সরাইলে তিতাস নদীতে অর্ধশতাধিক চর প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে

sarail pic 22-2-13= (2)আরিফুল ইসলাম সুমন, স্টাফ রিপোর্টার ব্রাহ্মণবাড়িয়াঃ—
প্রমত্ত তিতাস আজ ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। নদীতে দেখা দিয়েছে চর। শুকিয়ে গেছে নদীর পানি। নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকায় শত শত নৌযান আটকা পড়ে আছে। আয় রোজগার বন্ধ থাকায় কয়েক হাজার নৌযান শ্রমিক মানবেতর জীবনযাপন করছে। ব্যবসা বাণিজ্যে নেমে এসেছে ধস। আর্থিকভাবে লোকসানে পড়ে এলাকার নৌযান মালিক ও ব্যবসায়ীরা এখন দিশেহারা। আর এসবে প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে। এলাকাবাসী জানান, সরাইলে তিতাস নদীর তীরবর্তী অরুয়াইল-পাকশিমুল এলাকায় গড়ে উঠেছে অঘোষিত একটি নৌবন্দর। এখানে মালবাহী প্রায় চার শতাধিক (ষ্টীল দিয়ে তৈরী) নৌযান রয়েছে। পাথর, কয়লা, লোহা জাতীয় পদার্থ, ইটসহ ইত্যাদি ভারী মালামাল বহনকারী এসব নৌযানে এলাকার অন্তত তিন হাজার শ্রমিক কর্মরত থেকে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। অরুয়াইল ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসিফ ইকবাল খোকন জানান, খননের অভাবে তিতাস নদী শুকিয়ে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এখানকার শত শত নৌযান শ্রমিক তাদের রুটিরুজি থেকে বঞ্চিত। ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বেকায়দায়। সড়ক পথে মালামাল পরিবহনে তাদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে। অরুয়াইল ষ্টীল বডি নৌযান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী মোঃ রেহান উদ্দিন জানান, তাদের সমিতির অধীনে চারশ’র অধিক ষ্টীলের নৌযান রয়েছে। নৌ শ্রমিক আছেন প্রায় তিন হাজার। একেকটি নৌযানের ধারণ ক্ষমতা তিনশ’ থেকে পাঁচশ’ মেট্টিক টন। তাছাড়া পাশ্ববর্তী পাকশিমুল এলাকার সমিতির অধীনে এ ধরণের অন্তত অর্ধশতাধিক ষ্টীল বডির নৌযান আছে। এসব নৌযান থেকে সরকার প্রতিবছর কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছে। তিনি আরো জানান, এখানকার তিতাস নদীর বিভিন্ন অংশে ছোট বড় অন্তত ৫০টিরও বেশি চড় দেখা দিয়েছে। বর্ষাকালে এ নদী দিয়ে সীমিত আকারে ভারী নৌযান চলাচল করলেও বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর পৌষ মাস থেকে বৈশাখ পর্যন্ত এ পাঁচমাস তিতাস নদীতে নৌযান চলাচল একেবারে বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে সবচেয়ে বেশি দূর্ভোগ পোহাতে হয় নৌযান শ্রমিকদের। তাছাড়া তেলের দামও দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নৌযান মালিকদের মাঝে অর্থনৈতিক মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। নৌযান মালিক অরুয়াইলের রাণীদিয়া গ্রামের মোঃ কামাল মিয়া জানান, ক’বছর আগে প্রায় ৮০ লাখ টাকা ব্যায়ে তিনি একটি ষ্টীল বডির নৌযান তৈরী করিয়েছেন। যার ধারণ ক্ষমতা পাঁচশ’ মেট্টিক টন। এই নৌযান থেকে শ্রমিক খরচ বাদে তার মাসিক আয় হয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। নৌযানটি পরিচালনা করেন ছয়জন শ্রমিক। এদের মধ্যে সুগানি (নৌযানের পাইলট) মাসে বেতন পান ১০ হাজার টাকা, তার সহকারি সাত হাজার টাকা, ইঞ্জিন ড্রাইভার সাত হাজার টাকা, দুইজন লস্কর (নোঙ্গর উঠানামা ও নৌযানের পরিচর্যার দায়িত্বে নিয়োজিত) প্রত্যেকের বেতন পাঁচ হাজার টাকা করে ও বাবুর্চি’র বেতন ছয় হাজার টাকা। তিনি জানান, তিতাস নদীর নাব্যতা সঙ্কটের কারণে নৌযান চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে আয়ের বদলে এখন লোকসান গুনতে হচ্ছে। নদীতে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক মালিককে ব্যাংক ঋণ পরিশোধে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নৌযান পাইলট (সুগানি) মোঃ দানিছ মিয়া, ড্রাইভার আল আমিন, নৌযান লস্কর মোঃ রফিকুল ইসলামসহ একাধিক শ্রমিক জানান, তিতাস নদীতে অসংখ্য চর। পানি শুকিয়ে যাওয়ায় নদীতে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় আয়-রোজগার না থাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে বিপাকে আছেন তারা। অরুয়াইল এলাকার ষ্টীল নৌযান বডি (মিস্ত্রী) প্রস্ততকারক মোঃ ছায়েদুর রহমান জানান, একটি ষ্টীল বডি নৌকা তৈরী করতে ২৫-৩০ জন শ্রমিকের রাতদিন কমপক্ষে তিন থেকে সাড়ে তিনমাস সময় লাগে। মজুরি (প্রকারভেদে) তিন থেকে চার লাখ টাকা। তিনি জানান, নদীর পানি কমে যাওয়ায় নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে নির্মাণ ও নৌযান মেরামত কাজে নিয়োজিত লোকদের এখন দুর্দিন যাচ্ছে। অরুয়াইল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ মিজানুর রহমান জানান, এই নদীতে দীর্ঘ দিন যাবত এ অবস্থা চলে আসছে। নদী খননে সংশ্লিষ্টরা কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না। ফলে তিতাস নদীর বিভিন্ন অংশে একের পর এক চর দেখা দিয়েছে। বছরের পাঁচমাস (শুস্ক মৌসুমে) এ নদীতে নৌযান চলাচল একেবারে বন্ধ থাকে। এতে এখানকার অর্থনীতিতে বড় ধরণের প্রভাব পড়ছে। পাকশিমুল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কাজী মোজাম্মেল হক জানান, তিতাস নদীর অনেকাংশ ভরাট হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নৌপথ। এতে এলাকায় বেকার জনগোষ্ঠির সংখ্যা বাড়ছে। জরুরিভিত্তিতে এই নদী খনন করা প্রয়োজন। সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান খান জানান, গুরুত্বপূর্ণ এই নদী খননে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তাছাড়া স্বেচ্ছাশ্রমে নদী খননে এলাকার লোকদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

Check Also

কুমিল্লায় তিন গৃহহীন নতুন ঘর পেল

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ– কুমিল্লা সদর উপজেলায় গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে ৪নং আমড়াতলী ইউনিয়নের গৃহহীন নুরজাহান বেগম, ...

Leave a Reply