ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টর্ণেডোয় ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য ১০ লাখ টাকা-ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ-প্রত্যেক পরিবারকে ঘর বানিয়ে দেয়ার দাবী এরশাদের

আরিফুল ইসলাম সুমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধিঃ—
শুক্রবার বিকেলে ভয়াবহ টর্ণেডোর তান্ডবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিহতের সংখ্যা ২৪-এ উন্নীত হয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় পাঁচ শতাধিক। গতকাল রোববার দুপুরে জেলা সিভিল সার্জন ডা. শরফরাজ খান চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, ‘রোববার আহত আরো তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা উন্নীত হলো ২৪ জনে।’ শুক্রবার বিকেলে ভয়াবহ টর্ণেডোর তা-বে ওই দিনই ২০ জনের মৃত্যু হয়। শনিবার আহত আরেক শিশু মারা যায়। ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য ১০ লাখ টাকা ও ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ করেছে সরকার। এছাড়া জেলা প্রশাসনের কাছে থাকা ১০০ মেট্রিকটন চাল ও ১৮৫ বান্ডিল ঢেউটিন বিতরণেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শনিবার সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে এ তথ্য প্রকাশ করা হয় বলে জেলা প্রশাসক নূর মোহাম্মদ মজুমদার জানান। ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শনকালে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ সরকারের কাছে ক্ষতিগ্রস্থ প্রতিটি পরিবারকে দু’টি করে ঘর বানিয়ে দেয়ার দাবী জানান। এছাড়া আগামীকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শনের কথা রয়েছে।
ত্রাণ তৎপরতায় বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি জেলার অন্যান্য উপজেলার প্রকল্প কর্মকর্তাদেরকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায় ত্রাণ দেয়ার জন্য চারটি দল কাজ করছে। তারা ক্ষতিগ্রস্থ দেড় হাজার জনের তালিকা তৈরি করেছে বলে জানান জেলা প্রশাসক নূর মোহাম্মদ মজুমদার। তবে অনেক এলাকায় এখনো ত্রাণ পৌঁছেনি বলে অভিযোগ করছেন ক্ষতিগ্রস্থরা।টর্নেডোর পর পুলিশ, বিজিবি, সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ), ফায়ার সার্ভিস, গণপূর্ত বিভাগ ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সহায়তায় উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনা করা হয়। কুমিল্লা সেনানিবাসের দু’টি মেডিক্যাল টিম ঘটনাস্থলে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত করা হয়। এছাড়া রাস্তার উপর পড়ে থাকা গাছপালা সরিয়ে চলাচলের উপযোগী করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা কারাগারে ইতোমধ্যে টিনের পার্টিশন দেয়া, জেনারেটরের মাধ্যমে লাইটিং, বৈদ্যুতিক লাইন ও খুঁটি মেরামতের মাধ্যমে বিদ্যুৎ লাইন সচলের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
জেলার সদর, বিজয়নগর, আখাউড়া এই তিনটি উপজেলার প্রায় ২১টি গ্রাম টর্ণেডোর তান্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সর্বত্রই ধ্বংস ও ক্ষতের চিহ্ন। গ্রামগুলো হচ্ছে সদর উপজেলার রামরাইল, উরশিউড়া, জারুইলতলা, ভাতশালা, পাতৈরহাতা, পাইকপাড়া, চিনাইর, চান্দি, বাসুদেব, ফুলবাড়িয়া, চান্দপুর, কোড্ডা, বিজয়নগর উপজেলার সিঙ্গারবিল, পত্তন এবং আখাউড়া উপজেলার আমোদাবাদ। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যমতে টণের্ডোতে নিহতেরা হলেন জেলা কারাগার রক্ষী (নং ২২০০১) মাকসুদুল আলম (২৯), সুলতানপুর ইউনিয়নের উরশিউরা গ্রামের ডলি রানী দে (৩০), পাতৈরহাতা গ্রামের লাভলী বেগম (৩০), মাছিহাতা ইউনিয়নের চিনাইর গ্রামের ঝানু চৌধুরী (৬৫), আঙ্গুরা বেগম (৫৮), হুসনা বেগম (৬২) রোকেয়া বেগম (৫৫), আমেনা বেগম (৪২), শিশু মায়েশা (২ মাস), বাসুদেব ইউনিয়নের জারুইলতলা গ্রামের জয়নাল মিয়া (৩২) ও সুমি বেগম (১০), ভাতশালা গ্রামের আজমল মোল্লা (৩৬), মাহমুদুল হক (৪২), এমদাদুল মোল্লা (৩৯) কবীর হোসেন (৩৫), কোড্ডা গ্রামের রানা মিয়া (২২), চান্দি গ্রামের ফজলু মিয়া (৭০), তাজুল ইসলাম (৫০), দোবলা গ্রামের নাজমা বেগম (২৫), রামরাইল ইউনিয়নের মোহাম্মদপুরের আবু তাহের মিয়া (৬৫), নিলা আক্তার (১৬) ইয়াছমিন (৩২), বিজয়নগর উপজেলার পত্তন গ্রামের বাবলী বেগম (২১)। অন্যদিকে টর্ণেডোতে গুরুতর আহত শতাধিক লোককে ঢাকা, কুমিল্ল¬াসহ বিভিন্ন হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। এদিকে কুমিল্ল¬া সেনাবাহিনীর দুইটি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’র (বিজিবি) একটি, জেলা পুলিশের একটি, সিভিল সার্জনের দুইটিসহ মোট ছয়টি মেডিকেল টিম ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায় চিকিৎসা কাজে সহায়তা করছেন। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারদের মধ্যে সরকারিভাবে প্রত্যেক মৃত ব্যক্তিকে ২০ হাজার টাকা, আহতদের ৬ হাজার টাকা, দুই বান্ডিল টিন, ক্ষতিগ্রস্থ ৫০০ পরিবারের মধ্যে ৩০ কেজি করে চাউল দেয়া হয়েছে। তবে এই পরিমাণ নিতান্তই অপ্রতুল বলে জানান ক্ষতিগ্রস্থরা।
এদিকে রোববার বিকেলে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শনে আসেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ। চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক ও প্রেস সচিব সুনীল শুভ রায় সাংবাদিকদের জানান, এরশাদ ক্ষতিগ্রস্থ কোড্ডা ও চান্দি গ্রাম পরিদর্শনের পর বিকেল চারটায় তিনি আখাউড়া উপজেলার আজমপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শনকালে তিনি ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে শাড়ি, লুঙ্গি বিতরণ করেন। এসময় অন্যান্যের মধ্যে পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার এম.পি, কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা এম.পি, কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভুইয়াসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ সঙ্গে ছিলেন। সাবেক এই রাষ্ট্রপতি সরকারের কাছে ক্ষতিগ্রস্থ প্রতিটি পরিবারকে দু’টি করে ঘর বানিয়ে দেয়ার দাবী জানান। এছাড়া আগামীকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শনের কথা রয়েছে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply