সরাইলে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচি উন্নয়নের চেয়ে লুটপাট বেশি

আরিফুল ইসলাম সুমন:—-
সরাইলে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির বিভিন্ন প্রকল্পে চরম অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। আর এ অনিয়ম ও লুটপাটের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)সহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাবাবুরা। এ অভিযোগ, উপজেলার একাধিক জনপ্রতিনিধি, প্রকল্পে নিয়োজিত শ্রমিকসহ এলাকার লোকদের।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় প্রকল্পকাজে তালিকা অনুযায়ী শ্রমিক উপস্থিতি ছিল কম। কিন্তু কাগুজে-কলমে শতভাগ শ্রমিক উপস্থিতি দেখিয়ে মজুরি উত্তোলনের পর তা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। নানা অজুহাতে শ্রমিকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে টাকা-পয়সা। অনেক প্রকল্পে শিশুদের দিয়ে মাটি কাটার কাজ করানো হয়েছে। সরকারি ছুঁটির দিন ছাড়া সপ্তাহে পাঁচ দিন প্রকল্পে কাজ করানোর নিয়ম থাকলেও অনেক প্রকল্পে মাঝে মধ্যে কাজ বন্ধ রেখে শ্রমিক মজুরি উত্তোলনের পর ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে। সরাইল উপজেলা পরিষদ মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাহমুদা পারভীন বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম-লুটপাটের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এই উপজেলায় কর্মসূচির শুরু থেকেই অনিয়ম। এখন কর্মসূচির কাজ শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, উপজেলার বিভিন্ন প্রকল্পে শ্রমিক তালিকায় অনেক ধনাঢ্য পরিবারের সদস্যদের নাম রয়েছে। তারা কখনো কাজে আসেনি। কিন্তু দৈনিক ১৭৫ টাকা হারে প্রত্যেক সপ্তাহে সেইসব শ্রমিকদের মজুরির টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। আমি নিজে কয়েকটি প্রকল্প পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। সেখানে শ্রমিক উপস্থিতি ছিল খুবই কম। বিষয়টি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) জানানো হয়েছিল। পরে জানতে পেরেছি সেই প্রকল্পগুলোর শ্রমিক হাজিরা কাগুজে-কলমে শতভাগ দেখিয়ে মজুরির টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দফতর সূত্রে জানা গেছে, এ উপজেলায় অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচীর প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৮১ লাখ ৪১ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়। শ্রমিক সংখ্যা ১১৬৩জন। কাজ শুরু হয় গত ১৭ নভেম্বর, শেষ হয়েছে ৯ জানুয়ারী। প্রত্যেক শ্রমিক দৈনিক মজুরি পেয়েছেন ১৭৫ টাকা করে। ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে শ্রমিক মজুরি প্রদান করা হয়েছে।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুইজন ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, সপ্তাহে বিল (শ্রমিক মজুরি) উত্তোলনের সময়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের কর্তাবাবুদের চাহিদা অনুযায়ী তাদের কমিশনের টাকা দিতে হয়েছে। অপরদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রকল্প সভাপতি (ইউপি সদস্য) জানান, পিআইও অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী টাকা ছাড়া তারা বিল ভাউচার ছাড় দেননি। প্রকল্পে যা-ই করা হয়েছে তা সবই পিআইও’র পরামর্শে।
সরেজমিন, গত ৬ জানুয়ারী শাহজাদাপুর ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে, ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সাব্বির মিয়া তার কাবিখা “দেওড়া মোড়াহাটি থেকে দোপের খাল পর্যন্ত রাস্তা মেরামত” প্রকল্পে ইউনিয়নের কর্মসংস্থান কর্মসূচীর তিনটি প্রকল্পের ৬৭ জন শ্রমিক দিয়ে মাটি কাটার কাজ করাচ্ছেন। এ পরিষদের একাধিক ইউপি সদস্য-সদস্যা জানান, চেয়ারম্যান তার কাবিখা প্রকল্পে ৫ জানুয়ারীও কর্মসূচীর শ্রমিক দিয়ে কাজ করিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই দু’দিন এলাকার কর্মসূচীর তিনটি প্রকল্পে কাজ বন্ধ ছিল। অথচ কাগুজে-কলমে দেখানো হয়েছে কর্মসূচীর প্রকল্পে সকল শ্রমিক উপস্থিত থেকে কাজ করেছে। ৫ জানুয়ারী চুন্টা ইউনিয়নের “রসুলপুর-আজবপুর রাস্তা পুনঃ নির্মাণ ও ঈদগাহ মাঠ ভারাট” প্রকল্প পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় এখানে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নসহ সমগ্র উপজেলায় শনিবার কর্মসূচির কাজ চলেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ প্রকল্পে ৩০ জন শ্রমিক। প্রকল্প সভাপতি স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. ফিরোজ মিয়া শ্রমিকদের জানিয়েছে সরকারি সিদ্ধান্তে শনি ও রবিবার দু’দিন কাজ বন্ধ থাকবে। স্থানীয়রা জানান, এ প্রকল্পে কাগুজে-কলমে ৩০ শ্রমিক থাকলেও কাজ করানো হয়েছে মাত্র ২৩ জন শ্রমিক দিয়ে। অথচ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে ৩০ শ্রমিকেরই। এ প্রকল্পের কর্মরত শ্রমিকেরা জানান, পানি সেচের কথা বলে ইউপি সদস্য ফিরোজ মিয়া তাদের কাছ থেকে ১শত ৮০ টাকা করে নিয়েছেন। তাছাড়াও প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে সপ্তাহে ৫০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন আগে মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে এ প্রকল্পে আরো তিন দিন কাজ বন্ধ রাখা হয়। এ বিষয়টি পিআইওকে জানানো হলেও তিনি কোন ব্যবস্থা নেননি। গত ৩০ ডিসেম্বর কালীকচ্ছ ইউনিয়নের “শাহপুর আহাদ মেম্বারের বাড়ি হইতে জিনু মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত” প্রকল্পে গিয়ে দেখা গেছে এখানে ৩০ শ্রমিকের স্থলে কাজ করানো হচ্ছে মাত্র ১৫ শ্রমিক দিয়ে। প্রকল্প সভাপতি স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আহসান আলী বলেন, কিছু শ্রমিক কাজে আসেনি। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ প্রকল্পে মজুরি উত্তোলন করা হয়েছে ৩০ শ্রমিকের। প্রকল্পে শ্রমিক তালিকায় গলানিয়া গ্রামের ইউপি সদস্যের মেয়েসহ ধনাঢ্য পরিবারের অনেকেরই নাম রয়েছে। এসব শ্রমিকের টাকা উত্তোলনের পর স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন ইউপি সদস্য ভাগবাটোয়ারা করে নেন। গত ২৯ ডিসেম্বর শাহজাদাপুর ইউনিয়নের “দেওড়া বাজার সংলগ্ন হান্নান মিয়ার বাড়ি হইতে আনোয়ার হোসেন মোল্লার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত” প্রকল্পে দেখা যায় ৩৯ শ্রমিকের স্থলে কাজ করছেন ৩৩ জন শ্রমিক। এদের মধ্যে প্রাইমারী স্কুল পড়–য়া কয়েকজন শিশু শ্রমিক মাটি কাটার কাজ করছে। প্রকল্প সভাপতি স্থানীয় ইউপি সদস্যা ফিরোজা বেগম এ বিষয়ে সন্তোষজনক কোন জবাব দেননি। ২৯ ডিসেম্বর শাহজাদাপুর গ্রামের “অলি চেয়ারম্যানের বাড়ি হইতে বুথনাথের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত” প্রকল্পে গিয়ে কোন শ্রমিক পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা জানান, গ্রামের জনগুরুত্বপূর্ণ এই রাস্তায় কাজ না করিয়ে ইউপি সদস্য মো. মফিল মিয়া খাদেমের সেচ পাম্পের সুবিধার্থে মাঠে শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হয়েছে। প্রকল্পে ২০ শ্রমিকের স্থলে কাজ করেছে মাত্র ১৪ জন শ্রমিক। এদের মধ্যে চারজন শিশু শ্রমিক রয়েছে। প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্যা আছিয়া বেগম কাগুজে উল্লেখিত প্রকল্প রেখে অন্যস্থানে শ্রমিক দিয়ে মাটি ফেলা প্রসঙ্গে বলেন, এলাকার প্রভাবশালী ইউপি সদস্য মফিল মিয়া খাদেমের নির্দেশে এই মাঠের রাস্তায় কর্মসূচীর শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়েছে। বিষয়টি পিআইও সাহেব অবগত আছেন। তবে এ বিষয়ে ইউপি সদস্য মফিল মিয়া খাদেম বলেন, আমি ওইস্থানে মাটি ফেলতে কাউকে বলেনি। ইউপি সদস্যা আছিয়া বেগম তার মনগড়া সিদ্ধান্তে শ্রমিক দিয়ে কাজ করিয়েছেন। গত ২৬ ডিসেম্বর পাকশিমুল ইউনিয়নের “ভূইশ্বর চুংগা বিল হইতে বকদরের বিল পর্যন্ত রাস্তা মেরামত ও পাকশিমুল হাজী শিশু মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় হইতে লাম্বাভিটা পর্যন্ত রাস্তা মেরামত” প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায় এখানে ৬৩ শ্রমিকের মধ্যে কাজ করছেন মাত্র ২৮ জন শ্রমিক। এদের মধ্যে তিনজনই শিশু শ্রমিক। প্রকল্প সভাপতি স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল মোতালিব বলেন, ভূইশ্বর এলাকায় প্রকল্পে ১৭ জন শ্রমিক কাজ করছে। সে কাজের দেখা শুনা করছেন ইউপি সদস্য আবুল বাশার। আর বাকি শ্রমিক দিয়ে পিআইও সাহেবের অনুমতিতে আমাদের পারিবারিক একটি কবরস্থানে মাটি ফেলা হচ্ছে। তবে তিনি (ইউপি সদস্য মোতালিব) সেই কবরস্থান গ্রামের কোথায় অবস্থিত তা দেখাতে পারেননি। ঘটনাস্থল থেকে মুঠোফোনে এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করলে পিআইও রইছ উদ্দিন মুকুল জানান, প্রকল্প ছাড়া অন্য কোন স্থানে শ্রমিক দিয়ে কাজ করাবেন এমন অনুমতি আমি কাউকে দেয়নি। এদিকে ভূইশ্বর এলাকায় প্রকল্পে গিয়ে খোঁজ করেও ওই ১৭ শ্রমিককে পাওয়া যায়নি। তবে ইউপি সদস্য আবুল বাশার দাবি করেছেন ১৭ জন নয় ১২ জন শ্রমিক দিয়ে মাটি ফেলে মাঠের মাঝ এলাকায় নদীতে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। বাকি শ্রমিক কাজে আসছে না। অপরদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্প সভাপতি ৬৩ শ্রমিকের মজুরির টাকা উত্তোলন করে আসছেন। গত ২৩ ডিসেম্বর উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের “শাখাইতি আজিজ সর্দারের বাড়ি হইতে দেওবাড়িয়া চকবাজার ভায়া ঈদগাহ পর্যন্ত রাস্তা পুনঃ নির্মান” প্রকল্পে গেলে কর্মরত শ্রমিক হেলাল, শামীম, জোবায়েদসহ অনেকে জানান, এ প্রকল্পে ১৪ থেকে ১৭ জন শ্রমিক কাজ করছে। এদের মধ্যে অনেকেরই ব্যাংক হিসাব নেই। তারা প্রকল্পে চুক্তিভিত্তিক মজুরিতে কাজ করছেন বলে শ্রমিকেরা জানিয়েছেন। অপরদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ প্রকল্পে ৩৬ জন শ্রমিক কাজ করার কথা। ব্যাংক থেকে ৩৬ শ্রমিকের মজুরিই উত্তোলন করা হয়েছে। সেদিন (২৩ ডিসেম্বর) এ প্রকল্পে পিআইও রইছ উদ্দিন মুকুলকে উপস্থিত দেখা গেলেও তিনি প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে সাংবাদিকদের নানাভাবে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। তবে প্রকল্প সভাপতি স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আকবর আলী দাবি করেন নিয়ম অনুযায়ী কাজ করানো হয়েছে। পিআইও সব অবগত আছেন। এদিকে সদর ইউনিয়নের “বড্ডাপাড়া আবদুল ওয়াহাব মাস্টারের বাড়ি হইতে হাবু সর্দারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত এবং উচালিয়াপাড়া গ্রাম হইতে ঈদগাহ পর্যন্ত রাস্তা মেরামত” প্রকল্পে ৪৫ জন শ্রমিক। এলাকার লোকজন জানান, এই দু’টি প্রকল্পে মাত্র ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়েছে। শ্রমিক তালিকায় অনেক স্বচ্ছল পরিবারের লোকের নাম রয়েছে। কাগুজে কলমে শতভাগ হাজিরা দেখিয়ে ৪৫ শ্রমিকের মজুরির টাকা উত্তোলন করে তা ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য জয়নাল আবেদীন নিজে আরো লাভবান হওয়ার জন্য মাঝে মধ্যে কর্মসংস্থান কর্মসূচীর শ্রমিক দিয়ে তার ব্যক্তিগত অন্য উন্নয়ন বরাদ্দ প্রকল্পে কাজ করিয়েছেন। তবে ইউপি সদস্য মো. জয়নাল আবেদীন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এছাড়াও উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচীর প্রকল্পকাজে চরম অনিয়ম-লুটপাট হয়েছে বলে এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে। এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. রইছ উদ্দিন মুকুল বলেন, উপজেলায় কর্মসূচীর সব প্রকল্পে নিয়মমাফিক কাজ হয়েছে। কোথাও কোন অনিয়ম-লুটপাট হয়নি। কিছু ছোটখাটো অনিয়ম ধরা পড়েছিল তা আমরা সংশোধন করে ফেলেছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিছুজ্জামান খাঁন বলেন, কিছু অনিয়মের কথা আমি জেনেছি। তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

Check Also

কুমিল্লায় তিন গৃহহীন নতুন ঘর পেল

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ– কুমিল্লা সদর উপজেলায় গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে ৪নং আমড়াতলী ইউনিয়নের গৃহহীন নুরজাহান বেগম, ...

Leave a Reply