শুভ সংস্কৃতি ও ভ্যালেন্টাইন ডে-অপসংস্কৃতি——-মো. আলী আশরাফ খান

Ali ashraf khan-13.02.13
আমাদেরকে প্রথমে বুঝতে হবে সংস্কৃতি বলতে কি বোঝায়। সংস্কৃতি হলো কোন জাতি-গোষ্ঠির জীবনযাপনের ক্ষেত্রে পরিশীলন-পরিমার্জন, সু-সম্পাদন কিংবা উত্তমরূপে কোন কর্মের পরিসম্পাদন। প্রত্যেক গোষ্ঠী-জাতি ও দেশেরই থাকে নিজ-নিজ সংস্কৃতি, হোক তা শুভসংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতি। সংস্কৃতি-শুভসংস্কৃতি বলতে আমরা যা বুঝি, উন্নত চিন্তাচর্চা, দৃশ্যচর্চা ও কর্মচর্চার মাধ্যমে সুনিবিড় ও সুশীতল সমাজ গঠন এবং একে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্রত গ্রহন।
প্রত্যেক জাতিরই স্ব-স্ব চিন্তার দ্বারা নিজেদের জীবন চালনার জন্য কিছু কিছু উল্লে¬খযোগ্য স্বকীয়তা থাকে, যেসব চর্চার মধ্যদিয়ে নিজেদের কৃষ্টি-কালচার ফুটে ওঠে এবং সে জাতি কতটা উৎকর্ষতার সঙ্গে সভ্যতা বহন করে তা তাদের চিন্তা-চেতনায়, আচার-আচরণে এবং পোশাক-পরিচ্ছদে প্রকাশ পায়। এসব বিষয়গুলোয় যে জাতি যতটা পরিচ্ছন্ন ও উন্নত সে জাতি ততটা সুখী-সমৃৃদ্ধশালী এবং শান্তি-শৃংখলার দিক দিয়েও দৃষ্টান্ত স্থাপন এবং নিজেদেরকে সভ্যতার চালিকাশক্তিরূপে বিশ্বমাঝে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু অত্যন্ত দু:খের ব্যাপার, আমরা যদি বিশ্বের দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে, কোন দেশই সংস্কৃতির দিক থেকে পরিশুদ্ধতার চর্চায় উন্নত নয়। যতরকম কুসংস্কার, যারপরনাই নষ্টামি-বেহায়াপনা, ভ্রান্তধারণা প্রসূত অপসংস্কৃতিকেই মানুষ সংস্কৃতি বা কখনও কখনও আধুনিক সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দিচ্ছে। দেশে-দেশে, জাতিতে-জাতিতে, গোষ্ঠীতে-গোষ্ঠীতে সর্বোাপরি পরিবার-ব্যক্তি পর্যায়েও দিব্যি এসবের চর্চা চলছে।
যদিও আমরা দাবি করছি, আমরা উন্নত হচ্ছি। আসলে আমরা দিনে দিনে প্রকৃত সংস্কৃতি থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। বর্তমানে যে সংস্কৃতির চর্চা আমাদের মধ্যে বিদ্যমান, তা নিঃসন্দেহে বিশ্বমানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা যেহেতু মুসলমান হিসেবে দাবি করি, সেহেতু মুসলিম সংস্কৃতিকই আমাদের সংস্কৃতি-এটা আমাদের মানতেই হবে। আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে মানবজাতির হেদায়েতের কা-ারী সাইয়েদুল মুরসালিন হযরত মুহাম্মদ (সা.) যে সংস্কৃতি আমাদের জন্য উপহার দিয়ে গেছেন, এরচেয়ে বিশুদ্ধ-উন্নত যুগোপযোগী বড় সংস্কৃতি আর কিবা হতে পারে? সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আধুনিক মানুষটি কি তাঁর জীবনের দীর্ঘসময় ৬৩ বছরের পরিক্রমায় আমাদেরকে দান করে যাননি, কিভাবে জীবন যাপন করলে মানুষ সর্বোত্তম ও উৎকর্ষতার স্বাদ গ্রহণ করবে? মানুষ জন্ম লাভের পর যতো দিন এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে এর এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যে, বিশ্বমানবতার পথ-পর্দশক প্রিয় নবী (সা.) আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়ে যাননি। তবে কেনো আবার নতুন করে আমাদেরকে সংস্কৃতিকে নিয়ে ভাবতে হবে?
আজ বিশ্ববাসী এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে চারদিকেই অপসংস্কৃতির হলিখেলার করালগ্রাসে বিপর্যস্ত। দস্তুরমত আমাদেরকে এখন মানুষ নামের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিশ্বে এমন কিছু জাতি-গোষ্ঠী আধুনিকতার নামে চরম বেহায়াপনায় লিপ্ত রয়েছে, যারা শক্তি-সামর্থ্য ও অর্থনীতিক দিক দিয়ে আমাদের চাইতে বহুগুনে এগিয়ে রয়েছে। এককথায়, তাদের কাছে আজ আমরা জিম্মি। বিভিন্নভাবে সাহায্য ও সহযোগিতার নামে তারা আমাদের স্বকীয়তা, দেশপ্রেম ও মানবতাবোধ সর্বোপরি স্বজাতীয় সংস্কৃতিকে গলাটিপে হত্যা করছে এবং আমাদের মধ্যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে ঢুকিয়ে দিচ্ছে তাদের অপসংস্কৃকিগুলো। এই বিষাক্ত সাপের ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছেনা শিশু-কিশোরী, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে আমাদের বৃদ্ধারাও। আকাশ সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতিকে এমনভাবে আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, যা বিষাক্ত ভাইরাস হয়ে ঢুকে পড়ছে শিরায়-উপশিরায়। ডিস চ্যানেলগুলোতে এখন মানবিক বোধ বা চেতনার লেশমাত্র নেই; যৌন সংগম, নারীর উন্মুক্ত বক্ষ, অশ্লীল নৃত্য, পৈশাচিক উন্মাদনার লোমহর্ষক খুনের চিত্রগুলো আমাদের মাঝে অপরাধ প্রবণতা দিনে দিনে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিনোদনের নামে কম্পিউটার গেম ও টেলিভিশনের সিরিজের প্রতি আকর্ষণ প্রকারান্তরে সমাজে ব্যাপক হিংসাত্মক মনোবৃাত্তি ও হৃদয়হীন আচার-আচারণের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন এগুলো দেখার ফলে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের উপর বেশি প্রভাব পড়ছে। সিংহভাগ শিশুরা পারিবারিক ভায়োলেন্সের শিকার এখন। এতে করে কিশোর-কিশোরী ভয়াবহ শারীরিক জখমও ভোগ করছে।
যাক সে কথা, ভ্যালেন্টাইন ডে ’র মতো অপসংস্কৃতি প্রসঙ্গে বলতে গেলে ইতিহাসের অবান্তর সব বিষয়ই তুলে ধরতে হবে এখানে। ভালবাসার নামে এই দিনটিকে এমনভাবে আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীদের মাঝে ভ্রান্তধারণা বদ্ধমূল করা হয়েছে যে, এই দিনটিই ভালবাসার দিন। এই দিনে উন্মাদ হয়ে একে অপরের মাঝে বিলিয়ে দিতে হবে দেহে যা আছে তা; অশ্লীল নৃত্যঝংকার, স্বল্পবসন, আনন্দ-উল্লাস ও নেশার উপকরণে মত্ত হয়ে মেতে ওঠতে হবে দেহের সর্বশক্তি দিয়ে। ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে পার্কের কোন নিরালায়-গাছের আড়ালে ও হোটেল-মোটেল-রেস্তোরায়। যে যেমন পারে ভোগ করতে হবে দেহ। কিন্তু এর পরিণাম যে কতটা ভয়াবহ, তা কি চিন্তা করে দেখেছি আমরা। পশ্চিমা ও ভারতীয়রা তো ইচ্ছে করেই উস্কে দিয়েছে আমাদের। তারা তো চায়, আমরা আমাদের স্বজাতীয় সংস্কৃতিকে পদদলিত করে তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে একাকার হয়ে যাই।
আমরা জানতে চেষ্টা করি না, কে কবে ভালবাসার ভুল সংজ্ঞায় পর্যবসিত হয়ে নিজেদের মধ্যে এমন একটি দিনের জন্ম দিয়েছে। না জেনেই ভিত্তিহীন সূত্রধরে আমরাও নাচনেওয়ালা পুতুলের মত নাচতে থাকি, এটা কি নির্বোধের মত কাজ নয়? এর প্রতিরোধে সচেতনদেরকে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করছি। আসলে এই দিনটিকে ঘিরে যেসব ইতিহাস রয়েছে তা আধোআলো আধোঅন্ধকার এবং রয়েছে এতে যথেষ্ট গোঁজামিল। আমরা যদি একটু পেছনে ফিরে যাই দেখবো এর কোন ভিত্তি নেই। যে ভালবাসার নামে সৃষ্টির চেয়ে ধ্বংসের প্রবণতা, যে দিনটিকে নিয়ে রয়েছে বহু মত প্রার্থক্য এদিনটিকে নিয়ে আমরা মাতাল হব কেন?
৮২৭ খ্রিস্টাব্দে রোমের পোপ সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নির্বাচিত হয়েছিলেন বলে কেউ কেউ মনে করেন। ভাল ব্যাবহার ও সৎচরিত্রের জন্যই নাকি তিনি সকলের প্রিয় হয়ে ওঠেন। কিন্তু পোপের দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র ৪০ দিনের মাথায় তার মৃত্যু হয়। আর পোপের মৃত্যুর পর রোমের বাসিন্দারা স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে। সাধারণত প্রেমিকরা এ অনুষ্ঠানে যোগ দিত। এরপর থেকেই নাকি এই দিনটিকে ভ্যালেন্টাইন ডে হিসেবে পালন করা হয়। আবার অনেকে মনে করেন, প্রাচীন রোমবাসী কুমারী মেয়েরা এদিন ভালবাসার কাব্য লিখে মাটির পাত্রে জমা করত। ওই পাত্র থেকে তরুণরা যে মেয়ের নাম তুলতেন সে মেয়ের সঙ্গেই তাকে বিয়ে দেয়া হত। অন্য আরেক মতে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে দু’জন খ্রিস্টান যাজক ছিলেন, যাদের একজনকে রোম সম্রাট ১৪ ফেব্রুয়ারি শিরশ্চেদ করেন। কারণ, তিনি যুবক সৈনিকদের বিয়ে করাকে দ-নীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। অথচ, তিনিই এ আইনকে ভঙ্গ করে এক অষ্টাদশী তরুণীকে বিয়ে করেছিলেন। আবার কারো মতে, সম্রাট রোমানদের দেবী পূজার বিরোধীতা করতেন। এটাকে মহা অপরাধ ভেবে তাকে বন্ধি করা হয়। এই সময় যাজকের বন্ধুরা তাদের ভালবাসার কথা লিখে কারাগারে ছুঁেড় মারত। বলা হয়, ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি এ যাজককে হত্যা করা হয়। এ কারণে পোপ প্রথম জুলিয়ার্স ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন ডে ঘোষণা করেন। এসব ভিত্তিহীন ও ভ্রান্ত ধারণা প্রসূত দিনটির নাম ভ্যালেন্টাইন ডে! সূতরাং এর যে ভিত্তি কতটা তা পাঠকমহলের না বোঝার কথা নয়।
সবশেষে বলা দরকার, আমাদের মধ্যে শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চা শুরু হওয়া আবশ্যক। আবেগের তাড়নায় নয়, বিবেক-বিবেচনায় নিজস্ব সংস্কৃতিকে হৃদয়ে লালন করতে হবে। আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে বিষয়টি বোঝাতে হবে। আমাদেরকে ভ্যালেন্টাইন ডে-অপসংস্কৃতিকে রোখতে হবে নিজ নিজ দায়িত্বেই। মনে রাখতে হবে, ভালোবাসার কোনো দিন ক্ষণ নেই। ভালোবাসা শব্দটি মানুষের মাঝে এক পবিত্র সেতুবন্ধন তৈরি করে। এ শব্দটিকে অপবিত্র কেউ যেন না করে। আমাদের সকলের মধ্যে প্রকৃত ভালোবাসার জন্ম হোক; সকলের মধ্যে তৈরি হোক আত্মার অনুপম সেতু বন্ধন।

লেখক:কবি-কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
ই-মেউলঃ- khan-sristy@yahoo.com

Check Also

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট : বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন

  কুমিল্লাওয়েব ডেস্ক:– আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন। ১৯৭৫ ...

Leave a Reply