’মুঠোফোনে তালাক‘ ফতোয়ার ফাঁদে এক নববধূ

imagesআরিফুল ইসলাম সুমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধিঃ—
সরকার নিযুক্ত মুফতি না হয়েও ‘ফতোয়া’ দিয়েছেন এক মাদ্রাসা শিক্ষক। এতে বিয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় এক নববধূকে স্বামীর সংসার ছাড়তে হয়। তার জীবন এখন বিপন্ন। লিখিত ফতোয়ার বাধায় ওই নববধূ ফিরে যেতে পারছে না স্বামীর সংসারে। সুযোগ সন্ধানী স্বামী বেচারা হুজুরের দেওয়া ফতোয়াকে পুঁজি করে এখন সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলেছেন। অসহায় ওই মেয়েটি বর্তমানে তার পিতার বাড়িতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের বড়ইছাড়া এলাকায় মানবেতর জীবন যাপন করছে।
এলাকাবাসী ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, অনুমান ছয়মাস আগে সরাইলের বড়ইছাড়া এলাকার ওই মেয়েটির বিয়ে হয় কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার মোটুপী এলাকার মো. জমসেদ মিয়ার ছেলে মো. হেলিম মিয়ার সাথে।
বিয়ের তিন মাস পর নববধূ বড়ইছাড়া এলাকায় নিজ খালার বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানে বেড়াতে আসে। রাতে প্রতিবেশী দুই সন্তানের জনক মোকসেদ মিয়া নামে এক ব্যক্তি ওই নববধূকে যৌন নিপীড়নসহ তাকে (নববধূ) আহত করে। বিষয়টি জেনে নববধূর স্বামী হেলিম মিয়া রাগে মূর্তিমান হয়ে গত ২৮ ডিসেম্বর মুঠোফোনে স্ত্রীকে তালাক দেয়।
একসময় স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকদের কাছে নববধূর বিষয়টি পরিস্কার হয়। রাগের মাথায় মুঠোফোনে স্ত্রীকে তালাক দিলেও অনুতপ্ত হন হেলিম মিয়া। তিনি গত ৯ জানুয়ারী ভৈরব কমলপুর জামিয়া ইসলামীয়া দারুল উলুম মাদ্রাসার ফতোয়া বিভাগের শিক্ষক মুফতি মো. শাহাদাত হোসাইন এর শরণাপন্ন হন। মাদ্রাসা শিক্ষক পুরো বিষয়টি তার কাছ থেকে প্রথমে মৌখিক এবং পরে লিখিতভাবে জেনে নেন। পরে মুফতি শাহাদাত হোসাইন লিখিত ফতোয়া দেন। এতে বলা হয় “তার (হেলিম মিয়া) স্ত্রীর উপর তিন তালাক মুগাল্লাজা পতিত হয়েছে। তাদের (স্বামী-স্ত্রী) বৈবাহিক সম্পর্ক একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তারা (হেলিম ও তার স্ত্রী) আর সংসার করতে পারবে না।”
এদিকে ফতোয়ার ফাঁদে দিশেহারা মেয়েটি আশ্রয় নিয়েছে পিতার সংসারে। অসহায়ত্বের খবর জেনে নারী লিপ্সু মোকসেদ মিয়া স্বামী ও সংসার হারা মেয়েটির আবারো সর্বনাশ করার সুযোগ খুঁজতে থাকে। অবশেষে গত ২২ ফেব্রুয়ারী রাত সাড়ে ৮টায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ঘর থেকে বের হলে লম্পট মোকসেদ জোরপূর্বক ওই মেয়েটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এ ঘটনায় মোকসেদ মিয়াকে প্রধান আসামি করে তিনজনের বিরুদ্ধে সরাইল থানায় মামলা দায়ের হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে বড়ইছাড়া এলাকায় বাড়িতে খোঁজ করলে মোকসেদ মিয়াকে পাওয়া যায়নি। তার বড় ভাই মো. মোমেন মিয়া বলেন, ওইদিন যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি। বিয়ে বাড়িতে দুষ্টুমি করার সময়ে মোকসেদের আঘাতে ওই নববধূ আহত হয়। মোকসেদ মিয়ার চাচা মো. নূর আলী বলেন, নববধূকে আমরা চিকিৎসা করায়। ভৈরব গিয়ে তার স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকদের কাছে আমরা এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছি।
গ্রামের শিক্ষক মো. আজগর আলী বলেন, ফতোয়ার কারণে মেয়েটির সংসার ভেঙে গেল। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় দু’দলের মধ্যে বিরোধ চলছে।
মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে ভৈরব কমলপুর জামিয়া ইসলামীয়া দারুল উলুম মাদ্রাসার ফতোয়া বিভাগের শিক্ষক মুফতি মো. শাহাদাত হোসাইন সাংবাদিকদের বলেন, হেলিম মিয়া মাদ্রাসায় এসেছিল, তার সব কথা শুনেই আমি লিখিত ফতোয়া দিয়েছি। তিনি আরো বলেন, আমি সরকার নিযুক্ত মুফতি নয়। প্রয়োজনে লোকজন মাদ্রাসায় আসেন। অফিসের মাধ্যমে ফি বাবদ দুইশত টাকা জমা নিয়ে আমি ফতোয়া দেই।
নববধূর স্বামী মো. হেলিম মিয়া মুঠোফোনে বলেন, বিয়ে বাড়িতে মোকসেদ নামক যুবকের সাথে ফষ্টিনষ্টি করতে গিয়ে আমার স্ত্রী আহত হয়েছে, এমন খবর শুনে রাগে উত্তেজিত হয়ে মুঠোফোনে স্ত্রীকে তালাক বলেছি। পরে আমি হুজুরের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি ফতোয়া দিয়ে বলেছেন স্থায়ীভাবে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে। এক প্রশ্নের জবাবে হেলিম মিয়া বলেন, যেহেতু তালাক হয়ে গেছে সেহেতু তাকে (স্ত্রী) সংসারে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নই উঠে না।

Check Also

নাসিরনগরে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ালেন রেড ক্রিসেন্ট

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তার পর এবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে ...

Leave a Reply