নাচ গান কেন্দ্র করে দেবিদ্বারে মূর্তি ভাংচুর : সাম্প্রদায়িক হামলা হিসেবে প্রচার করে স্থানীয় আ’লীগ : মামলার বাদী-বিবাদী উভয় কিশোর

মোঃ আবু বকর সিদ্দিক, দেবিদ্বার থেকেঃ—
ঘটনাটি ছিল খুবই সাধারণ। সরস্বতী পূজা উত্সবে নাচতে চেয়েছিল কয়েকজন কিশোর। কিন্তু তাতে বাধা দেয়ায় তারা ক্ষোভে-অভিমানে গোপনে একটি মূর্তি ভাংচুর করে। আর যায় কোথায়! মওকা পেয়ে যায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা একে সাম্প্রদায়িক হামলা হিসেবে প্রচার শুরু করে। তাদের প্রচারণায় সুর মেলায় আওয়ামীপন্থী কয়েকটি গণমাধ্যমও। গ্রেফতার করা হয় ৬ কিশোরকে, যারা এবার এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী। অথচ কথিত ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ৬ কিশোর দেড় মাস ধরে জেলহাজতে রয়েছে।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার বেগমাবাদ গ্রামের রাতুল চক্রবর্তীর বাড়ির উঠানে আয়োজিত সরস্বতী পূজাকে ঘিরে ঘটে এ ঘটনা।
এ ঘটনাটিকে নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা ভয়ঙ্কর রাজনীতির খেলায় মেতে ওঠে। নিতান্ত একটি সাধারণ ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে শুধু বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের সন্তানদেরই গ্রেফতার করা হয়নি, প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের এক নেতাকেও ঘায়েল করা হয়েছে।
কয়েক দিন ধরে দেবিদ্বার এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে স্থানীয় থানা পুলিশ, মামলার বাদী রাতুল ও তার পরিবার, অস্থায়ী সরস্বতী পূজা মণ্ডপ এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
অথচ মূর্তি ভাংচুর ঘটনার ব্যাপারে স্থানীয় দেবিদ্বার থানা পুলিশ বলছে, এটি কোনো সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক দলের সহিংসতা নয়। সরস্বতী পূজায় নাচ-গান হয় না। কিন্তু এসব ছেলে নাচ-গান করতে চেয়েছিল। আর তাতে বাধা দেয়ায় মূর্তি ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। মামলার বাদী এইচএসসি পরীক্ষার্থী রাতুল চক্রবর্তী বলে, ‘বাদী কী, তার কাজটা কী, তা-ই আমি জানি না। স্থানীয় মুরব্বি আওয়ামী লীগ নেতা এবং পূজা কমিটির দাদারা আমাকে যা লিখতে বলেছেন, আমি লিখেছি।’
নীতিবিবর্জিত ওই আওয়ামী নেতারা এখন গ্রেফতারকৃত কিশোরদের প্রত্যেকের পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে জামিনের জন্য আদালতে আপসনামা দিয়েছেন। কিন্তু মামলার এজাহারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিযোগ থাকায় কুমিল্লা জেলা জজ আদালত জামিন দিচ্ছে না বলে জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দাঙ্গায় উসকানিদাতা এবং শিশু-কিশোর নিয়ে ভয়ঙ্কর খেলার মূল হোতা স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি তপন সাহা।
যে কারণে মূর্তি ভাংচুরের ঘটনা : সরেজমিন ঘুরে স্থানীয় এলাকাবাসী, মামলার বাদী রাতুল চক্রবর্তী এবং থানা পুলিশের কাছ থেকে জানা গেছে, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে দেবিদ্বার উপজেলার বেগমাবাদ গ্রামের রতন চক্রবর্তীর ছেলে রাতুল চক্রবর্তী তার বাড়ির উঠানে অস্থায়ী সরস্বতী পূজার আয়োজন করে। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন কিশোর নাচ-গান করতে চায় (তাদের মধ্যে ২ জন জেলহাজতে)। কিন্তু সরস্বতী পূজায় নাচের কোনো নিয়ম নেই। তাই তাদের নাচতে দেয়া না হলে ঝগড়া বাধে এবং চলে যায়। রাতুল কিছুক্ষণ পর বাড়ির বাইরে চলে যায়। রাত ১০টার দিকে ফিরে এলে দেখে উঠানে সরস্বতীর মূর্তি নেই। বাড়ির লোকজন নিয়ে খোঁজ করার পর বাড়ির পাশে ভাংচুর করা মূর্তিটি পাওয়া যায়। তাই মূর্তি ভাংচুরের ঘটনা এলাকায় জানাজানি হলে ঘটনাস্থলে বহু লোক জড়ো হয়। এসময় স্থানীয় আ.লীগ নেতা ও পূজা কমিটির লোকজন সন্দেহভাজন হিসেবে গঙ্গারামপুর গ্রামের আবদুল ওহাবের ছেলে মনিরুল ইসলামকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। আওয়ামী লীগ নেতাদের চাপে ওই রাতেই অভিযান চালিয়ে পুলিশ হোসেনপুর গ্রামের বসু গাজীর ছেলে বাবু, সাত্তার খন্দকারের ছেলে এইচএসসি পরীক্ষার্থী সাদেক, মান্নান সরকারের ছেলে মামুন, বাজেবাখর গ্রামের শরাফত আলীর ছেলে সুমন এবং ইউসুফ মিয়ার ছেলে রুবেলকে আটক করে। ছয়জন আটক হওয়ার পর ওই রাতে ইউনিয়ন আ.লীগ সাধারণ সম্পাদক সোহরার হোসেন, ইউনিয়ন কাউন্সিলর পূজা কমিটির সভাপতি তপন সাহা রাতুলকে মামলা করতে বাধ্য করে। মামলা নং ৩৬/২০১৩। পরদিন পুলিশ আটক হওয়া কিশোরদের জেলহাজতে পাঠিয়ে দেয়।
গ্রেফতার করা কিশোর সাদেকের বাবা সাত্তার খন্দকার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর। সাত্তার খন্দকার আমার দেশকে বলেন, ‘আমার ছেলে মূর্তি ভাংচুর করেনি। এছাড়া গ্রেফতার করা অন্য কিশোররা ষড়যন্ত্রের শিকার। আটক কিশোর সুমনের সঙ্গে তপন সাহার মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি তপন সাহা জানার পর ক্ষুব্ধ হয়ে সুমনের বন্ধুসহ আমার ছেলেকে মূর্তি ভাঙার অভিযোগে পুলিশে ধরিয়ে দেয়।’
তিনি জানান, গ্রেফতার করা কিশোর মনির ব্যতীত বাকি পাঁচজনকে জামিনে আনতে বাদীপক্ষ এবং পূজা কমিটির পক্ষ থেকে আলাদা আলাদা এফিডেভিট জমা দেয়া হয়েছে। কিন্তু আদালত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিযোগ থাকায় জামিন দেয়নি। এদিকে মনিরুলের পরিবার জানায়, তারা বিরোধী দল করায় তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আটক রাখা হয়েছে
স্থানীয়রা এবং গ্রেফতার করা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা জানান, সোহরাব এবং তপন সাহা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে তাদের ছেলেদের জেলহাজত থেকে ছাড়িয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। তাই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পূজা কমিটি এবং বাদী রাতুল জেলা জজ আদালতে হলফনামা দিয়েছে। ওই হলফনামায় বলা হয়েছে, ‘বাদী-বিবাদীগণের মধ্যে সকল বিরোধ স্থানীয় গণ্যমান্যরা এবং বিবাদীগণের আত্মীয়স্বজনরা নিষ্পত্তি করে দিয়েছে। বিবাদীগণকে জামিনে মুক্তি দিতে বাদীর কোনো আপত্তি নাই।’ আপসনামা দেয়ার পরও আদালত জামিন না দিয়ে পূজা কমিটিকে এবং বাদী রাতুল চক্রবর্তীকে তলব করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মামলার বাদী রাতুল ও তার পরিবারের কথা : বাদী রাতুল চক্রবর্তী এবার দেবীদ্বার এসএ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার কথা। মামলা করার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে রাতুল বলে, ‘গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে কে বা কারা আমাদের বাড়ির উঠানে অস্থায়ী সরস্বতী পূজার মূর্তি ভাংচুর করে। মূর্তি ভাংচুরের ঘটনা এলাকায় জানাজানি হলে বহু লোক আমাদের বাড়িতে জড়ো হয়। এসময় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা এবং পূজা কমিটির লোকজন সন্দেহভাজন মনিরুলকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। আওয়ামী লীগ নেতা ও পূজা কমিটির সভাপতি তপন সাহা আমাকে থানায় নিয়ে যান এবং মূর্তি ভাংচুরের ঘটনার মামলার বাদী হতে বলেন। তখন আমি মামলার বাদী হতে অপারগতা প্রকাশ করি; কারণ মামলার বাদী কি, তার কাজ কি—তাও আমি বুঝি না। আমি আওয়ামী লীগ নেতা ও পূজা কমিটির লোকজনের চাপের মুখে মামলার বাদী হতে বাধ্য হই।’
রাতুল বলে, ‘আমি এইচএসসি পরীক্ষার্থী। মামলার পর থেকে এ পর্যন্ত ৪ বার আদালতে যেতে হয়েছে। এতে করে আমার লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটছে। তাছাড়া আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আদালতে দৌড়-ঝাঁপ করতে। এগুলো আমি চাই না। এগুলো রাজনৈতিক সহিংসতা নয়।’
তবে যেদিন মূর্তি ভাংচুর করা হয়েছে, সেদিন সরস্বতী পূজায় নাচতে দেয়ায় গ্রেফতার করা কয়েক কিশোর হুমকি দিয়েছিল বলেও জানায় রাতুল চক্রবর্তী।
রাতুলের আদালতে যাওয়ার ব্যাপারে অনীহা এবং মামলার ব্যাপারে কোনো ধারণা বা জ্ঞান না থাকার পরও তাকে কেন বাদী করা হলো জানতে চাইলে রাতুলের বাবা রতন চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এসব ব্যাপার আমি বুঝি না। এগুলো স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাব এবং তপনরা ভালো বলতে পারবেন। আপনারা তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করেন।’
আ.লীগ নেতা ও পুলিশের বক্তব্য : স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাব হোসেন বলেন, ‘মূর্তি ভাংচুর এবং ওই ঘটনায় কয়েকজন কিশোর আটকের খবর পেয়ে আমি ওসিকে বলি যে, কাউকে যেন ছেড়ে না দেয়। সন্দেহজনক ৬ কিশোর আটক হওয়ার পর রাতুলকে মামলার বাদী হতে বাধ্য করি। আটক হওয়া এক কিশোর তপন সাহার মেয়েকে বিরক্ত করত। বর্তমানে বাদী-বিবাদী সমঝোতা করতে চাচ্ছে, সমঝোতা হয়ে গেলে আমার কোনো আপত্তি নাই।’
কিন্তু ওই ঘটনা কেন তারা সাম্প্রদায়িক হিসেবে প্রচার এবং মামলার এজাহারে বর্ণনা করেছে জানতে চাইলে কোনো জবাব দেননি আওয়ামী লীগের এই নেতা।
অপর আওয়ামী লীগ নেতা ও পূজা কমিটির সভাপতি তপন সাহা বলেন, ‘বাদী-বিবাদী উভয়ের স্বার্থে মীমাংসার লক্ষ্যে বাদীপক্ষ এবং পূজা কমিটির পক্ষ থেকে আদালতে আলাদা আলাদা এফিডেভিট দিয়েছি। আদালত আটকদের জামিন না দিয়ে আমাদের (পূজা কমিটির) লোকজনকে আদালতে হাজির হতে বলে।’
কিন্তু এসব ঘটনায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উল্লেখ করে তার বিবৃতি দেয়ার ব্যাপারে এবং মামলার বর্ণনায় কেন সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কথা বলা হয়েছে—সে ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘আটকদের মধ্যে একজন তো জামায়াত কর্মী রয়েছেই। সুতরাং এটা তারও একটা অংশ।’
এ ব্যাপারে দেবিদ্বার থানার ওসি এসএম বদিউজ্জামান জানান, এটি কোনো সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক সহিংসতা নয়। ঘটনাটি ঘটেছে সরস্বতী পূজার নাচ-গানকে কেন্দ্র করে। মূর্তি ভাংচুরের সংবাদ পেয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে সন্দেহভাজন ৬ কিশোরকে আটক করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। বাদী-বিবাদীপক্ষ মীমাংসার লক্ষ্যে আদালতে এফিডেভিট দিয়েছে কিন্তু আদালত আটক কিশোরদের জামিন দেয়নি। এ ধরনের ঘটনা জেনেও কেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উল্লেখ করে মামলা নিয়েছে পুলিশ—জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা আমার দেশকে বলেন, মামলার বাদী যেভাবে অভিযোগ করবে, আমরা সেভাবেই অভিযোগ নিতে বাধ্য।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...