পার্শ্ববর্তী নবীনগর, বাঞ্চারামপুর, দেবীদ্বার ও কসবা উপজেলার একমাত্র আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৪১ সালে এই কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন ওই এলাকার বাসিন্দা ক্যাপ্টেন নরেন্দ্র নাথ দত্ত।
বিভিন্ন সময়ে এ দেশের রাষ্ট্র প্রধানরা এ কলেজটিকে ঘিরে অনার্স কোর্স চালুসহ সরকারিকরনের দফায় দফায় প্রতিশ্রুতি দিলেও তা কার্যত বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ অঞ্চলের জনমনে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানাযায়, কলেজটি সরকারিকরনের জন্য রয়েছে উপযুক্ত একাডেমিক ভবনসহ রেকর্ডভুক্ত প্রায় ৩০ একর সম্পত্তি, এর মধ্যে ৯ টি পুকুর ও ১ টি বিশাল খেলার মাঠ। প্রায় ৬ একর পাঁকা সীমানা প্রাচীর ঘেরা কলেজ ক্যাম্পাসে আছে ৩ টি একাডেমিক ভবন, ত্রিতল বিশাল মূল ভবনের সামনেই প্রতিষ্ঠাতার আবক্ষ মূর্তি, শহীদ মিনার, স্বচ্ছ জলের দর্শনীয় পুকুর, মনোরম অধ্যক্ষের বাসভবন, অডিটোরিয়াম, সোনালী ব্যাংক শাখা, কারুকার্য ও নকশাখচিত নজরকাড়া জামে মসজিদ ও কয়েকটি ষ্টাফ কোয়ার্টার। কলেজ ক্যাম্পাসের বাহিরে ১ টি ত্রিতল ভবনের ষ্টাফ ফ্যামিলি কোয়ার্টারসহ আরো ২০ টি ষ্টাফ কোয়ার্টার, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পৃথক দ্বি তল ভবনের ২ টি আবাসিক হল।
এ কলেজে বিভিন্ন সময়ে সফরকালে রাষ্ট্রপতি, উপ-রাষ্ট্রপতি এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৪ সালে এবং
বর্তমান প্রধানমন্তী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে মুরাদনগরের খেলার মাঠে আয়োজিত মহা সমাবেশে, ১৯৯৮ ও ২০০১ সালে নির্বাচনী প্রচারনায় এসে কলেজটিকে সরকারিকরনের প্রতিশ্রুতি দিলেও এ পর্যন্ত প্রাচীন এ কলেজটি আদৌ সরকারিকরন করা হয়নি।
কলেজটি প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডিগ্রী কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এ কলেজে ১৯৮০ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মেজর অব. জিয়াউর রহমান, ১৯৮৪ সালে উপ-রাষ্ট্রপতি নূরুল ইসলাম ও ফাস্ট লেডি বেগম রৌশন এরশাদ পরিদর্শনে এসেছিলেন। ১৯৯৪ সালের ১৯ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শ্রীকাইল কলেজ পরিদর্শনকালে কলেজটি সরকারিকরনের প্রতিশ্রুতি দেয়ায় ওই বছরের ২২ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব ড.কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীর স্বাক্ষরিত পত্রের মাধ্যমে কলেজটি সরকারিকরনের জন্য জেলা প্রশাসক কুমিল্লা, শিক্ষা মন্ত্রনালয় ও পূর্তমন্ত্রনালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি চালাচালি শুরু হয়। ওই চিঠির প্রেক্ষিতে যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হতো তাহলে এতোদিনে হয়তো কলেজটি সত্যিই সরকারি কলেজে রুপান্তরিত হয়ে যেতো। কিন্তু এ যাবত আর কলেজটি সরকারি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করতে পারে নি। এ নিয়ে এলাকাবাসী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। এদিকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে নির্বাচনী প্রচারনায় মুরাদনগরের মহা সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামীলীগ কেন্দ্রিয় কমিটির সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনের দাবির প্রেক্ষিতে বলেছিলেন, বৃহত্তর কুমিল্লা জেলায় যদি কোন কলেজ সরকারিকরন করা হয়, তাহলে শ্রীকাইল কলেজটিকেই প্রথমে সরকারিকরন করা হবে। পরে ২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে কুমিল্লা-৩ মুরাদনগর আসনের এমপি কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ প্রধানমন্ত্রীর নিকট প্রশ্নোত্তর পর্বে শ্রীকাইল কলেজকে ‘সরকারি কৃষি কলেজ’ করার জোর দাবি রাখেন। ওই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, এ দাবি বাস্তবায়ন করতে হলে আপনি শিক্ষামন্ত্রীকে শ্রীকাইল কলেজে দাওয়াত করেন। যা পরর্তীতে এমপির পক্ষে আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কলেজ গর্ভনিং বডির সভাপতি কুমিল্লা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. সাঈদ মাহবুব খান কলেজটিকে সরকারিকরনের চেষ্টা চালানোর জন্য কলেজের অধ্যক্ষকে একটি কমিটি করার অনুরোধ জানান। এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ গৌরাঙ্গ পোদ্দার জানান, পূর্বে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেও অজ্ঞাত কারনে তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে এবার আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট কলেজকে সরকারিকরনের জন্য জোর দাবি তুলব, আশা করি এবার সরকারিকরন হয়ে যাবে। কলেজ ব্যবস্থাপনা কমিটির বিদ্যুৎসাহী সদস্য ড.আহসানুল আলম কিশোর সরকার জানান, এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় দপ্তরে যোগাযোগ করার জন্য অধ্যাপক লুৎফর রহমানকে আহবায়ক করে ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কলেজের উপাধ্যক্ষ মিয়া গোলাম সারোয়ার জানান, কলেজ প্রতিষ্ঠাতা ক্যাপ্টেন নরেন্দ্র নাথ দত্তসহ ওই অঞ্চলের একাধিক হিন্দু পরিবার কলেজের নামে অনেক সম্পত্তি ডিট করে দিয়েছেন। কিন্তু সময়মতো দলিলপত্র উপস্থাপন করতে না পারায় এখন সকল সম্পত্তি সরকারি খাস জায়গায় পরিনত হয়েছে। এতোদিন কলেজের সকল সম্পদ সরকারের কাছ থেকে কলেজ ও বিভিন্ন বহিরাগত ব্যাক্তি লিজ নিয়ে ব্যবহার করছে। এসকল সম্পত্তির দলিল মূলে বর্তমানে কলেজ দাবিদার হয়ে গত বছরের ৩০ আগষ্ট কলেজের নামে ১০ একর ৮৪ শতাংশ সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসককে বিবাদী করে কুমিল্লার বিশেষ আদালতে হিন্দু সম্পত্তি প্রত্যাবর্তন আইনে একটি মামলা রজু করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে আওয়ামীলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন বলেন, কলেজটিকে সরকারি করনের জন্য আগেও প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছি। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী ২০ এপ্রিল (শনিবার) আবার শ্রীকাইল আসছেন, আমাদের বিশ্বাস এদিন তিনি এ কলেজটিকে সরকারিকরনের ঘোষনা দিয়ে যাবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০ এপ্রিল মুরাদনগরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মুরাদনগরসহ কুমিল্লায় এটাই তাঁর প্রথম সফর। উদ্বোধন করবেন শ্রীকাইল কলেজের পাশে মুরাদনগরে অবস্থিত দেশের ২৫তম শ্রীকাইল মুকলিশপুরের গ্যাস ফিল্ডসহ ৮৩৫ কোটি ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকার ২১টি উন্নয়ন প্রকল্পের। জনসভায় ভাষন দেবেন শ্রীকাইল খেলার মাঠ ও কুমিল্লা মহানগরের টাউন হল মাঠে। প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১ মো.জাহাঙ্গীর আলমের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ওই তথ্য জানানো হয়।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply