শিশুদের পাঠ্যবইয়ে যৌন ও প্রজনন শিক্ষা——মোঃ আরিফুর রহমান

book-jsc
শিশু বয়সেই ছেলে-মেয়েদের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে একে অপরের গোপন বিষয় সম্পর্কে আকর্ষণীয় তথ্য। ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্য বইয়ে শিশুদের দেয়া হচ্ছে যৌনতার ধারণা। বয়ঃসন্ধিকালের এই আলোচনার কারণে শারীরিক শিক্ষার ক্লাস নিতে বিব্রতবোধ করছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। পুরুষ শিক্ষকরা মেয়েদের জন্য আর মহিলা শিক্ষকরা ছেলেদের জন্য অস্বস্তিবোধ করেন। শিশু বয়সে ছেলে-মেয়েদের জন্য একই বইয়ে গোপন বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করা ঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রগতিশীল শিক্ষার নামে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পাশ্চাত্যকরণ করা হচ্ছে বলে শিক্ষাবিদরা অভিযোগ করেন। মেয়েদের জন্য প্রযোজ্য হলেও ছেলেদের জন্য এতো অল্প বয়সে আলোচনা করা ঠিক হয়নি বলে মনে করেন অভিভাবকরা।
সরকারের দেয়া শিশুদের পাঠ্যবইয়ে আপত্তিকর বিষয় থাকায় ক্ষুব্ধ ও বিপাকে অভিভাবকরা। শিশুদের পাঠ্যবইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করায় তা পড়াতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে শিক্ষকদের।
একজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, ২০১৩ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ষষ্ঠ শ্রেণির নতুন প্রণিত শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয় বইটিতে ছেলে-মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বইটির চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে ‘আমাদের জীবনে বয়ঃসন্ধিকাল’ শীর্ষক একটি অধ্যায়। এই অধ্যায়ে বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে-মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের পরিবর্তন এবং করণীয় বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
৮ম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ বই এর ৮৪, ৮৬ ও ৮৭ নং পৃষ্ঠার শিক্ষনীয় কিছু পাঠ দেখে এক ছাত্র আমাকে সে সম্পর্কে জানতে চাইলে আমি একটু দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যাই। আমি বুঝতে পারিনি, আমি কি উত্তর দিব।
মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইয়ে যৌন ও প্রজনন শিক্ষা যৌক্তিক হয়নি বলে মনে করেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকেরা। এসব বিষয় পড়ানো হলে ধর্ষণের প্রবণতা ও ইভটিজিংয়ের প্রকোপ বাড়বে বলে মনে করেন তারা। এতে প্রজনন, মাসিক, বীর্যপাত, গর্ভপাতের মত বিষয় সন্নিবেশিত থাকায় লজ্জিত ও বিব্রত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
1
এদিকে আমাদের দেশের আইনে মেয়ে ১৮ এবং ছেলেদের ২১ বছর পরিণত বয়স বোঝায়। এর আগে বিয়ে আইনসিদ্ধ নয়। ওই বয়সে ছেলে কিংবা মেয়ে এইচএসসি সম্পন্ন করে। ফলে এর আগে যৌন শিক্ষার যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। তাই বলা যায়, অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী পরিণত বয়সের না হওয়ায় ‘প্রজনন স্বাস্থ্য’ পাঠটি দেয়া যৌক্তিক হয়নি। এতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা লজ্জা ও বিব্ররতকর অবস্থায় পড়বে।’
পর্নোগ্রাফি সম্পর্কে বলা যায়- আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে বাইরের দেশের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। বইতে আলোচনা করায় পর্নোগ্রাফি নিয়ে শিশুদের মধ্যে কৌতুহল দেখা দেবে।’
2
এক কথায় বলা যায়, আমাদের দেশের অধিকাংশ স্কুলেই সহশিক্ষা বিদ্যমান। এসব স্কুলে বিষয়টি পড়াতে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়বেন শিক্ষকেরা। এতে আরো বেশি বিব্রত হবে ছাত্র-ছাত্রীরা। ছেলেমেয়েদের সামনে একত্রিতভাবে এসব বিষয় পাঠদান শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্যই বিব্রতকর। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েদের ক্লাসে পুরুষ শিক্ষক কিংবা ছেলেদের ক্লাসে মহিলা শিক্ষক থাকায় বিষয়গুলোর পাঠদান, প্রশ্নোত্তর তথা আলোচনাও বিব্রতকর।
বিষয়টির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের কয়েকজন অভিভাবক বলেন, বিষয়টি মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো দরকার ছিল না। এ বিষয়ে জানাতে হলে তা এইচএসি’তে সহপাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেত।
তবে অষ্টম শ্রেণির ১২ থেকে ১৪ বছরের শিক্ষার্থীকে প্রজনন শিক্ষা দেয়ার প্রয়োজন আছে কি-না? এমন প্রশ্নের জবাবে বইটির সম্পাদক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, প্রাথমিক ধারণা দেয়ার জন্যই ওই পাঠটি দেয়া হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের কৌতুহল দূর হবে, বিভ্রান্তিতে পড়বে না।
অভিভাবকদের অভিযোগ প্রসঙ্গে জনাব ফারুক বলেন, প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগ থাকলে তা বিবেচনা নেয়া হবে। পরবর্তীতে পর্যালোচনা করে পাঠের পরিমার্জন করা হবে।
এ বিষয়ে জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড- এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোস্তফা কামাল উদ্দিন বলেন, সারা দুনিয়াতে এই শিক্ষা আছে। দুনিয়ার সঙ্গে তাল মিলাতেই আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রজনন শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করতেই ওই পাঠ দেয়া হয়েছে।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সচেতন অভিভাবকদের পক্ষ থেকে এ নিয়ে অনেক অভিযোগ জমা পড়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট পাঠ সিলেবাস থেকে বাদ দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
‘শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য’ বই থেকে প্রজনন স্বাস্থ্য অধ্যায়টি বাদ দেয়ার জন্য ইতোমধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা। আবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়- শিশুদের এসব বিষয়ে পড়ানো হলে ধর্ষণের প্রবণতা ও ইভটিজিংয়ের প্রকোপ বাড়বে।

————লেখক, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী

Check Also

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট : বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন

  কুমিল্লাওয়েব ডেস্ক:– আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন। ১৯৭৫ ...

Leave a Reply