আলোর পথের দিশারি- দি হাঙ্গর প্রজেক্ট -বাংলাদেশ ——-কাজী কোহিনূর বেগম তিথি

নারী নেতৃত্ব বিকাশে – দি হাঙ্গর প্রজেক্ট – বাংলাদেশের বিশেষ অবদান অনস্বীকার্য। যারা আজ নারী নেতৃত্বের ট্রেনিং করেছে তারা সবাই আজ নিজের এবং সমাজের কল্যানের জন্য কিছু না কিছু ভুমিকা পালন করে চলেছে। এই ট্রেনিং আমার লেখার শক্তিকে আরো বেগবান করেছে। যার জন্য আমার লেখনীর মাধ্যমে আমাদের এই বহুল সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত দেশের জন্য ক্ষুদ্র উদ্যেগে কিছু দেওয়ার চেষ্টা করতে পারছি। সেজন্য দি হাঙ্গার প্রজেক্ট – বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ড: বদিউজ্জামান স্যারকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। দি হাঙ্গর প্রজেক্ট -বাংলাদেশ নারীদের আলোর পথ দেখিয়েছে। একটা মিটিং এর আলোচনা থেকে আমরা তা পর্যালোচনা করতে পারি।

গত ২২শে ডিসেম্বর ২০১২ তারিখে দি হাঙ্গর প্রজেক্ট অব বাংলাদেশ এর উদ্যেগে নারী নেত্রীদের একটা Followup Meeting হয়। নারী নেত্রীর ট্রেনিং থাকায় আমার ঐ মিটিং এ atten করার সৌভাগ্য হয়েছিল । Meeting এর আলোচ্য বিষয় ছিল – জেন্ডার এবং বিশ্বায়ন।
বিশ্বায়ন বা Globalization কি? বিশ্বায়নে জেন্ডর প্রেক্ষাপট ইত্যাদি । বিষয়বস্তু থেকে আমি একটু আলোচনা করছি। আদি নর-নারী সুদূর অতীতে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে যাত্রা শুরু করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। এভাবে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব হয়েছে। মানুষের গায়ের রং, জাতীয়তা, ধর্ম, ভাষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তৈরী হয়েছে নানামুখি সংঘাত, নিপীড়ন, নির্যাতন ও বৈষম্য। যদিও কোন মানুষই নির্ধারন করে না যে, সে কোন ধর্ম, কোন গোত্র , কোন রং এ সে জন্মাবে- এটা প্রকৃতিগত ভাবে নির্ধারিত হয়। তবুও মানবজাতির ইতিহাসের এক বিরাট অধ্যায় জুড়ে রয়েছে জাতিতে-জাতিতে, ধর্মে -বর্নে যুদ্ধ আর সংঘাত। সেজন্য মানবজাতির ঐক্যের জন্যই বিশ্বায়ন কথাটার উদ্ভব হয়েছে।
পৃথিবীর ৬৭০ কোটি মানুষের অর্ধেকেরও বেশী দরিদ্র । আর আমাদের দেশে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ৭ কোটি দরিদ্র । এবং এর কারন সম্পদের অসম ব্যবহার ও অসম বন্টন।
দেখা যাচ্ছে, চলমান বিশ্বায়ন পৃথিবীকে দারিদ্রের অভিশাপ থেকে রক্ষা করতে পারছে না। আজ পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, সারা পৃথিবীর সম্পদ সঞ্চিত হচ্ছে মুষ্টিমেয় বহুজাতিক কোম্পানির হাতে। ফলে বিশ্বায়নের সুযোগ ও সুফল বন্টিত হয়েছে অসমভাবে, ধনী আরও ধনী, গরিব আরও গরিব হয়েছে। বিশ্বায়নের ফসল উন্নত দেশগুলোর ঘরেই গিয়েছে। আর উন্নয়নশীল, অনুন্নত বা দরিদ্র দেশগুলো এর খেসারত দিয়েছে। তবে নারীর জীবনে তা ভিন্নভাবে তীব্র প্রভাব ফেলেছে। কারন দারিদ্র তথা অনুন্নয়নের অভিঘাত সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত করে সমাজের সবচাইতে পিছিয়ে পড়া অংশকে। আর নারীরা হলেন দরিদ্রের চাইতেও দরিদ্র। ফ্রেডারিক এঙ্গেলস্ এর ভাষায়- ” নারীরা হলেন সর্বহারার চাইতেও সর্বহারা” ।

দারিদ্রের নারীমুখীকরন (Feminization of poverty ) তাই আজ একটি বৈশ্বিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দরিদ্রের মধ্যে নারী -পুরুষ উভয়ই রয়েছে , সরল স্বীকারোক্তি এখন আর যথেষ্ট নয়। কেননা দারিদ্রের একটি জেন্ডার প্রেক্ষিত রয়েছে। দেখা যায় নারীরা সামঞ্জস্যহীনভাবে দারিদ্র। নারী এবং পুরুষ দু’জনের দরিদ্র হবার কারন এক নয়। ভিন্ন ভিন্ন কারনে নারী ও পুরুষ দারিদ্রের সম্মূখীন হয়। নারী ও পুরুষের মধ্যকার অসম ক্ষমতা সম্পর্কে এবং পুরুষের তুলনায় নারীর নানামুখী ভূমিকা ও দায়-দায়িত্ব পালনের জন্য দারিদ্র প্রক্রিয়ার নেতিবাচক প্রভাব নারীর ওপরই বেশি পড়ছে। তবে দারিদ্রের নানামুখীকরনের অর্থ কেবল এই নয় যে, সংখ্যার দিক দিয়ে পুরুষের চাইতে নারীরা অনেক বেশী গরীব ।বরং নিজেকে ও সন্তানকে দারিদ্রের খপ্পর থেকে রক্ষা করতে গিয়ে নারীদের যে তীব্র ও নিদারুন
দুর্দশা পোহাতে হয়, সেই সত্যকেও তা প্রকাশ করে। এছাড়া দারিদ্রের দরুন অপুষ্টিজনিত প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যাসহ আরো অনেক ঝুঁকির সম্মুখিন হয় নারীরা। প্রসবকালীন সময়ে বিশ্বে প্রতিমিনিটে একজন নারীর মৃত্যু ঘটে। এসব হতভাগা নারীদের ৯৯ ভাগ হল উন্নয়নশীল দেশগুলোর । আর তাই দেখা যায়, দারিদ্র যখন ছোবল মারে তখন নারীরাই সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়ে।
শ্রেণী , জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে দেশে দেশে আজ নারী প্রধান পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। পরিবারের জীবিকা ও অস্তিত্ব ক্রমাগত ভাবে নারীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। বিশ্বায়নের ফলে সৃষ্ট দ্রুত সামাজিক অস্থিরতা ও পরিবারের ভাঙ্গন নারী প্রধান পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি করছে। যৌতুক প্রথাসহ নানা ধরনের নারী নির্যাতনের ফলে একদিকে যেমন বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ছে, তেমনি তা নারী প্রধান পরিবারের জন্ম দিচ্ছে । নারীরা সন্তানের ভরন-পোষনের দায় মাথায় নিয়ে জীবন সংগ্রামে লিপ্ত হচ্ছে। অন্যদিকে গঙ্গা, খরা, বন্যার মতো নানা বিরুপ পরিস্থিতিতে পরিবারের পুরুষেরা নারী ও সন্তান ফেলে কাজের আশায় পাড়ি জন্মাচ্ছে অন্যত্র। ফলে পরিত্যক্ত সন্তান ও পরিবারের বোঝা নিয়ে নারী প্রধান পরিবারগুলো জীবন সংগ্রাম শুরু করেছে। অন্যদিকে আবার অনেক দেশে যুদ্ধবিগ্রহ ও সশস্ত্র সংঘাতের দরুন পরিবারের পুরুষের জীবনহানি ঘটায় সে- সব দেশে নারী প্রধান পরিবারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে।

অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্নতা অর্জনের জন্য নারী সমাজ প্রাতিষ্ঠানিক -অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে অর্থ উপার্জনের জন্য ঝুঁকে পড়েছে। এভাবে অনুন্নত বিশ্বে শ্রমশক্তির ব্যাপক নারীমুখীকরন ( Feminization Of Labour Force) ঘটেছে। নাম মাত্র মজুরীর বিনিময়ে নারীর সস্তাশ্রমকে এখানে নিংড়ে নেওয়া হচ্ছে। নিয়োগ ও পদোন্নতির বেলায় অসম মানদন্ড, প্রশিক্ষনের অসম সূযোগ, সমান কাজের অসম মজুরি ঋন ও উৎপাদনমূলক সম্পদ লাভের অসম সূযোগ, নিদৃষ্ট কতকগুলি পেশায় যোগদান নিষিদ্ধিকরন (Occupational Segregation), অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহনে অসম অংশগ্রহন (আই এলও তথ্যমতে নারীদের মজুরি পুরুষের তুলনায় প্রায় ২০ থেকে ৫০ ভাগ কম) নারীদের ইত্যাদি হল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্যের আংশিক চিত্র মাত্র। আবার- নারীরা আয়ের কাজেও জড়িত হবার পরেও রান্না-বান্না, জ্বালানিও পানি আনা, কাপড় ধোয়া, ঘর- বাড়ি পরিস্কার, শিশু-বয়স্ক অসুস্থদের দেখাশুনা এসব বেসরকারি(পারিবারিক) কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখছে। অর্থ্যাৎ, উপার্জনের কাজে নারীরা পুরুষকে সহযোগীতা করলেও – ঘরের কাজে নারীরা পুরুষদের কাছ থেকে সেভাবে সহযোগীতা পাচ্ছে না।

এছাড়াও বিশ্বের সর্বত্র এখনো ’নারীর’ কাজ বা ’পুরুষের কাজ’ এভাবে চিহ্নিত করে অর্থনৈতিক শ্রমকে লিঙ্গীয় ভিত্তিতে বিভাজিত করা হয়ে থাকে।:যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে ৫০০ ধরনের কৃষি বহির্ভূত পেশার প্রায় ৪৫ শতাংশ ভাগ শ্রমশক্তি লিঙ্গীয় ভিত্তিতে গঠিত, যেখানে হয় শুধু নারী নয়তো কেবল পুরুষ মোট শ্রমশক্তির ৮০ ভাগ। জাপানে দিবাযতœ কেন্দ্র, হাসপাতাল কর্মী, নার্স, কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক, গৃহকর্মী) (House- keeper), পেশাদার আনন্দদানকারী ইত্যাদি পেশায় ৮০ ভাগই হলো নারী।

তাছাড়া Meeting — এ নারীর স্থানান্তর বা অন্যত্র গমন বাড়ছে, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বৃদ্ধি, যৌন ব্যবসার ভয়াবহতা বিস্তার, নারীকে পণ্য ও যৌন বস্তুতে পরিনত করা এবং তার নেতিবাচক চিত্রায়ন, সৌন্দর্য বানিজ্যের দ্রুত প্রসার, দ্বন্ধ- সংঘাত বৃদ্ধি এবং নারী তার প্রথম টার্গেট, নারীর বিরুদ্ধে বিজ্ঞান- প্রযুক্তির অপব্যবহার, বিশ্বায়ন : সমস্যা এবং সম্ভাবনা, সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ ও জেন্ডার ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়। পরিশেষে আলোচনার বিষয় বস্তুর সূত্র ধরে আর একটু বলব, প্রচলিত বিশ্বায়ন ক্ষুধা, দারিদ্র, বৈষম্য, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, ভোগবাদ, অপসংস্কৃতি ইত্যাদি নেতিবাচক প্রবনতার বিস্তার ঘটালেও এর একটি অমিত সম্ভাবনার দিক ও রয়েছে। বিশ্বায়নের ফলে মানবাধিকার, গনতন্ত্র, সমতা, ন্যায় – নীতি ইত্যাদি চেতনাও আজ সঞ্চারিত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। বিশ্বায়নকে আরো মানবিক, গনতান্ত্রিক ও সমতাধর্মী করার দাবি উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় নারী – পুরুষের সমতা এবং নারীবাদী চিন্তা -চেতনাও বিকশিত করছে বিশ্বায়ন। বিভিন্ন দেশে এ সংক্রান্ত জ্ঞান, তথ্য ও তৎপরতার অভিজ্ঞতা বিনিময় আজ সহজ হয়ে পড়েছে। যেহেতু বিশ্ব ব্যবস্থা বিকাশের অমোঘ পরিনতি হিসেবে বিশ্বায়নকে এড়াবার কোন পথ নেই। সেহেতু আমাদের বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রবনতাকে প্রতিহত করে নারীর অগ্রগতির স্বার্থে এর সুযোগগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। একদিন আসবে যেদিন বাংলাদেশের এবং পুরা বিশ্বের প্রতিটি ঘরে ঘরে নারী নেত্রী থাকবে যারা পরিবারের-সমাজের এবং রাষ্ট্রের কল্যানে স্বীয় মর্যাদায় বিশেষ ভুমিকা পালন করবে আমার বিশ্বাস।

kazitithi@gmail.com
কাজী কোহিনূর বেগম তিথি
লেখিকা এবং সমাজকর্মী

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply