কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ছড়া সম্মেলন ও বিশিষ্টজনদের মিলনমেলা——মো. আলী আশরাফ খান


দেশের স্বনামধন্য ছড়াকার, প্রাবন্ধি সেই ‘রক্তেভেজা কিশোরগঞ্জ’এর রচয়িতা জাহাঙ্গীর আলম জাহানের সঙ্গে আমার পরিচয় সম্ভবত ২০০৩ সালে ঢাকা নটরডেম কলেজের একটি অনুষ্ঠানে। এরপরে অবশ্য তিনি আমার পাঠাগারের জন্য তার লেখা বই ছাড়াও অন্যান্য লেখকদের উল্লেখযোগ্য বই উপহার পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া তার লেখা ছড়া যখন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়, তা আমার পরিবারের সদস্যসহ আমি খুব মনোযোগসহকারে পড়ি এবং মুঠোফোনে নানান বিষয়ে তার সঙ্গে ভাব বিনিময় হয়। এককথায়, আমরা জাহাঙ্গীর আলম জাহানের লেখার প্রচন্ডরকম ভক্ত বলা চলে।
জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তিনি আমাকে ফোন করে বললেন, তার আহ্বানে কিশোরগঞ্জের স্থানীয় লেখকরা একটি আঞ্চলিক ছড়া সম্মেলন করতে যাচ্ছেন। এ সম্মেলনে আমাকে ও তিতাস উপজেলার ছড়াকার মনির হোসেন মাস্টারকে যেতেই হবে। কুমিল্লা থেকে অধ্যক্ষ ড. আলী হোসেন চৌধুরীসহ আমরা তিনজন যেনো কিশোরগঞ্জের এ সম্মেলনে যোগ দিই-এটা তার বিশেষ অনুরোধ। আমি দুইদিন সময় নিয়ে মনির হোসেন মাস্টারের সঙ্গে কথা বলে চুড়ান্ত করি যাওয়ার বিষয়টি। আমরা ২৫ জানুয়ারি রাতে কিশোরগঞ্জে পৌঁছে যাবো। জাহান ভাইকেও তা জানিয়ে দিই। তিনি আমাদের জন্য থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থা করে রাখেন। ২৪ জানুয়ারি রাতে মনির হোসেন মাস্টার আমাকে জানালেন, তার পারিবারিক একটা সমস্যা হয়ে গেছে, তিনি যেতে পারবেন না। মনির ভাইয়ের কথায় আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। ওনিসহ এক সঙ্গে যাবো বলে জাহান ভাইকে কথা দিয়ে ছিলাম। কিন্তু এখন বড্ড চিন্তায় পড়ে গেলাম। জাহান ভাইকে ফোন করে বিষয়টি জানালাম। তিনি বললেন, আমাদের থাকা ও খাওয়ার সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা না গেলে তার সংগঠনের সদস্যগণ মনোক্ষুন্ন হবেন। তার কথায় শেষমেশ উপায়ন্তর না পেয়ে ২৫ জানুয়ারি সকালে একাই রওয়ানা হলাম কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বিকেল ৩টায় পৌঁছলাম কিশোরগঞ্জ শহরে। জাহান ভাইয়ের কথামত আবাসিক হোটেল উজান ভাটিতে উঠলাম।
দুপুরের খাবার খেতে বেশ দেরি হয়ে গেল। কিশোরগঞ্জের মেয়ে মাহবুবা খান দীপাণি¦তা আমার প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে তা খাওয়া হলো বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার পূর্বে। ‘তুমিও ফেরালে চোখ’ কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা-এ বন্ধু আমার বেশ আন্তরিক। কিশোরগঞ্জের বিশেষ বিশেষ জায়গাগুলোর মধ্যে শোলাকিয়ার মাঠ, গুরুদয়াল কলেজ চত্বরে বসে কথা হলো তার সঙ্গে। আমার বহু দিনের স্বপ্ন শোলাকিয়ার মাঠ দেখা হলো। রাত ৮ টার দিকে ফিরে এলাম উজান ভাটির চারতলার ৪০৩ নম্বর কক্ষে। রাত ৯টায় আমার পাশের একটি বড় কক্ষে উঠলেন প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক লুৎফর রহমান রিটন, শিশু সাহিত্যিক সাংবাদিক আমীরুল ইসলামসহ আরো কয়েকজন খ্যাতিমান লেখক। আমার ধারনা ছিল, অধ্যক্ষ ড. আলী হোসেন চৌধুরীও তাদের সঙ্গে আছেন। কিন্তু বহু খোঁজাখোঁজির পরও তাকে পেলাম না। রাত সাড়ে নয়টায় একই হোটেলের ৫ তলার চায়নিজে শুরু হলো যেমন খুশী তেমন ছড়া ও কবিতা পাঠের আসর। জমকালো অনুষ্ঠানে কিশোরগঞ্জের লেখকরা আঞ্চলিক ভাষায় লেখা ছড়া-কবিতা, জারিগান ও পূঁথি পাঠের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আগত কবি-সাহিত্যিকগণ ছড়া ও কবিতা পাঠ করলেন। পরে এক সাথে সবাই খাওয়াদাওয়ার পর্বের মধ্য দিয়ে একরকম ব্যতিক্রমী আনন্দ উপভোগ করলাম ওই রাতে।
২৬ জানুয়ারি সকাল সাড়ে নয়টায় কিশোরগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে শুরু হলো অনানুষ্ঠানিক ছড়া ও কবিতা পাঠ। প্রায় ১ ঘন্টা সময় ধরে চলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা লেখকদের এ আড্ডা। এসময় অন্যান্য কবিদের পাশাপাশি কুমিল্লার সাবেক ডিসি বর্তমান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব কবি মো. মনজুরুর রহমানের স্বরচিত কবিতা পাঠ উপস্থিত সকলকে বিমূগ্ধ করে। সকাল সাড়ে দশটায় শিল্পকলা একাডেমির সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় র‌্যালি বের হয়। র‌্যালিটি কিশোরগঞ্জের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শিল্পকলা একাডেমিতে এসে শেষ হয়। শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে নান্দনিক সাজে সজ্জিত উদ্বোধনী মঞ্চে দাঁড়িয়ে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এসময় ৩০ টি জেলা থেকে আগত ৩০ জন প্রতিনিধি স্ব-স্ব জেলার পক্ষে পতাকা উত্তোলন করেন।পরে শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে উদ্বোধনী আলোচনা সভায় এ আঞ্চলিক ছড়া সম্মেলনের আহ্বায়ক এ.টি.এম. নিজামের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. সিদ্দিকুর রহমান। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, কিশোরগঞ্জ পুলিশ সুপার মীর রেজাউল আলম। মুখ্য আলোচক ছিলেন, কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক এড. মো. জিল্লুর রহমান। আলোচক ছিলেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিক কবি মো. মনজুরুর রহমান, প্রনিক মো. আনিছুজ্জামান, ‘দৃশ্যপট’৭১-এর সভাপতি এড. নাসির উদ্দিন ফারুকী, কথাসাহিত্যিক ডা. দীন মোহাম্মদ, কিশোরগঞ্জ সদরের ইউএনও সুব্রত পাল, করিমগঞ্জের ইউএনও মোহাম্মদ গোলাম কবির।
২য় পর্বের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, আঞ্চলিক ছড়া সম্মেলনের সদস্য সচিব বিশিষ্ট ছড়াকার জাহাঙ্গীর আলম জাহান। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন, কিশোরগঞ্জের রাজনীতিক এড. মো. আতাউর রহমান, সৈয়দ আশফাকুল ইসলাম টিটু, ছড়া সম্মেলন বাস্তবায়ন পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী শেখ ফরিদ আহম্মদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এড. মোজাম্মেল হক খান রতন, সিআইপি বাদল রহমান ও কিশোরগঞ্জ ছড়াকার সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছড়াকার র.ম. পাশা প্রমুখ। পরে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইলসাম স্মৃতি পদক প্রদান পর্বের সভাপতিত্ব করেন, অধ্যক্ষ(অব:) প্রিন্স রফিক খান। এ পর্বের মুখ্য আলোচক ছিলেন, প্রখ্যাত শিশুসাহিতত্যিক লুৎফর রহমান রিটন। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক আকতার হুসেন, বিশিষ্ট অভিনেতা ও শিশুসাহিত্যিক খায়রুল আলম সবুজ, বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক খালেক বিন জয়েন উদ্দীন, বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক আমিরুল ইসলাম, বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক আহমাদ মাযহার প্রমুখ। অনুষ্ঠানে শিশু সাহিত্যে বিশেষ অবদানে রাখায় শহীদ সৈয়দ নজরুল ইলসাম স্মৃতি পদক-’১২ এ ভ’ষিত হন টাঙ্গাইলের আলম তালুকদার, কিশোরগঞ্জের সিরাজুল ফরিদ, জগলুল হায়দার, সাইফুল হক মোল্লা দুলু, বাঁধন রায়, ময়মনসিংহের সরকার জসীম, জামালপুরের আশরাফুল মান্নান, শেরপুরের সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, নেত্রকোণার রইস মনরম। সবশেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কিশোরগঞ্জ তাড়াইলের বিশিষ্ট লেখক আবুল হাসেম ভ’ঁইয়া। অনুষ্ঠানে পালাগান, জারিগান, ছড়াগান ও মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশন করেন বিভিন্ন জেলার শিল্পীরা।
পরিশেষে কিশোরগঞ্জের এই আঞ্চলিক ছড়া সম্মেলন-’১৩ সম্পর্কে দু’একটি কথা আলোকপাত করে শেষ করবো এ লেখা। আসলে যেখানে দেশের অর্ধ্বেকের চেয়ে বেশি জেলার ছড়াকার,কবি-সাহিত্যিকগণের মিলন মেলা, সেখানে এ সম্মেলনকে কোনোভাবেই আঞ্চলিক সম্মেলন বলা চলে না। আমার তো মনে হয় কিশোরগঞ্জবাসী বুঝতে পারেনি, এতগুলো জেলার লেখকগণ ছড়াকার জাহাঙ্গীর আলম জাহানকে ভালবেসে তার আহ্বানে এ সম্মেলনে যোগ দেবে! যে কারণে হয়তো এ সম্মেলনকে আঞ্চলিক হিসেবে তারা দেখেছে। তবে তা যাই হোক, সার্বিকভাবে বিচার বিবেচনা করলে, কিশোরগঞ্জবাসীর এ আয়োজন ছিল বেশ প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। তাদের আতিথেয়তার কোনো জুড়ি নেই। কিশোরগঞ্জবাসী নি:সন্দেহে এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে লেখকদের মধ্যে এক নতুন মাত্রার আত্মিক বন্ধন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। যথাযথ সম্মান জানাতে পেরেছে লেখক সমাজকে। লেখকরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি ভাব বিনিময় এবং নিজেদের লেখা বই, লিটল ম্যাগ আদান-প্রদানের অপূর্ব সুযোগ পেয়েছেন এ সম্মেলনে এসে। বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের আমার প্রিয় লেখক ও সাংবাদিক মাজহার মান্নার ‘ছায়ামানবী’ উপন্যাসটি অনেকের হাতে দেখা গেছে। তিনি আমাকেও একটি বই উপহার দিয়েছেন। আমরা মাজহার মান্না ও কিশোরগঞ্জবাসীর কাছে চির কৃতজ্ঞ। আমাদের বিশ্বাস, কিশোরগঞ্জবাসীদের অনুসরণ-অনুকরন করে দেশের অন্য জেলার সাহিত্য কর্মীরাও এমন আয়োজন করে সাহিত্যচর্চাকে আরো বেগবান করবেন। পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসবে স্ব-স্ব এলাকার ধনাঢ্যরা। সাহিত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হবে সকল মানুষের প্রাণ, অমানিশার অন্ধকার দূর হবে শৈল্পিক ‘সাহিত্য’ হাতিয়ারের আঘাতে আঘাতে।

লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

Check Also

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট : বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন

  কুমিল্লাওয়েব ডেস্ক:– আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন। ১৯৭৫ ...

Leave a Reply