সামাজিক বৈষম্য ও কাজের মানুষের উপর নির্যাতন —মো. আলী আশরাফ খান

মানুষ মাত্রই সৃষ্টিশীলতার অধিকারী। অনুপম সব সৃষ্টির মধ্যদিয়ে মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে মানুষকে নান্দনিকতার উৎকর্ষ সাধন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। জন্মের পর থেকেই প্রত্যেক মানুষ একে অপরের সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সৌহার্দতা সর্বোপরি মৌলিক চাহিদা ও ভালোবাসার মধ্যদিয়ে বড় হতে হয়। কিন্তু যখন সমাজে কেউ কম, কেউ বেশি এসব মানবিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধাসমূহ ভোগ করে, তখনই বৈষম্য সৃষ্টি হয়, মানুষ ডাকাতি-চুরি, সন্ত্রাসীসহ নানান অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। তখন সমাজে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে অপরাধ প্রবণতা। কারণ, একজন মানুষ যখন দেখে, তার সমুক্ষে একদল মানুষ দুর্নীতির মধ্যদিয়ে যারপরনাই বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, তখন সেও মরিয়া হয়ে ওঠে, কি করে দুর্নীতিবাজদের সমকক্ষ হওয়া যায়। আর এভাবেই দিনে দিনে সামাজিক সমস্যাগুলো বাড়তে থাকে, প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের সফলতা ও ব্যর্থতার বিষয়টিও; মনুষ্যত্বের কথাটিও ওঠে আসে তখন। এ প্রসঙ্গে হয়তো কেউ কেউ বলবেন, আমাদের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত সমস্যা. ভ্রান্তধারার রাজনীতির চর্চা, প্রকৃত শিক্ষার অভাব, বিপুল অদক্ষ জনসংখ্যা, আর্থিক অসচ্চলতা ইত্যাদিই সমস্যার সৃষ্টি করছে।
হ্যাঁ, উপরোল্লে¬খিত কথাগুলো অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এর সঙ্গে আমি আরো একটু যোগ করে বলবো যে, বৃটিশ উপনিবেশিকতার পরে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে, অনেক রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে যেহেতু আমরা বাঙালি হিসেবে বিশ্বমাঝে ধীরে ধীরে ভালো অবস্থানে পৌঁছতে শুরু করেছি, সেহেতু ধনী-গরীবের বৈষম্য আর দৈন্যতাকে আমাদের মধ্যে থেকে চিরতরে মাটিচাপা দেওয়া উচিৎ। আমাদের সমাজ থেকে বিদূরিত করা উচিৎ, হিংসা-অহংকার, হানাহানি, অপরাজনীতি ও সামাজিক ব্যবধানসহ সকল অবক্ষয়সমূহের কালো ছায়াকে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, সমাজে কেউ জন্মাবে বিলাসবহুল অট্রালিকায় আর কেউ জন্মাবে নোংরা বস্তির অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে; কেউ খাবে সোনাগাঁও-শেরাটন-এ, আবার কেউ না খেয়ে পড়ে থাকবে রাস্তার পার্শ্বে-এটা হতে পারে না। এর ধারাবাহিকতা চলতে দিলে একই সমাজে ক্্রমেই দুই ধারার মানুষ দুই পথে ধাবিত হয়ে বিরাট সমস্যার সৃষ্টি করবে। সমাজে তিন শ্রেণীর মানুষ থাকবে, এটা কি চিরাচরিত নিয়ম? নিম্নবিত্ত হবে সিংহভাগ মানুষ আর মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তরা দাবড়ে বেড়াবে সর্বত্র; যুগ-শতাব্দী ধরে নিষ্পেষিত নিপীড়িত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, দলিত-মথিত ও নির্যাতনের শিকার হবে নিম্নবিত্তরা উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের দ্বারা, তা কি করে হয়? এর কি একটা বিহিত হওয়া উচিৎ নয়?
আজ তেতো হলেও বলতে দ্বিধা নেই যে, এখন সমাজ এমন এক অবস্থায় উপনিত হয়েছে, তেলের মাথায় তেল দেয়া যেনো রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যাদের আছে ভূরি ভূরি, তাদেরকেই কেবল তেল দিতে চায় উচ্চবিত্তরা। নিন্মবিত্তদের কথা খুব কম লোকই চিন্তা করে, তাদের ব্যথা কেউ বুঝতে চেষ্টা করে না। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিদিন-প্রতিক্ষণ কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হয়-উচ্চ-মধ্যবিত্তদের দ্বারা নিন্মবিত্তরা। সমাজের নামধারী তথাকথিত শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত দুর্নীতিবাজরা অবৈধ ও অনৈতিক পন্থায় উপার্জিত কালো টাকার দেমাগে মানুষ হিসেবে গণ্য করতে চান না নিম্নবিত্তদের। এসব মুখোশপরা মানুষেরা একবারও ভেবে দেখেন না, তারা অর্থ-বিত্ত-যশ-খ্যাতি যাই চাক না কেনো, এসব মানুষের কাছ থেকেই অর্জন করতে হয়। আর তাওকিনা জোয়ার ভাটার ন্যায়, যা হঠাৎ বিলিন হয়ে যেতে পারে নদীগর্ভে কিংবা জলোচ্ছ্বাসে। তাদের কি চোখে পড়ে না, রাতে বন্ধ করে আসা বিশাল ফ্যাক্টরির ধ্বংস¯ূ‘পে পরিণত হওয়ার দৃশ্য; তারা কি খবর রাখে না, সুনামিতে লক্ষ লক্ষ তাজা প্রাণসহ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ভাসিয়ে নেওয়ার সংবাদ? তাদের কি বোধদয় হয় না, দৈনন্দিন বিশ্বে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিভীষিকাময় মারণাস্ত্রের মোহরায় ধ্বসংলীলার করুণ আর্তনাদ?
আমরা মানুষ যেহেতু সামাজিক জীব, সেহেতু নাগরিক জীবনে একে অপরের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। সেই সুবাদে জীবন জীবিকার প্রয়োজনে যার যার যোগ্যতানুযায়ী কাজ-কর্মকে বেছে নিয়ে জীবন চালাবে এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে আমরা কোনো ব্যক্তি বা কাজকে ছোট্ট করে দেখতে পারি না; পারি না ছোট-খাট কোন কাজকে তুচ্ছ-তাচ্ছ্বল্য কিংবা ঘৃণা করতে। আমাদের কে দিলো এমন অধিকার, ঘরে থাকা কাজের লোকের প্রতি অবিচার করার? এবং সমাজে যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আমাদের জীবনযাত্রাকে আরো আধুনিক থেকে আধুনিকতর করে তুলছে, তাদের নগন্য ভাবার? আমরা কি ভেবে দেখিছি, আমাদের ঘরে থাকা কাজের লোকটির প্রতি কতটুকু ন্যায়সঙ্গত আচরণ আমরা করছি? নামমাত্র মজুরিতে আমরা তাদের দিনমান হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর কি খাওয়াচ্ছি? এ সমাজের অধিকাংশ পরিবারেরই কাজের লোকদের খেতে দেয় উচ্ছিষ্ট। পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও পুরানো কিংবা স্বল্পমূলে ক্রয়কৃত বস্ত্রই তাদের ভাগ্যে জুটে। এর উপর আছে অমানবিক শারীরিক-মানসিক নির্যাতন। উঠতে বসতে গালিগালাজ, চড়-থাপ্পরসহ নানা মধ্যযুগীয় কায়দায় চলে বর্বরতা। বাড়ির কাজের লোক হওয়ায় বরাবরই তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছল্য করে নাম বিগড়িয়ে ডাকা হয় অন্য নামে। যেনো বাড়ির লোক হওয়ায় তাদের কোনো নাম থাকতে নেই। মহিলা হলে বুয়া, আর পুরুষ হলে আব্দুল বা অন্যান্য নামে ডাকা হয় তাদের; পরিবারের ছোট বড় সকলেই তুই-তুমি যা ইচ্ছে তাই সম্বোধন করে থাকে। ভাবসাবে এমন যেনো, ভালভাবে একটু ডাক পাওয়ারও অধিকার নেই তাদের। যতদিন যাচ্ছে ততই এসকল ঘৃণিত কর্ম মানুষ সাধারণ বিষয় হিসেবে মেনে নিচ্ছে। কিন্তু কাজের মানুষের ওপর এহেন কার্যকলাপ আইনের পরিপন্থী নয় কি? অথচ সমাজের প্রায় সর্বত্রই এসব নির্যাতনের ঘটনা হরহামেশা ঘটছে। যার নামমাত্রই আমরা জানছি, পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের পিলে চমকানোর মত ঘটনা ঘটছে ও নির্যাতনের কিছু ছবি পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। যা দেখে তৎপর হতে দেখা যায় প্রশাসনসহ কিছু মানবাধীকার সংগঠনগুলোর। কিন্ত কাজের কাজ কতটা হয়, তা ভোক্তভোগীরাই জানেন। আর এসমস্ত বিভীষিকাময় ন্যক্কারজনক কাজ-কর্মে আমরা সজাগ দৃষ্টি দিই না, প্রতিকার চাই না যথাযথভাবে, সময়ও হয়না আমাদের। যে কারণে দিনে দিনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে মানুষ রূপী দানবেরা। সমাজের প্রায় সর্বত্রই গৃহকর্মীদের উপর সামান্য অপরাধে চলে নির্মম নির্যাতন। বিত্তশালীদের একটুও হাত কাঁপে না গরম রড-খুনতি-চামচ দিয়ে স্যাঁকা দিতে ছোট্ট শিশুদের কোমল শরীরে; সিগারেটের আগুনে ঝলসে দেয়াসহ গায়ে গরম পানি ঢেলে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না মানুষ নামের অমানুষেরা; হাতুড়ি-বেলানি দিয়ে পিটিয়ে থেঁতলানো হয় কাজের লোকদের। এরই একপর্যায়ে কখনো কখনো ঘটে যায় নির্মম হত্যাকা-ে। আর তখনই আমরা ব্যথিত হই; দুই চার লাইন লিখি পত্রিকায়; দায় থেকে মুক্ত হতে প্রশাসনসহ দৌড় ঝাপঁ শুরু হয় অনেকের; বিভিন্ন মহল বা সংগঠন থেকে দেওয়া হয় বড় বড় বক্তৃতা-বিবৃতি। ব্যাস! এই টুকুই আমাদেরকে আন্দোলিত করে, ভাবিয়ে তুলে স্বল্প সময়ের জন্য। কিন্তু কাজের মানুষদের মানুষ হিসেবে মর্যাদা এবং তাদের যথাযথ প্রাপ্যতায় কোনোরকম কাজের কাজে কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা যায় না। কাজের মানুষগুলোও দরিদ্র অসহায় হওয়ায় তারা বিচারের দোরগোড়ায় পৌঁছতে পারে না। তাছাড়া টাকা বা ক্ষমতার দাপটে মনিবরা সকল অন্যায় ও অপরাধকে ন্যায় বলে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন এবং কোনো কোনো সময় আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়ালেও তারা সাজা থেকে সহসাই পার পেয়ে যায়।
আমাদের বুঝতে হবে, গৃহে যারা কাজ করে তারাও শ্রমিক। সমাজের আর দশটা মানুষের চেয়ে তাদেরও মূল্য কোনো অংশে কম নয়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় তাদের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সম্মানের বিষয়টিও স্বীকৃত। অথচ, আমরা তাদেরকে গৃহভৃত্য ও কৃতদাস বলেই মনে করি। তাদের কাজের নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। নিয়মিত বেতন নেই, চিকিৎসা নেই, নেই মানসম্মত বাসস্থান ও খাবারদাবার। তাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাসা বেঁধে আছে দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, তিরস্কারসহ অস্বাভাবিকতা। অথচ, তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের চাইতেও অধিক মূল্যবান, অধিক সম্মান প্রাপ্য-এটি মানতে আমাদের বড্ড কষ্ট হয়। আমরা বুঝতে চেষ্টা করিনা, তারা যা পারে তা আমরা পারি না; তারা যে সকল কাজ-কর্ম করে, আমাদের দ্বারা তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তেমনি করে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের অধিনস্ত যারা আছে, তাদের মূল্য অনেকগুণে আমাদের চেয়ে বেশি-এটা বুঝতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এ ক্ষেত্রে তাদের উপর আমরা নির্ভরশীল, তারা আমাদের চেয়ে অনেক অনেক দামি। আমাদের ভাবতে হবে, তারাও মানুষ, তাদেরও আমাদের মত সাধ-আহ্লাদ রয়েছে। আমরা যদি তাদের সম্মান করি; তাদের যথাযথ প্রাপ্যতা প্রদান করি; সর্বোপরি সু-নজরে দেখি, তাহলে তারা খুশী হবে এবং স্বতঃস্ফুর্তভাবে সকল কাজ সম্পাদন করার পাশাপাশি সুস্থ ও সুন্দর জীবন যাপনের নিশ্চয়তা পাবে। আর এ সকল কাজ সর্বপ্রথমে ব্যক্তি জীবন থেকেই শুরু করতে হবে। পরে পরিবার-পরিজন, সমাজ ও রাষ্ট্রিয়ভাবে ছড়িয়ে দিতে অনবদ্য প্রয়াস চালাতে হবে। অবশ্য ও ব্যাপারে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব কম নয়। রাষ্ট্রেকেও এগিয়ে আসতে হবে সুষ্ঠুনীতি মালা প্রণয়ণ ও যথাযথ বাস্তবায়নে। যাতে করে চলমান সামাজিক বৈষম্য ও কাজের মানুষদের প্রতি সু-দৃষ্টির চর্চায় আমরা অভ্যস্থ হতে পারি, ভূমিকা রাখতে পারি-একটি সুস্থ-সুন্দর উন্নত সমাজ গঠনে।

লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর,দাউদকান্দি,কুমিল্লা।
মুঠোফোন-০১৮১৬২৫৯৫৩২

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply