হরতালের বিকল্প মাধ্যম গুলোকে প্রতিবাদে ব্যবহার করা উচিত—-আবদুর রহমান

ab
হরতাল কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না বরং দেশ ও জনগণকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। বিরোধী দলের প্রতি অনুরোধ আপনারা হরতালের নামে রাজপথ ব্যবহার না করে সংসদে যান। আর সরকারের দায়িত্ব হবে বিরোধী দলের সংসদে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করা। গণতন্ত্র হরতালের নামে মানুষ হত্যার কথা বলে না। হরতাল স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করতে হয়। মানুষের গাড়ি ভাংচুর করে, ইটপাটকেল ছুড়ে কিছু ভাড়াটে মানুষ দিয়ে হরতাল পালন সাধারণ মানুষ সমর্থন করে না।
গণতান্ত্রিক পন্থায় হরতালকে (প্রতিবাদ) কোনোভাবেই অসাংবিধানিক বলা যাবে না। কারণ সাংবিধানিকভাবে এর ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই বলা যায় বাংলাদেশে হরতাল হচ্ছে সাংবিধানিক পন্থায়। যে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন সফল তখনই হয় যখন সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় সেই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। আবার জনগণ তখনই আন্দোলনের সঙ্গে মিশে যায় যখন দেখা যায় জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন হয়। হরতাল-অবরোধের মধ্য দিয়েই তো ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। তবে এ কথাও সত্য, হরতাল দেশের অর্থনীতিকে স্থবির করে দেয়। হরতালের নামে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাংগঠনিক স্ট্রাকচারটাকে ভেঙে দেয়। হরতালে সরকারের অর্থনীতির কোনো ক্ষতি হয়। তবে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। হরতাল অবশ্যই দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে। তাই হরতাল দেয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরো চিন্তাভাবনা করা উচিত। প্রতিবাদ করা অবশ্যই গণতান্ত্রিক অধিকার; কিন্তু প্রতিবাদের নামে হরতাল কারোর কাম্য নয়। আমাদের দেশকে বলা হয়ে থাকে গণতান্ত্রিক দেশ। আর রাজনীতিবিদদের বলা হয়ে থাকে দেশের ধারক ও বাহক। যাদের নির্দেশ এবং পরামর্শে দেশ পরিচালিত হয়ে থাকে। অনেক রক্ত এবং ত্যাগের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন করা হয়েছে, আমরা লাল-সবুজের পতাকা অর্জন করেছি। আর সেই স্বাধীন সার্বভৌম দেশটির মেরুদন্ড বারবার ভেঙে যাচ্ছে যখন হরতালের মতো একটি ভাইরাসকে রাজনৈতিক দলগুলো যত্রতত্র ব্যবহার করছে। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা ভালো করেই জানেন যখন তখন হরতাল দেয়ার ফলে সাধারণ মানুষের কাছে হরতালের গুরুত্ব হারাচ্ছে। হরতাল দিয়ে হয়ত দাবি আদায় করা যায়; কিন্তু হরতালের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় দেশ ও জনগণেরই ক্ষতি হয়। হরতালের কারণে দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে শুরু করে গোটা দেশই অচল হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল দিয়ে রাজপথে ভাংচুর করে, ট্রেন, বাস, জ্বালাওপোড়াও করে এমনকি এতে অনেক প্রাণহানিও ঘটে। একই দিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যারা এই হত্যার শিকার হয় তাদের কী অপরাধ? আমরা আসলে রাজনীতিবিদরা অনেক কিছু বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকি। পুলিশের বেপোরোয়া গুলি বর্ষনের কারণে ও বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ফলে একই দিনে নিহতের সংখ্যা রেকর্ড গড়েছে। পুলিশ বলছে আত্বরক্ষার্তে গুলি করছে। এক টানা পুরো সপ্তাহ হরতাল মনে হয় পুর্বের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ফলে ধ্বংস হচ্ছে আমাদের অর্থনীতি। নিজেদের দলীয় আক্রোশ মেটাতে ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে একে অন্যের প্রতি মিথ্যাচার দোষারোপ করে। মাইক এবং ক্যামেরার সামনে বড় বড় কথা বলে তারা। জনগণের ভোট পেয়ে এসি গাড়ি-বাড়ি পেয়ে জনগণের কথা ভুলে গেলে চলবে না; কারণ শেষ বিকালে ওই জনগণের কাছেই আসতে হবে। জনগণ ভোট দিয়ে আপনাদের সংসদে পাঠায় আইন পাস করতে এবং সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করতে; কিন্তু আপনারা সংসদ ব্যবহার না করে হরতালের মতো ভাইরাসকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে জ্বালাও-পোড়াও করে দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। আগে জন সম্পৃক্ততা তৈরি করুন তারপর হরতাল দিন। মানুষ আর কোনো বিকল্প না পেয়ে বারবার আপনাদের কাছেই ফিরে আসে। আর আপনারা সেই সুযোগের যথেষ্টই অপব্যবহার করছেন। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় এলে হরতালের বিরোধিতা করে, আর বিরোধী দলে গেলে হরতালকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ক্ষমতায় থাকাকালীন হরতাল মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে না, হরতাল দেশকে ধ্বংস করছে ইত্যাদি বড় বড় কথা বলে থাকে। আর বিরোধী দলে গেলে সেই ধ্বংসাত্মক হরতালকেই ব্যবহার করছেন তারা। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯১-১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন, ১৯৯৬-২০০১ এ বিএনপি ৫৯ দিন ও ২০০১-২০০৬ আওয়ামী লীগ ১৩০ দিন হরতাল ডেকেছে। আর বর্তমান সরকারের সময় বিএনপি হরতাল ডেকেছে ঐ তুলনায় কম। বাংলাদেশের ইতিহাসে হরতাল কত হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য কারো কাছে নেই। ‘৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও হরতালই কাজ করেছে গণতন্ত্রের মুক্তির অস্ত্র হিসেবে। এ দেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোটাইজুড়ে রয়েছে হরতাল-ধর্মঘট। বিভিন্ন দৈনিকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে কমপক্ষে ৪৩৩টি পূর্ণদিবস ও ৫৭৯টি অর্ধদিবস হরতাল মিলে মোট ১০১২টি হরতাল পালিত হয়েছে। এ রকমের ২০০৭ সাল পর্যন্ত লাগাতার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল হরতাল পালন করে আসছে। ২০০৭ সালে এসে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকায় কোনো হরতাল পালিত হয়নি। ওয়ান-ইলেভেনের পর মনে হয়েছিল আমরা অন্তত ধ্বংসাত্মক রাজনীতি থেকে রেহাই পাব। কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। আর এখন যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা বিরোধী দলে গেলে আবারো এই মরণব্যাধি হরতালকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন। তাতে মোটেও ভুল হবে না। এটি আসলে আমাদের দেশে একটি কালচারে পরিণত হয়ে গেছে। ইউএনডিপির একটি রিপোর্টে ২০০৫ সালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ১৯৯০-১৯৯১ অর্থবছর থেকে হরতালের কারণে প্রতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গড়ে ক্ষতি হয়েছে ৮৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। যা বাংলাদেশের মতো একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের পক্ষে বিরাট ঝুঁকি। নির্বাচিত সব এমপির মহান সংসদে গিয়ে জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলাটা দায়িত্ব। সংসদে যেতে তো কোনো বাধা-নিষেধ নেই। কিন্তু কেন বিরোধী দল সংসদে যায় না? আর সংসদে না গিয়ে সরকারের (জনগণের ট্যাক্সের টাকায়) গাড়ি-বাড়ি এবং বেতন-ভাতা ভোগ করবেন তা তো হয় না; দাবি আদায়ের জন্য তো সংসদ রয়েছে, তাহলে কেন রাজপথ? সংসদ হচ্ছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যারা বিরোধী দলে আছেন তারা বলছে সংসদে যাওয়ার পরিবেশ তৈরী করতে পারেনি সরকার। সংসদে গিয়ে আলোচনা না করে আমরা রাজপথে জ্বালাও পোড়াও করি। এতে আমাদের ক্ষতি ছাড়া লাভ মোটেও হয় না। জনগণের ট্যাক্সের টাকা ভোগ করে জনগণের উপকারে যদি নাই আসেন, তাহলে এসি গাড়ি-বাড়ি এবং বেতন-ভাতা দয়া করে ভোগ করবেন না। হরতালের সঠিক ব্যবহারের জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায় নয়, স্থানীয় পর্যায়েও এর অংশগ্রহণ থাকতে হবে। রাজনীতিবিদদের সংসদমুখী হতে হবে। সংসদকে কার্যকর ও সুন্দর করে তুলুন। হরতাল কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না বরং দেশ ও জনগণকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। বিরোধী দলের প্রতি অনুরোধ আপনারা হরতালের নামে রাজপথ ব্যবহার না করে সংসদে যান। আর সরকারের দায়িত্ব হবে বিরোধী দলের সংসদে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করা। গণতন্ত্র হরতালের নামে মানুষ হত্যার কথা বলে না। হরতাল স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করতে হয়। মানুষের গাড়ি ভাংচুর করে, ইটপাটকেল ছুড়ে কিছু ভাড়াটে মানুষ দিয়ে হরতাল পালন সাধারণ মানুষ সমর্থন করে না। আদালতের রায়ে হরতাল মৌলিক অধিকার হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, মানুষের স্বাধীনভাবে চলাফেরা সংবিধানে স্পষ্টভাবে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া, মানুষকে জিম্মি করে হরতাল দেয়া মানুষের মৌলিক অধিকারকে হরণ করে। গণতন্ত্রের মুখপাত্র না হয়ে হরতাল এখন গণতন্ত্র বিনাসী ক্যান্সারের জীবাণু বহন করছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে পক্ষপ্রতিপক্ষ থাকবে। কিন্তু প্রতিপক্ষের নামে তাদের কণ্ঠরোধ করা মোটেই কাম্য নয়। আমরা আর প্রতিহিংসা রাজনীতি দেখতে চাই, দেখতে চাই সুন্দর একটি বাংলাদেশ! তাই প্রতিবাদে হরতালের বিকল্প মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করা উচিত। সংসদের বিকল্প রাজপথও নয় আর হরতালও নয়। হরতাল আমাদের কল্যাণ বয়ে আনে না বরং হরতাল মানুষ এবং দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। বিরোধী দলের প্রতি অনুরোধ আপনারা হরতালের নামে রাজপথ ব্যবহার না করে সংসদে যান। আর সরকারের দায়িত্ব হবে বিরোধী দলের সংসদে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করা। তা না হলে দেশ একদিন সত্যিকারই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। যার কারণে রাজনীতিবিদরাই জনতার কাছে জবাবদিহিতার মধ্যে পড়বেন। জনতার রোশানলে পড়ে নিজেদের প্রাণ রক্ষার জন্য হায় হুতাশ করবেন। তাই অনুরোধ আর রাজপথ নয়; হরতালের বিকল্প সংসদ। আসুন দেশ এবং জনগণের স্বার্থে রাজপথকে ব্যবহার না করে আমরা সংসদকে কার্যকর করি। সংসদে বিরোধী দলের যাওয়ার পরিবেশ তৈরী করে দেই। বিরোধীদল বিহীন সংসদে যেন কোন বিল পাস নায় হয় সেই আইন পরিচালনায় অভ্যস্ত হই। তাহলে আমাদের দেশের স্বাধীনতার স্বাদ পাব সকলেই। আসুন সরকারী দল ও বিরোধীদল মিলেমিশে হরতালের বিকল্প চিন্তা করি।

লেখক–আবদুর রহমান,
শিক্ষার্থী, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিস বিভাগ(এমবিএ)
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা।
মোবাইল-০১৫৫২-৪৬৩৬১১

Check Also

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট : বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন

  কুমিল্লাওয়েব ডেস্ক:– আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন। ১৯৭৫ ...

Leave a Reply