মেধাবীদের মূল্যায়ন ও দেশের উন্নয়ন——–এম. আবদুল হাই

untitled
মেধাবী ও প্রতিভাবনগণ যে কোন দেশের বা জাতির এক অতীব অমূল্য ঐশ্বর্য ও দূর্বার শক্তি। বিশ্বের যে কোনো জাতি টিকে থাকে সে দেশের প্রতিভাবানদের মাধ্যমে। কোনো দেশে বা জাতির সমাজদর্শন, ইতিহাস ও সংস্কৃতি দর্শন, অর্থনীতি-উন্নয়ন ও রাজনীতি এবং ধর্ম, ঐতিহ্য প্রভৃতির পরিকাঠামো প্রতিভাবানরাই বিনির্মাণ করেন এবং সমুন্নত রাখেন। সে কারণে দেশের মেধাবী তথা প্রতিভাবানদের মূল্যায়ন হলে সে দেশ সমাজ-রাজনীতি-ধর্ম-দর্শন-সংস্কৃতিতেই শুধু উন্নতি লাভ করবে না, বরং মেধাবীরা যোগ্যদের মূল্যায়ন করে বলেই দেশে সন্ত্রাস-দুর্নীতিসহ যে কোন অপরাধ কখনো আশ্রয়-প্রশ্রয় পাবার নয়। আর এমনটিই স্বত:সিদ্ধ।
শিক্ষার্থীদের যথাযথ ও মানসম্পন্ন পর্যায়ে দেশ ও জাতির কাঙ্খিত সম্পদ রূপে গড়ে তুলতে এবং শিক্ষার প্রকৃত ফল উপভোগ করতে হলে প্রকৃত পক্ষে দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকেই রাজনীতিমুক্ত করার বিকল্প নেই। শিক্ষাঙ্গণে কোন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন বা অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রমধর্মী রাজনীতি ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হওয়া অত্যাবশ্যক বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞজনরা। হাঁ, ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁদের শিক্ষাসংক্রান্ত শিক্ষার উন্নয়নমূলক প্রস্তাবাদি ও দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে নির্দলীয় একটি সুনির্দিষ্ঠ প্ল্যাটফর্ম থেকে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে সুধু শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন। দেশ কখনো কোন প্রকার রাজনৈতিক সঙ্কটের আবর্তে পড়লে সে মুহূর্তে ছাত্র-ছাত্রীরা নির্দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাদের দূরদর্শী চিন্তা-চেতনা, পরার্শ ও মন্তব্য নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম থেকে রাজনীতিবিদদের জানাতে পারবে।
একটি দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি সেদেশের দার্শনিকরাই নির্মাণ করে থাকেন। বাংলাদেশে দর্শনে ডিগ্রি নিয়ে কিন্তু অধিকাংশই দর্শন সম্পর্কে গভীরতম প্রায়োগিক ধারণা অর্জন করতে পারেন না। সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, কৃষিবিজ্ঞান এবং শিক্ষা বিভাগ থেকে যারা ডিগ্রি নিয়ে বের হন, তাদের অধিকাংশকেই আমরা সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, কৃষিবিজ্ঞানী এবং শিক্ষাবিদ হিসেবে নিজ নিজ ক্ষেত্র ও বিষয়ে প্রায়োগিত সুযোগ যথার্ত নয় বিধায় তারা উপর্যুক্ত বিষয়ে গভীরতম ব্যুত্পত্তি অর্জনসহ এর কল্যাণকর ও উন্নয়নমূলক কাঙ্খিত সুফল পেতে ও দিতে অনেকখানি পিছিয়ে আমরা।
শিক্ষার ব্যাপারে, তা যে কোনো বিষয়েই হোক না কেন, শিক্ষার্থীর অন্তরে নৈতিকতা, সততা, উদারতা, দেশাত্ববোধ, কল্যাণবোধ ও মনুষ্যত্ববোধকে একটিভ করে দেয়া না গেলে, সে শিক্ষা কোনো দেশ বা জাতির জন্য উন্নয়ন ও কল্যাণকর কোনো সুদূরপ্রসারী ফল ফলাতে পারে বলে মনে হয় না। সেজন্য যে কোনো বিদ্যাশাখায় ধর্মবর্ণ-ঊর্ধ্ব নৈতিকতা ও কল্যাণময়তার দর্শনকে স্পষ্টায়িত করে তোলাই অত্যাবশ্যক। তবেই বিদ্যার্জন করে প্রকৃত মেধাবী তৈরী হওয়া সহ প্রতিভাবানরা দেশে ন্যায়ের শাসন, সুশাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষক হবেন।
আমাদের এদেশের সমাজ একটি কৃষিনির্ভর সমাজ। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর যেসব ছাত্রছাত্রী ডিগ্রি নিয়ে বেরুচ্ছেন, তাঁদেরকে প্রশাসনিক সুশৃঙ্খলার মাধ্যমে এদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা, থানা-ইউনিয়ন ও গ্রামের স্তরভিত্তিক কৃষি উন্নয়নে কৃষকদের সহযোগিতার জন্য নিয়োগ দিলে কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশু প্রভৃতির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনসহ দেশ প্রত্যাশিত অগ্রগতির দিকেই এগুবার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ী হওয়া যায়।
একই ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে যেসব মেধাবী প্রতিবছর ডিগ্রি নিয়ে বের হন বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর প্রথাচার, সংস্কৃতি, উন্নয়নের জন্য তাদের প্রশাসনিক দক্ষতা ও সততার মধ্য দিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একইভাবে নিয়োগ দিয়ে দেশোন্নয়ন ঘটানো যায় বলে আমার বিশ্বাস।
আবার ‘শিক্ষা’ বিভাগ থেকে যারা অনার্স-মাস্টার্স করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুচ্ছেন, দেশের স্কুল-কলেজে শিক্ষার বিষয়ক ও এতদসংশ্লিষ্ট অবকাঠামোগত মানোন্নয়নের জন্য তাদের প্রায়োগিকভাবে নিয়োগ দিয়ে দেশের শিক্ষাখাত উন্ননের পথ সুগম করা সহজ।
সমভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে যারা উচ্চশিক্ষা নিয়ে বের হন, তাদের মাধ্যমে দেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশপ্রেমমূলক নির্দলীয় কর্মশালা সম্ভাবিত হতে পারে, যে কর্মশালার খরচ সরকার বহন করবে।
ধর্মীয় ক্ষেত্রে দেশে ধর্মতাত্ত্বিকগণ সুধু ইবাদতের প্রচারই নয়, বরং সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি এবং বিশ্বরাজনীতিসহ প্রতিটি জীবন পরিপূর্ণতা লাভে সংশ্লিষ্ট যতরকম কল্যাণকর দিক রয়েছে তার অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টিতে ধর্মীয় নির্দেশনা সম্পর্কেও জানবেন জানাবেন। এমন ধর্মতাত্ত্বিকদের দ্বারাই যে কোনো ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধসহ নিজ নিজ ধর্মচেতনার মাধ্যমে নৈতিক উদারতাদীপ্ত কল্যাণের প্রচার প্রসার ও বিস্তার তারা অনবদ্য ভুমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।
বাংলাদেশের সমাজবিদ্যার বৈশিষ্ট্য কী, বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, কৃষিবিজ্ঞান এবং শিক্ষাবিজ্ঞানের মৌল প্রবণতাগুলো কী ধরনের এবং প্রায়োগিক ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ শিক্ষাব্যবস্থার প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চতর পর্যায়ে ব্যাপক গভীরভাবে শিক্ষা দেয়া জরুরি বলে আমি মনে করি। সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, কৃষিবিদ্যা, শিক্ষাবিদ্যা, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বৈশ্বিক ইতিহাসের তাত্পর্যগত, জ্ঞানগত ও দর্শনগত গভীরতর বিবেচনাবোধের অন্তঃসারকে ধীমান শিক্ষক নিয়ে পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় করানো সম্ভব হলেই উপর্যুক্ত সেক্টরে সেসব যোগ্য লোক দিয়ে দেশের উন্নয়নের প্রকৃত কার্যক্রম চালানো যাবে বলে আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি।
অত্যন্ত দুখের হলেও সত্য বলে মনে হয় যে, আমাদের দেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ প্রকৃত পক্ষে রাজনীতিক নয়; বরং সুবিধাবাদি ও স্বার্থাহ্নেষী ব্যবসায়ী। এমন অনেক অর্থ-ভৈব’এর মালিক হওয়ার দাপটে যারা নির্বাচন করে রাজীতিক হয়েছেন বা নেতা সেজেছেন। নির্বাচনে প্রর্থীতার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা নৈতিকতাকে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে প্রাধান্য দিলে সর্বোপরি জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা তুলনামুলক কম থাকে। তাছাড়াও অশিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত কিংবা অনৈতিক লোক নির্বাচিত প্রতিনিধি হলেও মৌলিক অধিকার নিয়ম-নীতি আইন-কানুন সম্পর্কে সম্যক ধারনা না থাকায় গণমানুষ প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনাই থাকে অধিক। অনেক সময় চারিত্রিক ও নাগরিকত্ব সনদ ইস্যুকারীর নুন্যতম নিজ চারিত্রিক ও নাগরিকত্ব গুনাণের বহু লিখা চিত্র ও প্রতিবেদন এমনই যে, আমাদের যেন মানুষ্যত্বের জগত থেকে অনেকটা নীচে নামিয়ে দেয়।
নির্বাচনে অল্প বিদ্যা ভয়ংকরধর্মী, অনৈতিক, অসৎ ও দুর্নীতিবাজদের নোমিনেশন কোন ক্রমেই না দেয়া। এভাবে অসততা ও অযোগ্যতাকে প্রতিহত করার সঙ্গে সঙ্গে আমলা অর্থাত্ উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ীদের অসততা ও অযোগ্যতাকেও আইন করে প্রায়োগিকভাবে প্রতিহত করতে পারলেই আমাদের দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব বলে আশাবাদী।
আমাদের দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, ধর্মীয় উদারতা, নৈতিকতাবোধ এবং মূল্যবোধ ও প্রজ্ঞা ও দর্শনচর্চার প্রাতিস্বিক অর্জনকে প্রকৃতরূপে বিশ্বমাঝে প্রতিষ্ঠিত করে দেখিয়ে দিতে সক্ষম হলেই এই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব।

Check Also

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট : বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন

  কুমিল্লাওয়েব ডেস্ক:– আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন। ১৯৭৫ ...

Leave a Reply