‘একুশে পদক’ ভাষা সৈনিকদের অধিকার —–মো. আলী আশরাফ খান

Ali ashraf khan,Daudkandi
একুশে পদক ও ভাষা সৈনিকদের সম্মান প্রসঙ্গে আমি বিগত বেশ কয়েক বছর যাবত লেখালেখি করে আসছি। শুধু আমি-ই নই, দেশের বহু খ্যাতিমান লেখক এ বিষয়ে লিখেছেন-লিখছেন। কিন্তু এসব লেখালেখিতে সংশ্লীষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান বা সরকারের উল্লেখযোগ্য চিন্তার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি-হচ্ছে না। তারপরেও ভাষাপ্রেম ও ভাষাসৈনিকদের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসার তাড়নায় এ লেখা।
এ অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আমরা বরাবরই বলেছিলাম, একুশে পদক মানে ভাষা নিয়ে যারা সংগ্রাম করেছেন তাদেরই অধিকার, তাদেরই প্রাপ্য সম্মান। অর্থাৎ যারা ভাষাসংগ্রামের সময় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেনে মাতৃভাষা বাংলার জন্য এবং যারা বেঁচে আছেন তাদের কথাই বলছি। অবশ্য পরবর্তীতে যারা বাংলা ভাষাচর্চায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন, রাখছেন তাদের ক্ষেত্রেও এ গুরুত্বপূর্ণ পদকটি প্রযোজ্য বলে আমরা মনে করি। কিন্তু আমাদের সরকার স্বাধীনতার পর অর্থাৎ ১৯৭৬ সাল থেকেই এ পদকটির সঠিক ব্যবহার করতে সক্ষম হয়নি। যে সরকার ক্ষমতায় এসেছেন সেই সরকারই সিংহভাগ ক্ষেত্রে দলীয় লোকদের একুশে পদক প্রদান করছেন।
যার ফলে এ পদকটির গুরুত্ব অনেকাংশে কমে গেছে। সংশ্লীষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান ও সরকারের বোঝা উচিৎ ছিল, আমাদের সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বহু পদক চালু রয়েছে এ দেশে। প্রয়োজনে আরো পদক সংস্কৃতি চালু হতে পারে। সরকার চালু করতে পারে ভিন্ন নামে ভিন্ন সম্মাননা পদক। কিন্তু একুশে পদককে সরকার যে লেজেগোবরে করে ফেলছে, এটা কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপেরই বিষয়। শুধু তাই নয়, আমরা মনে করি আমাদের ভাষা ও ভাষা সংগ্রামের প্রতি এটি একরকম অসম্মান ও উদাসীনতার বহি:প্রকাশ।
এ ক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি ভিন্ন রকম। সরকার গত দুই বছর আগে বলছেন, ধারাবাহিকভাবে সকল ভাষাসৈনিককেই এ পদক প্রদান করা হবে। প্রতি বছর ২/৪ জন করে সকল ভাষাসৈনিককেই এ পদক দেয়া হবে এবং জীবিত সকল ভাষাসৈনিকদের ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে যারা এখনো জাতীয় পদক পাননি, তাদেরকে একুশে স্মারক প্রদান করা হবে। একুশে স্মারক প্রস্তাবনার জন্য একুশে চেতনা পরিষদ কর্তৃক ৪ সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়েছিল দুই বছর পূর্বে। তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ৯টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও নিয়েছিল এ কমিটি।
কিন্তু ভাষার সংগ্রামের ৬১ বছর পেরিয়ে গেলেও এর সিংহভাগ সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে নানা রকম প্রশ্ন উদয় হয়েছে। এখানে সরকার জীবিত ভাষা সৈনিকদের ব্যাপারে যে একুশে স্মারকের কথা বলেছেন, এবিষয়টির সঙ্গে আমরা একমত হতে পারিনি। কারণ, আমরা মনে করি, বিগত দিনে যে সব ভাষা সৈনিকরা একুশে পদক পেয়েছেন এবং বর্তমানে জীবিত আছেন যারা তাদের ক্ষেত্রে ওই সিদ্ধান্তটি বরাবরই দ্বৈতনীতির প্রকাশ বলে আমরা মনে করি। সুতরাং জীবিত সকল ভাষা সৈনিকদের একই সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব একুশে পদক প্রদান করাই হবে যুক্তিযুক্ত ও যথাযথ সম্মানের। মরণোত্তর সম্মাননা প্রদানের যে বিষয়টি, এটি আমাদের কারই কাম্য নয়। এমটি যেন কারো ক্ষেত্রেই না ঘটে-এটি সকল সচেতন মানুষের দাবি। আমরা মনে করি, গত দুই বছর পূর্বে হাইকোর্ট যেসব সিদ্ধান্ত দিয়েছিল ওইসব সিদ্ধান্তসমূহ সরকার দ্রুত বাস্তবায়নের ব্যবস্থা এবং ভাষাসৈনিকদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করলে জাতি উপকৃত হবে। ভাষার প্রতি সকল মানুষের আন্তরিকতা বাড়বে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে নতুন প্রজন্ম।

লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা ।
ই-মেইল: khan_sristy@yahoo.com

Check Also

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট : বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন

  কুমিল্লাওয়েব ডেস্ক:– আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন। ১৯৭৫ ...

Leave a Reply