মহান স্বাধীনতা দিবস ও আমাদের অঙ্গীকার—-মো. আলী আশরাফ খান

Ali ashraf khan,Daudkandi
আমাদের এ মহান স্বাধীনতা এমনি এমনিই অর্জন হয়নি। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আর রক্তবন্যার মধ্যদিয়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এ মহামূল্যবান স্বাধীনতা। বিশ্ববাসী জানে, বাঙালিরা বরাবরই স্বাধীনপ্রিয় এক সাহসী জাতি। পরাধীনতা বাঙালিরা কখনই মেনে নেয়নি, মেনে নিতে পারে না। নিজেদের অস্তীত্ব রক্ষায় আমরা বাঙালিরা সব সময় ঐক্যবদ্ধ। বাঙালি জাতির স্বাধীনতার মূল-গণতন্ত্রের প্রতি অকুন্ঠ শ্রদ্ধাবোধ এবং সর্বঐক্যের সেতুবন্ধন। আমাদের এই সত্য-সুন্দরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং ঐক্য বিশ্বমাঝে অপরূপ এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মা-মাটি-মাতৃভাষা সর্বোপরি দেশপ্রেম আমাদের রক্তেমাংসে মিশে গেছে। আমরা এক ব্যতিক্রমী তেজদীপ্ততায় প্রমাণ করেছি, আমরা আজন্মই বাঙালি, আমরা সবাই ভাই ভাই, আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। পৃথিবীর অন্যসব জাতি থেকে আমরা ভিন্ন রকম গর্বীত এক জাতি। আমরা সাহসী, আমরা নতুন ইতিহাসের সৃষ্টি করতে জানি এটাই প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। সেইদিন বিশ্ববাসীকে অবাক করে বাঙালি জাতি নিজস্ব সত্তার জন্যই অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। হাজারো বাধা-বিপত্তির কাছেও মাথা নোয়ায়নি এ বীরের জাতি। প্রমাণ করেছে, যখন যেখানে এ জাতির আত্মপরিচয়ের উপর কেউ আঘাত করে-নাক গলাতে চায়, তখনি এর দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয় এ বীরের জাতি-বাঙালি জাতি।
সেই প্রাচীন আমল থেকে সুলতানী আমল, মুঘল আমল, ব্রিটিশ আমল, পাকিস্থানী আমল সব আমলেই বাঙলাকে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল রাখতে বাঙালিরা বীরদর্পে এগিয়ে চলেছে যুগ-শতাব্দী ধরে। সুলতানী আমল থেকে গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের উচ্ছেদ পর্যন্ত এ দুইশ’ বছর বাংলাদেশ অবিচ্ছিন্নভাবে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণের পর মুঘল আমলে তা বন্ধ হলেও বার ভূঁইয়াদের স্বাধীন অস্তিত্বই প্রমাণ করে বাংলার মাটিতে স্বাধীনতার শিকড় সুগভীর ব্যাপ্তি ও প্রোথিত হয়েছিল বহু পূর্বেই। ব্রিটিশ আমলে বাঙালির বীরত্বপূর্ণ সুদীর্ঘ সংগ্রাম এই উপমহাদেশের মাটিতে জন্ম দেয় ব্রিটিশ আধিপত্যের মূলোচ্ছেদের। আর এর সূত্রধরেই জন্ম হয়েছিল পৃথক দু’টি দেশ ভারত ও পাকিস্থান। তখন আজকের বাংলাদেশ পরিচিতি পায় ‘পূর্বপাকিস্থান’ নামে। কিছু সংখ্যক বাঙালি ‘দ্বি-জাতিতত্ত্ব’ অবৈজ্ঞানিক চিন্তায় পর্যবসিত হয়ে ঠেলে দেয় এ জাতিকে অমানিশার অন্ধকারে। অবশ্য যা অল্প সময় পরেই বাংলা ভাষার ওপরে আঘাতের মধ্যদিয়ে বুঝতে পারে মস্তবড় এ ভুলের। ঐতিহ্যপুষ্ট বাঙালি স্বভাবসিদ্ধ সাহসিকতায় জয় ছিনিয়ে আনে অবিনশ্বর অধ্যায় ১৯৫২-এর মহান ২১ ফেব্রুযারি। পরে ১৯৫৪, ১৯৫৮ ও পেরিয়ে যায় ১৯৬২। আমরা শান্তিপ্রিয় হলেও জিন্নাহ সাহেব গংদের ছলচাতুরি আর গোঁজামিল আমাদেরকে ঠেলে দেয় অনিবার্য এক গণ-সংগ্রামের দিকে।
১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে লাহোরে বঙ্গবন্ধু বাঙালির সনদ ছয় দফার ঘোষণা দেন এবং সেই বছরের ৭ জুন এই ছয় দফা আদায়ের দাবিতে পূর্ব পাকিস্থানে সর্বাত্মক হরতাল পালন করেন। পাকিস্থানের শাসকগোষ্ঠী তা না মেনে নিয়ে চরম বিরোধীতা শুরু করে। বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার জনগণকে ছয় দফা সম্পর্কে অবহিত করার জন্য সারাদেশ ছুটে বেড়ান, তাঁকে কয়েক ডজন ফৌজদারি মামলাও খেতে হয়েছিল ওইসময়। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, পাকিস্থানের সার্বভৌম ও অখ-তার বিরুদ্ধে জনগণকে উস্কে দিচ্ছেন বলে। কিন্তু এর তথ্য প্রমাণ না থাকায় বিচারক বঙ্গবন্ধুকে খালাস দিতে বাধ্য হয়েছিলেন বিচারকরা। বাঙালিরা অনেক ভালোবাসতেন শেখ মুজিবকে। তারচেয়েও বড়কথা, এই মহান আন্দোলনের প্রচার চালাতে গিয়ে শেখ মুজিব কোনো অপ্রীতিকর-ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে লিপ্ত হননি। তারপরেও ব্যক্তি বিশেষরা অভিযোগ কম করেননি বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে। কিন্তু কোন কিছুই দমাতে পারেনি দেশপ্রেমিক শেখ মুজিবকে।
ছয় দফা আন্দোলনকে দমন না করতে পেরে শেখ মুজিবসহ কয়েকজন সিএসপি অফিসার ও সশস্ত্র বাহিনীর কিছু অফিসার এবং সদস্যদের বিরুদ্ধে উল্টো আগরতলা ষড়যন্ত্রের অজুহাতে মামলা করা হয় এবং কারারুদ্ধ করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। যার ফলে রাজনীতির মাঠ আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং ইতিহাসের ধারায় একের পর এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, আইয়ুব খানের পতন, সত্তরের নির্বাচন, আওয়ামী লীগের বিজয়, নির্বাচনোত্তর প্রহসন এবং সবশেষে বাঙালিদের ওপর শাসক-বাহিনীর পৈশাচিক আক্রমণই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। ’৭১-এর ২৩ মার্চ গফরগাঁওয়ে সমাবেশে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং পাকিস্থানী বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গণসংগ্রামের ডাকের মধ্যদিয়ে নতুন এক ইতিহাসের সৃষ্টি হয়।
কিন্তু অত্যন্ত দু:খের বিষয়, ওইসময় পাকিস্থানী হায়েনাদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে কিছু বাঙালি-বিশ্বাসঘাতক যোগ দেয় অমানবিক এক বর্বর-পৈশাচিকতায়। কালো এক অধ্যায়ের জন্ম দেয় স্বাধীনতাবিরোধী একদল মানুষ। তারা বাঙালি জাতিকে করে কলঙ্কিত। তারপরেও সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় এক নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার বিজয় ছিনিয়ে আনে বাংলার জনগণ। ত্রিশ লক্ষ সহজ-সরল বাঙালির প্রাণ ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা অর্জন করি এ মহান স্বাধীনতা। লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে আমরা গাই জয় বাংলা বাংলার জয়। এরপর দেশ এক কঠিন সময়কে পার করে সামনের দিকে এগুচ্ছিল। আমরা ধীরে ধীরে আলোয় ফিরলেও সময়ে সময়ে আমাদের অপরাজনীতি ও ভ্রান্তরাজনীতি চর্চার দাবানলে পুড়ছে এ দেশের মানুষ। সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রাকে পদদলিত করে এদেশের রাজনৈতিকরা নিজেদের স্বার্থকে চরিতার্থ করে চলছে। ক্ষমতার লোভে হত্যাযজ্ঞসহ হেনহীন কাজ নেই যা তারা করেননি এবং করছেন না এ দেশে।
এদেশের চলমান অপধারার রাজনৈতিক কারণে বর্তমানেও এমন এক নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, যা বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত ভয়াল ও বিপদজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকল রাজনৈতিক দলই অসহিষ্ণু হয়ে ওঠেছে। সরকার চাচ্ছে যে কোন কিছুর বিনিময়ে হোক নিজেদের পুরানো এবং নতুন নতুন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে। এর জন্য যে কোন মূল্য দিতে হয় জনগণ দেবে কিন্তু তাদের লক্ষ পূরণ হতেই হবে। আর বিরোধীদলগুলোও যেনতেনভাবে সাধারণ জনগণের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে হরতালের নামে নানা রকম ভয়াবহ কর্মসূচি। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়তই তাদের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে। এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে সাধারণ মানুষের। এদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বোঝা উচিৎ, জনগণের শক্তিই বড় শক্তি। জনগণ চেয়েছে বলেই তারা ক্ষমতায় গিয়েছেন, গিয়েছিলেন। আবার যখন জনগণ চাইবে না তখন তাদের মধ্যে হয়তো আর কেউই ক্ষমতায় আসতে পারবেন না।
তাদের প্রতি আমাদের বিশেষ অনুরোধ, এখনও সময় আছে দেশের স্বার্থে জনগণের স্বার্থে সকলে একই টেবিলে বসে আলোচনা করুন। আমরাই বড়! আমাদের কথাই থাকতে হবে! এসব ভ্রান্ত চিন্তা বাদ দিয়ে দেশের সামগ্রীক কল্যাণে এগিয়ে আসুন। প্রয়োজনে সর্বদলীয় সরকার গঠনের চিন্তাও করা যেতে পারে। আমরা চাই, এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো সব ভেদাভেদ ভুলে একই পতাকা তলে সমবেত হোক। দেশ গড়ার কাজে সকলের অংশগ্রহণ হোক সমান সমান। আমাদের বিশ্বাস, দেশ বাঁচাতে ও জাতিকে বাঁচাতে এদেশের সকল রাজনৈতিক দলগুলো এক হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে আলোর পথ ধরে। আর অন্ধকার নয়, জাতি দেখতে চায় নতুন সূর্য উদয় হোক, দেশ গড়ার কাজে নেমে পড়–ক সকল ধর্ম-বর্ণ গোত্রের মানুষ। আবার নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি করুক বাঙালি জাতি। মহান স্বাধীনতা দিবসে এই হোক সকল রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার।

লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
ই-মেইল: khan-srisy@yahoo.com

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply