মতিন সৈকতের প্রশংসনীয় কর্মকান্ড “দু’শ টাকা বিঘা সেচ প্রকল্প বিরল দৃষ্টান্ত”——-মো. আলী আশরাফ খান

Matin s -Daudkandi
মানুষ খ্যাতিমান হওয়ার জন্য হেন কাজ নেই যা করছে না। শুধু তাই নয়, আমরা দেখছি অনেকে অনেক রকমভাবে নিজেদের বড়ত্বকেও জাহিরের চেষ্টা করে। আবার এমনও হয়, আমাদের মধ্যে অনেকেই নিজেরা যা নয় তা বহুগুনে বাড়িয়ে প্রকাশ করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুরগিলে। আসলে দিন যতই অতিবাহিত হচ্ছে ততই এমনসব অপ্রত্যাশিত ঘটনা গানিতিক হারে বেড়েই চলছে আমাদের সমাজে। কিন্তু তারপরেও কথা থাকে, আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যারা নিরবে নিভৃত্বে মানুষের সেবায়, সমাজ উন্নয়নে এবং দেশমাতৃকাকে ভালোবেসে নি:স্বার্থভাবে দেশের জন্য নিজেদের বিলিয়ে দিয়ে আত্মপ্রশান্তি লাভ করেন। আজকে এমনই একজন সহজ-সরল ও প্রকৃত সমাজপ্রেমী ও তার ব্যতিক্রমী কর্মকান্ডের কিছু অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করবো এ লেখায়।
তিনি হলেন আমাদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব দাউদকান্দি উপজেলার আদমপুর গ্রামের অধ্যাপক মতিন সৈকত। যিনি পৌষ-বৈশাখ খড়া মৌসুমে গত ১৭ বছর যাবত এলাকার কৃষকদের পাশে থেকে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যেখানে এককেজি বোরো ধান ফলাতে চার হাজার লিটার পানির প্রয়োজন, সারাদেশে কৃষকরা যখন সেচের পানি নিয়ে চিন্তিত, কীটনাশক, রাসায়নিক সারের যোগান দিতে গিয়ে খায় হিমসিম, বিঘাপ্রতি জমিনে পানির সেচ খরচ দিতে হয় হাজার বার’শ টাকা; ঠিক তখনই তিনি দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জ (দঃ) ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ১৯৯৭ সাল থেকে টানা ১৭ বছর যাবত আদমপুর, পুটিয়া, সিঙ্গুলা, আপুসি বোরো ধানের মাঠে মৌসুমব্যাপি মাত্র দু’শ টাকা বিঘা সেচ দিয়েই নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পৌষ থেকে বৈশাখ পর্যন্ত এ পাঁচ মাস, ধান লাগানো থেকে ঘরে তোলা পর্যন্ত যার যতবার সেচের পানির প্রয়োজন ততবার সেচের পানি দিয়ে আসছেন এ নামমাত্র টাকায় মৌসুমব্যাপি ১৫০ বিঘা বোরো ধানের জমিতে। একই পরিমাণ জমিনে তার চেয়ে কম সেচ দিয়ে অন্যান্যরা হাজার বার’শ টাকা নিয়ে থাকেন। সেখানে মতিন সৈকত কি করে দু’শ টাকা বিঘা সেচ দিয়ে যাচ্ছেন এপ্রশ্ন এখন মানুষের মুখে মুখে। মানুষ বলাবলি করছেন, নি:সন্দেহে এটি জাতীয় রেকর্ড সৃষ্টি করার মত ব্যাপার। এ বিষয়ে তিনি বলেন, জাতীয় রেকর্ড বা দৃষ্টান্তÍ স্থাপন করার লক্ষে নয়, আমি কাজ করছি কাজের জন্য। আমি ত্যাগেই আত্মপ্রশান্তি লাভ করি। আমার বাবা একজন প্রকৃত কৃষক ছিলেন। আমি তার কাছ থেকেই সেবার প্রেরণা পাই।
মতিন সৈকত মৌসুমব্যাপি দু’শ টাকা বিঘা সেচ দিয়েই তার দায়িত্ব শেষ করে দেননি। সেচের উৎস কালাডুমুর নদী খননেও রয়েছে তার প্রশংসনীয় উদ্যোগ। গৌরীপুর থেকে ইলিয়টগঞ্জ পর্যন্ত ৪১ হাজার ৮ শ ৫০ ফিট দীর্ঘ এ নদীটি পুনঃখনন না থাকায় বর্ষার পলি-বালিতে ভরাট হয়ে যাওয়ার পথে। ২০০৭ সাল থেকে নদীটির খনন প্রচেষ্টা চালান তিনি। খননের জন্য মতিন সৈকতের উদ্যোগে চার বার সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন, কোদাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। তিনি নদীটি খননের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বি.এ.ডি.সি, স্থানীয় সাংসদ, কৃষি সচীব, কৃষিমন্ত্রী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে নদীটি খননের দাবি জানিয়েছেন মতিন সৈকত। ২০০৭ সালে নদীটির উৎস মুখে দু’কিলো মিটার পুনঃ খনন করেছেন নিজের নেতৃত্বে।
এছাড়াও অধ্যাপক মতিন সৈকত দাউদকান্দি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ১৫৪ টি আই.পি.এম- আই.সি.এম ক্লাবকে সংগঠিত করে সু-স্বাস্থ্য, নির্মল পরিবেশ, অধিক ফলন, বিষমুক্ত খাদ্য আন্দোলনে দাউদকান্দিকে পথিৎকৃ করার জন্য দাউদকান্দি উপজেলা কেন্দ্র্রীয় আই.পি.এম- আই.সি.এম ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। প্রশিক্ষিত কৃষকদের সংগঠনের মাধ্যমে কৃষি বিভাগের সহায়তাকারী হিসাবে সার্বিক যোগাযোগ রক্ষা করে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ ব্যবহার করে উন্নত ফসল ফলানোর ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। উঠান বৈঠক, কৃষক সমাবেশ ফসলের মাঠে প্রান্তরে ঘুরেফিরে তদারকি করেন। কৃষকদের সুবিধার জন্য ১৭টি পানির মেশিন, ২টি পাওয়ার টিলার, ৬টি সেলাই মেশিন দেওয়া প্রদান করেন তিনি। মতিন সৈকত গণ শেয়ারের ভিত্তিতে আদমপুর, পুটিয়া, সিঙ্গুলা তিন গ্রামের জনগণকে নিয়ে দু’শ পঞ্চাশ বিঘা প্লাবন ভূমিতে আপুসি মৎস্য চাষ প্রকল্প এবং এক’শ বিঘা প্লাবন ভূমিতে পুটিয়া বিসমিল্লাহ মৎস্য চাষ প্রকল্প দু’টি গড়ে তোলেন।
আমাদের মতিন সৈকত বই তথা পাঠাগার প্রেমী। ছোটকাল খেকেই তিনি বই ও পাঠাগার আন্দোলন করে আসছেন। স্কুলভিত্তিক পাঠাগার আন্দোলন, আমার বই/আমার পাঠাগার, একটি বই কিনে দেব, এক’শ বই পড়তে নেব। সকল শিক্ষক শিক্ষার্থীদের থেকে মাত্র একটি করে বই নিয়ে তাদের সাহায্যে তাদের স্কুলে পাঠাগার গড়ে তুলেন। এভাবেই তিনি শিক্ষার্থীদেরকে সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশে সহায়তা প্রদান করে আসছেন। মতিন সৈকত নিজেও একজন সাহিত্যিক। তার প্রকাশিত বই, কবিতা পত্র, অলংকার, মুক্তি চাই, তোমরা তো সুখেই আছ প্রভৃতি প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৮৭ সালের দিকে তিনি নিজ গ্রাম আদমপুর পাশ্ববর্তী পুটিয়া ও বিটমানকে সমাজ উন্নয়নে অবদানের জন্য সংগঠিত করে পি.এ.বি আদর্শ সমাজকল্যাণ সংজ্ঞ গড়ে তোলেন। সেই থেকে সমাজ উন্নয়নে তার আনুষ্ঠানিক পথ চলা। বর্তমানে তার নামে এলাকায় একটি পাবলিক লাইব্রেরিও চালু রয়েছে।
অভিবাসী অধিকার সংরক্ষণেও রয়েছে তার কার্যক্রম। ইলিয়টগঞ্জ (উঃ) ইলিয়টগঞ্জ (দঃ) ইউনিয়নের অসংখ্য জনগণ কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে প্রবাসী কর্মজীবন অতিবাহিত করছেন। তাদের কষ্টার্জিত রেমিটেন্স পরিবার ও দেশ সমৃদ্ধ হচ্ছে। তাদের কষ্টার্জিত টাকা যাতে সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং দেশে ফেরার পর যাতে শুন্য হাতে পড়তে না হয়। এ জন্য তাদেরকে নিরাপদ অভিবাসন, ভিসা, পাসর্পোট, ব্যাংক একাউন্ট যাচাইসহ নানাবিদ সচেতনতা সৃষ্টি করেন তিনি। মতিন সৈকত সোনার মানুষদের সেবা প্রদানের জন্য অভিবাসি অধিকার সংরক্ষণ কমিটির মাধ্যমে এসব কর্মকান্ড পরিচালনা করেন। সমাজ সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে তিনি বিভিন্ন কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন। সবার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সেনিটেশন, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে তিনি সচেতনতা সৃষ্টি করে চলছেন। তরুণ প্রজন্মকে মাদক, এসিড, এইডস্, আর্সেনিকের ক্ষতিকর ভয়াবহ প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন ফেয়ার কালচারাল মুভমেন্টের চেয়ারম্যান হিসেবে নিরলস দায়িত্ব পালনের মাধ্যদিয়ে ।
মতিন সৈকত তার এ সমস্ত সৃষ্টিশীল কর্মকান্ডের স্বীকৃতি স্বরূপ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন। ১৯৮৭ সালে দশম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় তৎকালিন রষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ তাকে চিঠির মাধ্যমে অভিনন্দন জানান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাছিনা তাকে ১৪১৫ বাংলায় ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি’ পুরস্কার প্রদান করেন। এছাড়া তিনি নবাব সিরাজউদ্দৌলা স্বর্ণপদক, সোনার মানুষ সেবা সম্মাননা, ড. মোশাররফ ফাউন্ডেশন কলেজ পুরস্কার, সেরা প্রিয়াজন লেখক পুরস্কার, সেরা গল্পকার পুরস্কার, ফ্রেন্ডশিপ ত্র্যাওয়ার্ড, সৃষ্টি ত্র্যাওয়ার্ড, মুক্তিযোদ্ধা মোহন বাঁশি-বাংলালিংক পুরস্কার, প্রিয়জন-টেলিটক সেরা সংগঠক, জ্ঞানার্ণব সাহিত্য সংসদ পুরস্কার লাভ করেন।
এককথায়, তিনি দু’শ টাকার সেচ, নদী খনন, পরিবেশ সংরক্ষণ, পাঠাগার আন্দোলন, অভিবাসি অধিকার সংরক্ষণ, প্লাবন ভূমিতে গণ-শেয়ারেরভিত্তিতে মৎস্য চাষ, বিষমুক্ত দাউদকান্দি গড়া, সুস্থ সাংস্কৃতি আন্দোলন, প্রত্যেকটি কাজে পৃথক পৃথক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মানুষের সেবায়-সমাজের কল্যাণে যারা অবদান রেখেছেন-রাখছেন তাদেরই অন্যতম একজন আমাদের প্রিয় এ মতিন সৈকত। আমরা তার সুস্থ-সুন্দর ও উন্নত জীবন কামনা করি।

—লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা ।

Check Also

কুমিল্লা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ জামিল বাবু’র ইন্তেকাল

কুমিল্লা প্রতিনিধি– কুমিল্লা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক, দাউদকান্দি উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ইউসুফ জামিল বাবু ...

Leave a Reply