তেরজনের মধ্যে ছয়জন চিকিৎসকই অনুপস্থিত: সরাইল হাসপাতাল দালাল আর পকেটমার চক্রের দখলে

সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধিঃ—
সরাইল ৫০ শয্যার হাসপাতাল এখন দালাল আর পকেটমারদের দখলে। সরকারি হাসপাতালের আশপাশে গড়ে উঠেছে বেশকয়েকটি প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক। যার অধিকাংশের বৈধ কোন কাগজপত্র ও দক্ষ চিকিৎসক নেই। সরকারি হাসপাতাল থেকে এসব প্রতিষ্ঠানে রোগী বাগিয়ে নেওয়ার কাজে নিয়োজিত রয়েছে বেশকিছু দালাল। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করে আসছেন সরকারি হাসপাতালে কর্মরত কতিপয় চিকিৎসক ও কর্মচারীরা। হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন নিত্যদিন। হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ঘটছে পকেটমারের মত জঘন্য অপরাধমূলক ঘটনা। কর্তব্যরত অনেক চিকিৎসক কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই হাসপাতালে অনুপস্থিত থাকেন প্রায় দিন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, এখানে চিকিৎসকের পদ রয়েছে ২১টি। কর্তব্যরত আছেন মাত্র ১৩ জন। অনেক চিকিৎসক নিয়মিত হাসপাতালে আসছেন না।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় দেখা যায়, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শতাধিক রোগী চিকিৎসকদের অপেক্ষায় রয়েছেন। খোঁজ নিয়ে যায়, কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ছুঁটিতে আছেন জুনিয়র মেডিসিন কনসালটেন্ট আহসানুল হক কাউছার। পূর্ব অনুমতি না নিয়ে হাসপাতালের কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন পাঁচজন চিকিৎসক। তারা হলেন- শিশু বিশেষজ্ঞ জসিম উদ্দিন, চিকিৎসা কর্মকর্তা (মেডিকেল অফিসার) নাছির উদ্দিন, কানিছ ফাতেমা, মাহবুবুল আলম ও সিফাতই মাহবুব। সরাইল সদরের উচালিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মোঃ মিনার মিয়া জানান, স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে তিনি সকাল থেকে চিকিৎসকের অপেক্ষা করছেন। চিকিৎসক না আসায় এখন চিকিৎসাসেবা ছাড়াই তারা বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। কালীকচ্ছ এলাকার মনোয়ারা বেগম জানান, তিনি শিশুর চিকিৎসা করাতে টিকেট নিয়ে বসে আছেন। চেম্বারে চিকিৎসক নেই। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আর.এম.ও) মোঃ নোমান মিয়া জানান, আজকে (বৃহস্পতিবার) রোগীর চাপ বেশি। চিকিৎসা সেবা দিতে আমাদের (উপস্থিত চিকিৎসকদের) হিমশিম খেতে হচ্ছে। রোগীর স্বজনসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী জানান, হাসপাতালে পকেটমারদের দৌরাত্ম বেড়েছে। গত বুধবার উপজেলার কুট্টাপাড়া গ্রামের শিরিনা বেগম চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসেন। পকেটমাররা তার ব্যাগ থেকে পাঁচশ’ টাকা নিয়ে যায়। মঙ্গলবার চিকিৎসা নিতে আসা কালীকচ্ছ গ্রামের হনুফা বেগমের কাছ থেকে পাঁচশ’ টাকা এবং শাহবাজপুর এলাকার শরিফা বেগমের এক হাজার টাকা নিয়ে যায় পকেটমার চক্র। সরকারি হাসপাতালের জুনিয়র মেকানিক মোহাম্মদ আলী খোকন প্রায় ৩০ বছর যাবত এখানে কর্মস্থলে আছেন। তার বাড়ি হাসপাতালের অতিনিকটে। তিনি বৈধ কোন কাগজপত্র ছাড়াই বাড়িতে ‘ইনসাফ মেডিকেল সেন্টার’ নামে একটি ক্লিনিক খুলে বাণিজ্য করছেন। মানুষের স্বাস্থ্যসেবার নামে করে যাচ্ছেন প্রতারণা। বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষা রিপোর্টে নাম সর্বস্ব প্যাথলজিষ্ট ও টেনিশিয়ানের সীল ব্যবহার করে স্বাক্ষর করছেন তিনি নিজেই। অনেকে স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। সরকারি হাসপাতালের একজন প্রভাবশালী চিকিৎসকের মদদে তিনি নির্ভয়ে এই অবৈধ ক্লিনিক চালিয়ে যাচ্ছেন। সরাইল হাসপাতালের জুনিয়র মেকানিক মোহাম্মদ আলী খোকন দাবি করেন, ইনসাফ মেডিকেল সেন্টারের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। আর এসব তার ১৯ বছর বয়সী ছেলের নামে। তিনি জানান, দীর্ঘ আট বছর যাবত এই প্রতিষ্ঠানটি সুনামের সাথে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। এখানকার সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ জেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তার এই ক্লিনিক সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে। সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোঃ জহিরুল হক জানান, অনুপস্থিতি বিষয়ে জানতে ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে হাসপাতালে চিঠি এসেছে। বৃহস্পতিবার পাঁচজন চিকিৎসক কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানানো হবে। হাসপাতালে দালালসহ সকল অনিয়মের বিষয়ে এ কর্মকর্তা জানান, তিনি এখানে সদ্য যোগদান করেছেন। খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply