ট্রেনে নৃশংস ডাকাতি: মানুষ যাবে কিভাবে?—–এম. আবদুল হাই

untitled
সড়ক পথে ভাড়া বৃদ্ধি সহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে জ্যামে পড়ে সময়ের অধিক অপচয় ও নানা রকম ভোগান্তির কারনে জনগণের অনেকেই রেলপথকে তুলনামুলক নিরাপদ ভেবে যাতায়াতের জন্য এ পথটটি বেছে নেন। তবু সম্প্রতি এ পথে রেলের ভাড়া বৃদ্ধি করা হলেও অত্যন্ত দু:খের হলেও সত্য যে, রেলওয়ের যাতায়াতের মান কিন্তু মোটেও বৃদ্ধি করা হয়নি। সিটের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ যাত্রী বহন করলেও রেলয়ে হর-হামেশা লোকসান কেন গুনতে হবে? এ বিষয়ে অনেক লিখা-লিখি হলেও অদ্যাবধি কর্তৃপক্ষে টনক নড়েনি।ফলে ভোগান্তির অন্ত নেই এ পথে। তার উপর চুরী চামারী ও খুন ডাকাতী রেলওয়ে যাতায়াতের পথটায় জনগনের অনীহা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।
গত ৩১ ডিসেম্বর ভোররাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলস্টেশন থেকে সামান্য দূরে ঢাকাগামী একটি রেলগাড়িতে যে ডাকাতি সংঘটিত হয়েছে, তা এককথায় নৃশংস। মাত্র কয়েক হাজার টাকা আর কম দামি কয়েকটি মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে পাঁচজন মানুষকে চলন্ত রেলগাড়ি থেকে নিক্ষেপ করে যারা ফেলে দিয়েছে, তারা শুধুই ডাকাত নয়, অতি নিষ্ঠুর এবং অমানবিক খুনিও। এ ছাড়াও কসবা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত এ পথে কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনার খবর আছে প্রতিনিয়ত।
এই ডাকাতি সম্পর্কে পরদিন বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ডাকাতেরা মালামাল কেড়ে নিয়ে যে পাঁচজন যাত্রীকে চলন্ত ট্রেন থেকে নিক্ষেপ করে ফেলে দিয়েছে, একজন নারীসহ তাঁদের তিনজনেরই মৃত্যু হয়েছে। দুজন সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেলেও তাদের একজন গুরুতর আহত। নিহত নারীটির নিকট তেমন কোন প্রচুর টাকাপয়সা কিংবা গয়নাগাটিও ছিল না এমনকি ওই পাঁচ যাত্রীর কারও কাছেই বেশি কোন সম্পদ কিংবা অর্থকড়ি ছিল না। ট্রেনটির ইঞ্জিনসংলগ্ন বগিতে যাত্রী বলতে ওই পাঁচজনই ছিলেন, আর ডাকাত দলের সদস্যসংখ্যা ছিল সাত বা আট। নিরীহ যাত্রীরা ডাকাতদের কোনোভাবে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেননি, ডাকাতেরা সহজেই তাঁদের টাকা ও মুঠোফোন কেড়ে নিতে পেরেছে। তারপর তারা মাঝপথে চেইন টেনে ট্রেনটি থামিয়ে বা পরবর্তী স্টেশনে ট্রেনটি দাঁড়ানোমাত্র দ্রুত সটকে পড়তে পারত। কিন্তু তা না করে কেন তারা মানুষগুলোকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দিয়েছে, তার ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন। প্রশ্ন জাগে, ওদের কাছে মানুষের প্রাণ কি এতটাই মূল্যহীন হয়ে পড়েছে যে এমন অবলীলায় পাঁচজন মানুষকে খুনের মুখে ঠেলে দিতে পারল?
ট্রেন-ডাকাতির এ ঘটনার প্রধান বৈশিষ্ট্য নৃংশসতা, সীমাহীন অমানবিকতা। এ দেশে ট্রেনে ও বাসে ডাকাতি আগেও হয়েছে অনেক, কিন্তু ডাকাতেরা যাত্রীদের সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়ে গলায় গামছা পেঁচিয়ে চলন্ত ট্রেন বা বাস থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে এমন ঘটনা বিরল। তাহলে বুঝতে হবে যে, আমাদের সমাজ কি মানবিক বোধশূন্যতার দিকে আরও কতটা নীচে নেমে যাচ্ছে? মানুষকে হত্যা করা এখন আর কোনো ব্যাপারই নয় বলে মনে করা হচ্ছে? তা যদি হয়, তাহলে কেন এবং কীভাবে নূন্যতম মানবিক মূল্যভোধের এমন অধঃপতন ঘটছে? মনে হচ্ছে, এভাবে অবলীলায় মানুষ হত্যার প্রবণতা বাড়ছে প্রধানত এই কারণে যে, আইনের প্রয়োগ ক্রমেই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ছে কর্তৃপক্ষ। মানুষ মানুষকে নির্ভয়ে ও অবলীলায় হত্যা করছে এই ভেবে যে হত্যা করে পার পাওয়া যায়। শাস্তিহীনতার এই পরিবেশই হত্যাসহ সব রকমের অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। যা প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এ প্রসারতা ও নিশংসতার ব্যাপ্তি ঘটতে পারে অনায়াসে।
এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে পুলিশ আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং ইতিমধ্যে রেলওয়ে পুলিশের সংশ্লিষ্ট তিন কর্মীকে প্রত্যাহারও করা হয়েছে। এসবের অর্থ সরকার নির্বিকার নয়। এটা বেশ ভালো কথা। প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, নিরীহ-নির্দোষ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন সে দিকে সচেতন দৃষ্টি দিতে হবে। আরও যে বিষয়টিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে বলে জনগন মনে করেন তাহল এপথে যাত্রীদের নিরাপত্তা বাড়ানোর স্বার্থে আরও বেশিসংখ্যক নৈতিক রেলওয়ে পুলিশ নিয়োগ করা।

Check Also

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট : বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন

  কুমিল্লাওয়েব ডেস্ক:– আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন। ১৯৭৫ ...

Leave a Reply