আন্তর্জাতিক নারী দিবস —-মো. আলী আশরাফ খান

Ali ashraf khan-07.03.13
আমরা প্রতি বছরের ৮ মার্চকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত আমাদের দেশেও আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করে থাকি। এ দিবসটিকে পালন করার মূল উদ্দেশ্য: বিশ্বব্যাপি নারীর প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ যথাযথভাবে নারীর অধিকার সর্বত্র বাস্তবায়ন করা। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে ততই আমাদের মায়ের জাত নারীরা তাদের প্রকৃত অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে স্বীকার হচ্ছে নানা রকম অমানষিক নির্যাতনের। আমরা কোনোভাবেই আমাদের মা-বোনদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারছি না। আসলে এই যে না পারার বিষয়টি এর অন্তর্নিহিত কারণ হল, আমরা শুধু ৮ মার্চকে ঘিরেই নারী দিবস পালন ও নারীর অধিকারের নামে হইহুল্লুর করি। শুধুমাত্র এদিনটিতেই আমাদের যত সব আয়োজন! কিন্তু এরকম নির্ধারিত একটি দিন নিয়ে আমাদের যতই মাথা ব্যথা থাকুক না কেনো, এতে কোনো রকম ফল পাওয়া যাবে না, এর প্রমাণ বিগত দিনগুলো। যতই দিন অতিবাহিত হচ্ছে ততই সমাজে নারী নির্যাতনের অসংখ্য অসংখ্য ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠছে আমাদের সামনে। যদিও আমরা নারীর অধিকার নিশ্চিতকরণে আগেকার তুলনায় এখন অনেক বেশি বেশি লেখালেখি হচ্ছে এবং সভা-সেমিনারও চলছে বিশ্বজুড়ে। কিন্তু আমরা যেমনটি ফলাফল আশা করছি তেমনটি তো পাচ্ছিই না বরং চলমান ধারার নারী আন্দোলনে নারীর অধিকারের বিষয়টি এখন এক হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
অথচ, আমাদের সামনে যে নারী আন্দোলনের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তা আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। ইতিহাস স্বাক্ষী ১৮৪৮ সালে প্রুসিয়ায় সংঘঠিত হয় নারী বিপ্লবের প্রথম আন্দোলন। এরপর ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্ক শহরে সংগঠিত হয় নারীর ন্যায্য মজুরি, দশ ঘন্টা কাজ, উন্নত কর্মপরিবেশ ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার আদায়ের এক বিক্ষোভ। পরে ১৯১৪ সাল থেকে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৮ মার্চকে বিশ্ব নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি ১৯৮৫ সালকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক নারীবর্ষ এবং ৮ মার্চকে প্রতি বছর পালনীয় ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৯১ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিনটিকে বিশ্ব নারী দিবস হিসেবে পালন করার সংস্কৃতি শুরু হয়। আমাদের দেশেও কথিত নারী নেত্রীদের পাশাপাশি পুরুষদেরকেও এ আন্দোলনে অংশ নিতে দেখা যায়। বছর ঘুরে এলেই ৮ মার্চকে নির্দিষ্ট করে নারীর অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে তোড়জোর কার্যক্রম শুরু হয়। বেশ ঘটা করে ব্যানার-ফেস্টুন, সভা-সেমিনার, আলোচনা অনুষ্ঠান, বাহারি রংচটা পোশাক-পরিচ্ছদে র‌্যালি, দৌঁড়ঝাঁপ ও বড় বড় বুলিতে প্রকম্পিত হয় রাস্তাঘাট। আসলে এসবে নারীরা কতটা লাভবান হয়, কতটা অধিকার আদায় হয় তাদের? পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তি-পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রীয় নির্যাতন থেকে নারীরা কতটুকু মুক্ত? কতটা পরিবর্তন হয় পুরুষের মানসিকতা? এ প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।
আজকে সর্বজনস্বীকৃত আমাদের দেশে আইন আছে প্রয়োগ নেই। আমরা দেখে আসছি, দেশে সমাজ সচেতনতার জন্য অনেক কর্মকা- সংঘঠিত হয়। কিন্তু জনসচেতনা সৃষ্টি হতে দেখা যায় না। অন্যসব ক্ষেত্রের মত এ ক্ষেত্রেও একধরনের ব্যাধি আঁকড়ে ধরে রাখছে আমাদের। শত চেষ্টার পরেও আমরা পরিত্রাণ পাচ্ছি না এসব ভয়াবহ ব্যাধি থেকে। পরিবার থেকে শুরু করে সংখ্যায় কম হলেও উচ্চপর্যায় পর্যন্ত প্রায় সকল কর্মে নারীরা নিয়োজিত। এককথায় পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও নারীর রয়েছে বিশাল অবদান। তারপরেও নারী আজ সর্বক্ষেত্রেই নিগৃহীত, নির্যাতিত, বঞ্চিত ও হচ্ছে অবহেলিত। ভোগবাদী পুরুষরূপী দানবরা এমন কোনো কাজ নেই যা নারীদের দিয়ে করায় না, করাচ্ছেনা। শুধু তাই নয়, একশ্রেণীর স্বার্থান্ধ পুরুষের পাশাপাশি নারী হয়ে নারীরাও নারীর অধিকার-আন্দোলনের নামে ফায়দা লুটে নিচ্ছে দেশ-বিদেশে।
আমাদের সংবিধানের ২৮(১), ২৮/২, ও ২৮(৪) উপধারায় সুস্পষ্টভাবে উল্লে¬খ রয়েছে নারী-পুরুষের সমতা, সমাধিকার ও সমমর্যাদার কথা। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সম্পদের মালিকানা, নীতি নির্ধারণ ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, শ্রমশক্তি ও নারীশ্রমের মূল্যায়ণ, নিরাপত্তাহীনতা, নির্যাতন ও সহিংসতাসহ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্র বিবেচনায় বাংলাদেশে এখন নারী-পুরুষের ব্যাপক বৈষম্য লক্ষ করা যায়। কি আপন, কি পর, কি নিজের ঘর, কি নিজের কর্মক্ষেত্র আজ সর্বক্ষেত্রেই নারী দলিত-মথিত, নির্যাতিত ও অহরহ যৌন হয়রানির মত নিকৃষ্টতায় এক অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইভটিজিং-যৌন নিগৃহ নিয়ে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ (২) ধারায় বলা হয়েছে,‘কোনও পুরুষ অবৈধভাবে তার যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে কোনও নারীর শ্লীলতাহানী করলে বা অশোভন অঙ্গভঙ্গি করলে তার জন্য এ কাজ হবে যৌন হয়রানী এবং এ জন্য ওই পুরুষকে অনধিক ৩ থেকে ৭ বছর সশ্রম কারাদ- এবং এর অতিরিক্ত অর্থ দন্ডে দন্ডিত হতে হবে।’ এছাড়াও নারীর অধিকার রক্ষায় সম্প্রতি বেশ কিছু আইন প্রণয়নসহ বহু আইন রয়েছে আমাদের সংবিধানে। কিন্ত তারপরেও দেশে এসব ঘৃণিত অপরাধের সংখ্যা গাণিতিক হারে বেড়েই চলছে। এ ভয়াবহ ব্যাধি থেকে মুক্তির যেন সকল পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে এখন।
পরিশেষে আমার বক্তব্য পরিষ্কার করছি যে, আল্লাহ প্রদত্ত আইন-কানুন জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ ব্যতীত কোন আন্দোলনই সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে না-এটা আমাদের বুঝতে হবে। আমাদেরকে প্রথমে ব্যক্তি জীবনে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলার চর্চায় অভ্যস্ত হতে হবে। পর্যায়ক্রমে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী তথা সমাজের সকলের নিকট ইসলামের অমিয় বাণী পৌঁছাতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, “তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছ আর কিছু অংশ পরিত্যাগ করেছ? তোমাদের মধ্য হতে যারা এরূপ করবে তাদের শাস্তি পার্থিব জীবনে লাঞ্চনা-গঞ্জনা ছাড়া কিছু নয়, আর পরকালে তাদের কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে”। মূলকথা, ইসলামের সত্য ও সুন্দর সঠিক পথ পরিহার করে কেউ মুক্তি পেতে পারে না। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব। এরই অর্ধ্বোংশ নারী। এই নারী সমাজকে পতিতদশা ও পাশবিকতার হাত রক্ষা করতে হলে কুরআনি আইনের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

Check Also

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট : বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন

  কুমিল্লাওয়েব ডেস্ক:– আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন। ১৯৭৫ ...

Leave a Reply