আন্তর্জাতিক পানি দিবস —–মো. আলী আশরাফ খান

Ali ashraf khan
পানির অপর নাম জীবন। এটি আজ সর্বজনস্বীকৃত। কিন্তু বিশুদ্ধ পানি তো বটেই সাধারণ পানিরও যে আজ বিশ্বব্যাপী প্রকট সংকট দেখা দিয়েছে তা বোধ করি আরো বহু আগেই আমাদের চিন্তা করার দরকার ছিল। কিন্তু এই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে কেউ তেমন কোন চিন্তা করেনি এবং এর যথাযথ সমাধানে সঠিক উদ্যোগও নেয়নি। যদিও ১৯৯৩ সালে ৪৭তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি বছরের ২২ মার্চকে আন্তর্জাতিক পানি দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান তো হয়ইনি বরং এ সমস্যা দিনে দিনে বেড়েই চলছে। এখন সারা পৃথিবীতেই পানির সমস্যায় পর্যবসিত সবশ্রেণীর মানুষ। বিশেষ করে বিশ্বে তিনশ’ কোটিরও অধিক মানুষ পানি সমস্যার নাজুক পর্যায়ে রয়েছে। একবাক্যে বলা যায়, এই পানির অভাব-সমস্যা দ্রুত সমাধান না করতে পারলে এক মহাদুর্গতী বিশ্ববাসীর জন্য অপেক্ষা করছে তা হলফ করে বলা যায়।
যদিও এখন এ বিষয়ে তৎপর হয়ে উঠেছে বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ, ভাবছে কি করে পানিসম্পদ সংরক্ষণ ও দূষণ প্রতিরোধে সক্রিয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। নানা রকম প্রতিপাদ্য নিয়ে জনসচেনতা বাড়ানোর লক্ষে কার্যক্রম চালানোর ওপর এখন জোর দেওয়া হচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস, এ কার্যক্রম সফলতার দ্বোর উম্মোচন করবে এবং বিশ্ববাসী সচেতনতার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধানে সক্ষম হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মানবজাতি তথা সৃষ্টি জগতের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত পানি। এই পনি সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব দান। পানির গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদিস শরীফে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। পানির উপস্থিতির কারণেই এই পৃথিবীতে প্রাণী ও উদ্ভিদের অবস্থান, বংশ বৃদ্ধি এবং টিকে আছে মানবজাতির অস্তিত্ব¡। মোটকথা, পানি ছাড়া জীবজগত এক মূহুর্তও টিকে থাকতে পারেনা। আধুনিক বিজ্ঞান পানিকে প্রাণের উৎপত্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং এ নিয়ে গবেষণা করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। পদার্থের দিক দিয়ে পানি সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। স্রষ্টা প্রদত্ত প্রাকৃতিক ও খনিজ পদার্থের মধ্যে স্বর্ণ ও প¬াটিনাম ধাতু এবং হীরা অতি মূল্যবান হলেও এসব পদার্থ নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত। এদের ব্যবহারও অতি সীমিত। পানি এমনই এক ধরনের পদার্থ যার কোন স্বাদ, গন্ধ ও রং নেই অথচ এর ব্যবহার ব্যাপকভিত্তিক। পানি সহজলভ্য এবং এর সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয় না। প্রাণের অস্তিত্বে¡র সঙ্গে পানির সম্পর্ক সুনিবিড়। পানি আছে বলেই সৃষ্ট জগত সচল রয়েছে-এটা বিজ্ঞানস্বীকৃত।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, সৌরজগতের একমাত্র গ্রহ ‘পৃথিবী’তেই পানির অস্তিত্ব¡ বিদ্যমান। অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহে পৃথিবীর মতো পানির সহজলভ্যতা বজায় না থাকায়, তাতে স্বাভাবিক জীবন প্রণালী সম্ভব নয়। সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন, যেখানে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত পানির সু-ব্যবস্থা রয়েছে। তাই পৃথিবী মানুষের বসবাসের ক্ষেত্রে সর্বাধিক উপযোগী। কারণ, মানুষের বসবাসের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের সহাবস্থান সম্পর্কযুক্ত। মহান সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীকেই একমাত্র মানুষের আবাসস্থল ও তাতে পানির গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কুরানুল কারীমে উল্লে¬¬খ করেন,‘তিনিই পৃথিবীকে করেছেন বসবাস উপযোগী এবং এর মাঝে প্রবাহিত করেছেন নদী-নালা (সূরা নমল, আয়াত ৬১)। কুরআনে আরও উল্লে¬খ রয়েছে যে, ‘তুমি কি দেখ না আল্লাহপাক আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, তারপর ভূমিতে স্রোতরুপে তা প্রবাহিত করেন এবং তা দিয়ে বিচিত্র বর্ণের ফসল উৎপাদন করেন? (সূরা যুমার, আয়াত-২১)।
স্রষ্টা সমস্ত পৃথিবীর ৭০ ভাগ পানিতে পূর্ণ করে রেখেছেন, যা কখনও হ্রাস পায় না। পানি সংক্রান্ত আরেকটি আয়াত নিম্নরূপ:-‘আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি পরিমিতভাবে তারপর আমি সেই পানি মাটিতে সংরক্ষণ করি, আমি সেই পানি অপসারিত করতেও সক্ষম’ (সূরা মুমিনুন, আয়াত-১৮)। সাগরের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা পানি সংরক্ষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন এবং তা থেকে বৃষ্টি আকারে পানি পরিশোধন করে পরিমিতভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মজুদ করে রাখেন। আল্লা¬হ পাক যে পানি কুদরত হিসেবে আমাদের দান করেছেন তার সংরক্ষণ ও বিতরণ ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই হাতে। তিনি ইচ্ছা করলে পানি আমাদের নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে পারেন। আবার সমস্ত পানিকে লবণাক্ত করে দিতে পারেন। যা আমাদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপ্রতুল্য হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আল্ল¬াহ পাক পানিকে করেছেন অবারিত ও সহজলভ্য।
মহান সৃষ্টিকর্তা পানি সম্পর্কে আমাদের চিন্তা করতে বলেছেন এবং এই মহামূল্যবান পানি প্রাপ্তিতে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কথাও বলেছেন। পানি বিষয়ক আরেকটি আয়াতে আল্ল¬াহ তায়ালা বলেন, ‘আমি বৃষ্টি গর্ভ বায়ু প্রেরণ করি, তারপর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি এবং তা তোমাদের পান করতে দিই। পানির ভান্ডার তোমাদের নিকট নেই’ (সূরা হিজর, আয়াত-২২)। কুরআন পাকের আরেকটি আয়াতে উল্লে¬¬খ রয়েছে যে, ‘বল, তোমরা চিন্তা করে দেখেছ কি পানি ভূগর্তে তোমাদের নাগালের বাইরে চলে যায়, কে তোমাদেরকে এনে দিবে প্রবাহমান পানি?’ (সূরা মূলক, আয়াত-৬৭)। পানি প্রাপ্যতায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তিনি বলেন, ‘তোমরা যে পানি পান কর সে সম্পর্কে কি তোমরা চিন্তা করেছো? তোমরাই কি পানি মেঘ থেকে নামিয়ে আন, না আমি তা বর্ষণ করি? আমি ইচ্ছা করলে তা লবণাক্ত করে দিতে পারি। তবুও কেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর না?’ (সূরা ওয়াকিয়া, আয়াত ৬৮-৭০)।
প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবন পানি ছাড়া এক মুহুর্তও বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। এককথায়, পানির ওপর নির্ভরশীল সকল প্রাণী ও উদ্ভিদ। তা ছাড়া সৃষ্টি জগতে পানির ব্যবহার বলে শেষ করা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে সাগরের পানিতে প্লাবিত ও ডুবন্ত অবস্থায় রয়েছে ভূপৃষ্ঠ অপেক্ষা অধিক প্রাণী ও উদ্ভিদ যা পানিকে ঘিরেই আবর্তিত। যা নিয়ে চলছে ব্যাপক গবেষণা। আধুনিক বিজ্ঞান পানিকে নানাভাবে ব্যবহার করছে। পানিকে কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবিত হয়েছে, হচ্ছে বিদ্যুৎ শক্তি। অপরদিকে পানিকে বাষ্পে পরিণত করে বিভিন্ন যান্ত্রিক কলা-কৌশল আবিস্কৃত হচ্ছে।
অত্যন্ত আনন্দের বিষয়, আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরাও পানির অনবরত ঘূর্ণন থেকে ‘আনলিমিটেড’ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিভিন্ন পদ্ধতি আবিস্কার করেছেন, করছেন। যা আমাদের বাঙালি জাতির গৌরবের বিষয়। এছাড়া পানিকে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশ কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, হচ্ছে। বিশ্বব্যাপি বিভিন্ন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান সমূহ পানি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। মানুষের দেহ সুস্থ রাখতে বিভিন্ন খনিজ উপাদান ও পানিকে দূষণমুক্ত রাখার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান লাভ অতঃপর এর ব্যবহারের মাধ্যমে উপকৃত হওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।
অঞ্চল ভেদে ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে পানিতে রয়েছে ২০/২৫ প্রকার খনিজ পদার্থ। এসব খনিজ পদার্থের রয়েছে নানারকম কার্যকারিতা। পানিতে বিদ্যমান উল্লেখযোগ্য খনিজ পদার্থগুলো হচ্ছে-ক্যালসিয়াম, বাই-কার্বনেট, সোডিয়াম, আয়রণ, কপার সালফেট, ম্যাগনেশিয়াম, ফ্লোরাইড ইত্যাদি। এসব খনিজ পদার্থ মানবদেহ এবং উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য অতি প্রয়োজনীয়। আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞানীরা মানব শিশুর দাঁত গজানো থেকে শুরু করে দেহের পুষ্টি সাধন পর্যন্ত পানির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লে¬¬খ করেছেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে পানির ব্যবহার অতি প্রাচীন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে ক্রমে ক্রমে পানির ব্যবহার বেড়েই চলছে। বোতলজাত করে বিভিন্ন দেশে ফ্রেস পানিকে ঘিরে গড়ে ওঠেছে অসংখ্য শিল্প-কারখানা। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পানির ভূমিকা আদিকালের। মৎস্য চাষে ও প্রাকৃতিক মৎস্য ভান্ডার পানির উপরই নির্ভরশীল। সাম্প্রতিকালে মারাত্মক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পানিতে আর্সেনিক’ বিষয়টি। এ অবস্থায় বিশুদ্ধ খাবার পানি পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়েছে। তবে আর্সেনিক থাকলেই পানি ব্যবহারর অযোগ্য হয় না। বাংলাদেশের জন্য পানিতে লিটার প্রতি ৫০ মাইক্রোগ্রামের বেশি আর্সেনিক থাকলে তা ক্ষতিকর। বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকার পানিতে মাত্রারিক্ত আর্সেনিক যুক্ত পানি মিলছে-এক্ষেত্রে আর্সেনিক থেকে রক্ষা পেতে ‘বৃষ্টির পানি’ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বিজ্ঞানভিত্তিতে। অথচ আল্লাহ তায়ালা বৃষ্টির পানিকে ‘বিশুদ্ধ পানি’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে। আল্লা¬হ স্বীয় অনুগ্রহের প্রাক্কালে সুসংবাদবাহীরূপে বায়ু প্রেরণ করেন এবং আকাশ থেকে বিশুদ্ধ পানি বর্ষণ করেন, তা মৃত ভূখন্ডকে সজ্জীবিত করতে ও অসংখ্য জীব-জন্তু এবং মানুষের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য (সূরা ফুরকান, আয়াত ৪৮-৪৯)।
নবজাতক থেকে শুরু করে মৃত্যু পথযাত্রী পর্যন্ত এ পানির চাহিদা অনস্বীকার্য। এই পানির জন্য প্রত্যাশিত সব বয়সী মানুষ। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) পানির উপকারিতা সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি পানির অপচয় রোধ ও পানিকে দূষণমুক্ত রাখতে বলেছেন। আল্লাহর দেয়া এ পানি শ্রেষ্ঠ নেয়ামত, যার সুষ্ঠু ব্যবহার ও সংরক্ষণ প্রতিটি মানুষের জন্য দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর এই উপলব্ধি থেকেই আজ বিশ্বব্যাপী দাবী উঠেছে পানি দূষণ মুক্ত রাখার। আমাদের বিশ্বাস, স্রষ্ঠা প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ নেয়ামত এ পানির অপচয় রোধ ও দূষণ মুক্ত রাখতে দেশ-জাতি বর্ণভেদে সকলের প্রচেষ্টা হবে সমানে সমান। আমাদের কোনোভাবেই নদী, খাল-বিলের গতিপথ বন্ধ কিংবা বাঁধার সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। আজ আমাদের সকলকে সংকল্প করতে হবে, আমরা আর কখনো পানির অপচয় করবো না, পানির সুষ্ঠু ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করবো। শুধু সরকারের দিকে চেয়ে থাকা নয়, আমরা স্ব-স্ব উদ্যোগে ডোবা-পুকুর-খাল খনন করে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনবো। গভীর নলকুপের ব্যবহার কমিয়ে এসবের উপর নির্ভর হওয়ার জন্য চেষ্টা করবো। এই সুন্দর ধরণীকে বাঁচাতে, নিজে বাঁচতে, অপরকেও বাঁচাতে আমাদের সকলের ভ’মিকা হবে প্রশংসনীয়।

লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
ই-মেইল: khan-srisy@yahoo.com

Check Also

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট : বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন

  কুমিল্লাওয়েব ডেস্ক:– আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন। ১৯৭৫ ...

Leave a Reply