মেঘনায় মতলবের মাছুয়াখালগামী সারস লঞ্চ ডুবি : মতলবে শোকের মাতম

untitledশামসুজ্জামান ডলার, মুন্সীগঞ্জ থেকে ফিরেঃ—
নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুরের মতলবগামী এমএল সারস লঞ্চটি শতাধিক যাত্রী নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার চর কিশোরগঞ্জের মেঘনা নদীতে ডুবে যায়। এর মধ্যে ১৮ যাত্রী তীরে উঠতে সক্ষম হলেও নানির জানাজায় অংশ নিতে আসা একই পরিবারের ৭জন ও অন্য আরেক পরিবারের ৪ জনসহ ৭৫-৮০জনের প্রানহানি ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রীদের মধ্যে বেশির ভাগই মতলবের দু’উপজেলার। দুর্ঘটনা কবলিত লঞ্চ থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের কাছ থেকে জানা যায়, শুক্রবার সকাল ৭টায় নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে মতলবের মাছুয়াখালের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। সকাল পোনে ৮টায় এমএল সারস লঞ্চটি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার চর কিশোরগঞ্জের ফিরোজা ফারজানা নামে একটি বালুবাহী বলগেট পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দিলে এমভি সারস নামে লঞ্চটি ডুবে যায়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সকাল ১০টার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম ঘটনাস্থলে পৌছে। দুপুর ২টার দিকে লঞ্চের সন্ধান পাওয়া পায় । ফিরোজা ফারজানা নামে বলগেটটি আটক করেছে স্থানীয় জনতা।
এ সময় ডুবে যাওয়া লঞ্চে ৭০ থেকে ৮০ জন যাত্রী ছিল বলে জানিয়েছেন উদ্ধার হওয়া যাত্রী বিল্লাল হোাসেন।
কান্না জড়িত কন্ঠে যাত্রী বিল্লাল হোসেন আরও জানান, কিছু বুঝে ওঠার আগেই লঞ্চটি ডুবে যায়। এতে বেশির ভাগ যাত্রীই ডুবে যাওয়া লঞ্চের সঙ্গে নদীতে তলিয়ে গেছে।

লঞ্চ ডুবির খবর চাঁদপুরের মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়লে লঞ্চে থাকা যাত্রীদের বাড়িতে বাড়িতে শুরু হয় স্বজনদের শোকের মাতম। স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠে। স্বজনরা ট্রলার যোগে প্রিয়জনদের লাশের খোঁজে ঘটনাস্থলে গিয়ে দিক বেদিক ছুটাছুটি করেন। লঞ্চ উদ্ধারে দেরি হওয়ায় স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে। মতলবের নদী তীরবর্তী লঞ্চঘাটগুলোতে স্বজনরা প্রিয়জনের লাশের উপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিএ), বাংলাদেশ নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও কোস্টগার্ডের ডুবুরিরা এই উদ্ধার কাজে অংশ নেয়। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছিলেন। লঞ্চ ডুবির খবর পেয়ে চাঁদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এয়ার ভাইস মার্শাল (অব:) এম. রফিকুল ইসলাম, মতলব উত্তর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ মিজানুর রহমান, মতলব উত্তরের ইউএনও আবু আলী মোঃ সাজ্জাদ হোসেন, ষাটনল ইউপি চেয়ারম্যান একেএম শরীফ উল্যাহ সরকার ঘটনাস্থল উপস্থিত থেকে সার্বক্ষণিক উদ্ধার কাজের খোঁজখবর রাখেন।

রাত ৮ টা পর্যন্ত খবর নিযে জানাগেছে, একই পরিবারের ৭ জনের ১ জন ময়না আক্তার (২৫) এবং একই পরিবারের ৪ জনের ১ জন ১৮ মাসের ছোট্র ছেলে প্রিন্স ব্যাতীত অন্যকোন লাস উদ্ধার হয়নি।

নানির জানাজায় যাওয়ার পথে ৭ নাতি-নাতিনের প্রাণহানি:
চায়না আক্তার বয়স ত্রিশ, থাকেন নারায়ণগঞ্জের তল্লায়। স্বামী মুক্তার হোসেন(৩৫), দুই কন্যা মীম(৮) ও তানজী(২)। চায়না আক্তার সাথে তার আরো ৩ বোন ময়না আক্তার(২৫), তানিয়া আক্তার (২০) এবং শাহনাজ (১৭) কে সাথে নিয়ে যাচ্ছিলেন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার চান্দ্রাকান্দি গ্রামে নানির জানায়ার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার চর কিশোরগঞ্জের ফিরোজা ফারজানা নামে একটি বালুবাহী বলগেট পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দিলে এমভি সারস নামে লঞ্চটি ডুবিতে তারা ৭ জনই মারা যায়।

সন্তানকে বাঁচাতে মায়ের আত্মত্যাগঃ
গ্রামের বাড়ি মতলব উত্তর উপজেলার রায়েরকান্দি গ্রামে। ১৪ বছরের ওমর ফারুক। মা নাজমা বেগমকে সাথে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে এমএল সারস লঞ্চে বাড়ি ফিরছিল। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার চর কিশোরগঞ্জের ফিরোজা ফারজানা নামে একটি বালুবাহী বলগেট পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দিলে এমভি সারস নামে লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পূর্ব মূহুর্তে মা নাজমা বেগম ছেলের হাতে কাপড়ের একটি ব্যাগ তুলে দিয়ে ছেলেকে ধাক্কা দিয়ে লঞ্চ থেকে বের করে দেয়। কাপড়ের ব্যাগটি অবলম্বন করে বেঁচে আসা ওমর ফারুক মা নিজে জীবন দিয়ে সন্তানকে বাঁচানোর কাহিনীটাই বর্ননা করে।

আবুল হাশেমের স্ব-পরিবারে বাড়ি ফেরা হলো নাঃ
আবুল হাশেম (৪৫), বাড়ি মতলব উত্তর উপজেলার মুক্তিরকান্দি। পেশায় রঙ ব্যবসায়ী। ব্যবসা করেন নারায়ণগঞ্জে। পরিবারের অন্যান্যরা গ্রামের বাড়ি থেকে নারায়ণগঞ্জে বেড়াতে এসেছিলেন। স্ত্রী শেফালী বেগম (৩৫), ছেংগারচর ডিগ্রি কলেজে পড়–য়া কন্যা মনি আক্তার (১৭) এবং ১৮ মাসের ছোট্র ছেলে প্রিন্সকে মুক্তিরকান্দিতে পৌছে দিতে স্ব-পরিবারে ফিরছিলেন এমএল সারস লঞ্চে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার চর কিশোরগঞ্জের ফিরোজা ফারজানা নামে একটি বালুবাহী বলগেট পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দিলে এমভি সারস নামে লঞ্চটি ডুবে গেলে তাদের সকলেরই প্রানহানি ঘটে।

Check Also

কুমিল্লায় তিন গৃহহীন নতুন ঘর পেল

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ– কুমিল্লা সদর উপজেলায় গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে ৪নং আমড়াতলী ইউনিয়নের গৃহহীন নুরজাহান বেগম, ...

Leave a Reply