তিতাসবাসীর আতংক ও উৎকন্ঠার বছর-২০১২

নাজমুল করিম ফারুক, তিতাস (কুমিল্লা) প্রতিনিধিঃ—
একের পর এক খুন, অপহরন, ধর্ষন, বন্দুকযুদ্ধ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, লুটতরাজ, ভাংচুর, ছিনতাই. চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, মাদকদ্রব্যের অবাধ বিচরণ, থানার অভ্যন্তরে দাগী সন্ত্রাসীদের আনাগোনা, দালালদের উৎপাত, মিথ্যা সাজানো মামলা দিয়ে নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে হয়রানী, ওয়ারেন্টভূক্ত সন্ত্রাসী ও পুলিশের সামনে দাগী সন্ত্রাসীরা আগ্নেয়াস্ত্র উচিয়ে নিরীহ নিরপরাধ মানুষের উপর গুলিবর্ষনসহ আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সন্ত্রাসীদের মধ্যে পক্ষে বিপক্ষে হামলা, ভাংচুর, লুটতরাজ ও সন্ত্রাসীদেরকে প্রকাশ্যে পুলিশের মদদ দেয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে কুমিল্লার তিতাস উপজেলার সর্বত্র। এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সাধারন মানুষসহ স্থানীয় রাজনীতিক, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী এবং নানা পেশার মানুষ। অনেকেই হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, হামলা ও মিথ্যা মামলার এক অজানা আতঙ্কে ভুগছেন বলে এলাকার শত শত মানুষের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের প্রথম হত্যাকান্ডটি ঘটে উপজেলার দড়িকান্দি গ্রামে। ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হালিমা আক্তার (২২) কে তার স্বামী শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। ৬ জানুয়ারী ভাটিবন্দ গ্রামে চুরি করতে গিয়ে গণপিটুনীতে আহত বালুয়াকান্দি গ্রামের ওয়ারেন্টভূক্ত আসামী মোস্তফা (৩৫) কে জেলহাজতে প্রেরণ করার পর ১০ জানুয়ারী সে মৃত্যুবরণ করে। ২২ মার্চ সীমানা বিরোধ নিয়ে খুন হন আসমানীয়া গ্রামের মোঃ হানিফ মিয়া (৪০)। ২৭ মার্চ জুয়া খেলার টাকার জন্য শ্রী নারায়নকান্দি গ্রামের মোকবল হোসেন তার স্ত্রী নার্গিস আক্তারকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলার অভিযোগ উঠে। ১৭ এপ্রিল চরবাটেরা গ্রামে প্রতিপক্ষের হামলায় টেটাবিদ্ধ হয়ে প্রতিবন্ধি শিশু আরিফ খুন হয়। ২৩ জুলাই মাছিমপুর গ্রামে ছোট ভাইয়ের হাতে খুন হন হায়দার আলী (৪৮)। ২৭ আগষ্ট থানা পুলিশ জগতপুর তালুকপাড়া জলাশয় থেকে উদ্ধার করে নয়নের (২৬) লাশ। ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে রহস্যজনকভাবে খুন হয় তেতুইয়ারামপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান হাবু (২৫)। ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে সন্ত্রাসীরা জবাই করে হত্যা করে শোলাকান্দি গ্রামের মাদ্রাসা পড়–য়া ইমন হোসেন (১৬) কে। ৩ ডিসেম্বর কলাকান্দি গ্রামের পশ্চিম পাশে ফসলি জমি থেকে কলাকান্দি গ্রামের মৃত কালু মিয়া বেপারীর ছেলে আবদুল আলিম অপু (৩০) এর জবাই ও হাত পায়ের রগ কাটা অবস্থায় লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর উত্তর শ্রী নারায়নকান্দি ও উত্তর বলরামপুরের মাঝামাঝি বিল থেকে অজ্ঞাত এক যুবতীর লাশ উদ্ধার করা হয়।
২০১২ সালের তিতাসের আলোচিত গ্রাম শাহপুর। এ বছরের প্রথম ৩১ জানুয়ারী পানি সেচকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ৫ জন আহত হয়। ১২ ফেব্র“য়ারি বন্দরামপুর গ্রামে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বর্তমান ইউপি সদস্য রত্মা আক্তারের জায়গা দখল ও ঘর নির্মাণ করে প্রতিপক্ষ। ৪ মার্চ কালাইগোবিন্দপুর গ্রামের যুবলীগ নেতা নাজমুল হাসান কিরণকে কুপিয়ে আহত করে সন্ত্রাসীরা। ১৬ মার্চ রঘুনাথপুর সাতানী গ্রামে ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা তাছলিমা আক্তারকে লাথি দিয়ে গর্ভপাত ঘটায় প্রতিপক্ষ। ১৩ এপ্রিল দুস্কৃতকারীরা ভেঙ্গে ফেলে উপজেলা পরিষদের নির্মাণাধীন প্রাচীর। ১২ জুন রাজাপুর গ্রামের আবুল হাসেম বেপারীকে পিটিয়ে ২ লাখ টাকা ছিনতাই করে ছিনতাইকারীরা। ৩ জুলাই টেন্ডারবাজীকে কেন্দ্র করে পাওয়ার প্লান্টে ঘটে সংঘর্ষের ঘটনা। ৭ জুলাই প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সংঘর্ষ ঘটে বালুয়াকান্দি গ্রামে। ২৪ জুলাই বাঘাইরামপুর গ্রামে নুরুজ্জামানকে পিটিয়ে ছিনিয়ে নেয় দু’লাখ টাকা। ২৭ জুলাই শাহপুর গ্রামের দিনভর চলে গোলাগুলির ঘটনা, এতে আহত হয় ১৫ জন। ২৯ জুলাই উক্ত গ্রামে পুনরায় সংর্ঘষে গুলিবিদ্ধ হয় ৯ জন। ১১ আগষ্ট উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের আহ্বায়ক নূর নবী ও তার সহকর্মীকে কুপিয়ে আহত করে সন্ত্রাসীরা। ৩১ আগষ্ট শাহপুর গ্রামে দু’গ্র“পের সংঘর্ষে ১৭ জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হয় ৩৩ জন। ২৬ অক্টোবর শাহপুর গ্রামে ঘটে সংঘর্ষের ঘটনা এতে এক সাংবাদিকের বসতঘর ভাংচুর করে লুটপাট চালানো হয়। ২৭ অক্টোবর ঈদের দিন রাতে মাছিমপুর গ্রামের নাপিত রামপ্রসাদকে কুপিয়ে জখম করে দুস্কৃতিকারীরা। ২ নভেম্বর কলাকান্দি গ্রাম ও বাজারে নাছির বাহিনীর লোকজন পিটিয়ে প্রতিপক্ষের ১৬ জনকে আহত করে। কয়েক দফা উত্তেজনার পর ৭ ডিসেম্বর ভিটিকান্দি ইউনিয়নে গোমতী নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণকে কেন্দ্র করে দোকানপাট বসতঘর ভাংচুর মালামাল লুটপাট ও নির্মাণ সামগ্রীতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৫ রাউণ্ড ফাঁকা গুলিও ছুড়ে। সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর দুলারামপুর গ্রামে সীমানা বিরোধে নিয়ে দু’গ্রুপের সংর্ঘষে ৫ জন আহত হয়।
এ বছর উপজেলার দক্ষিণ বলরামপুর গ্রামের তাসলিমা আক্তার, সাহাবৃদ্দি গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে রুনা আক্তার, মজিদপুর গ্রামের প্রতিবন্ধী হাওয়া আক্তার, শাহবৃদ্ধি গ্রামের প্রতিবন্ধি কুলসুম গণধর্ষণের শিকার হন।
এ বছর এসিড নিক্ষেপের শিকার হন একলারামপুর গ্রামের আমির হোেেসন ও স্ত্রী মিনরা বেগম এবং উলুকান্দি গ্রামের মৃত আশাদ মিয়ার মেয়ে রুফিয়া আক্তার। গত বছর উপজেলার উত্তর শ্রী নারায়নকান্দি, নারায়নপুর ও গোপালপুর গ্রামের ৩ জনকে অপহরণ ও দক্ষিণ শ্রী নারায়নকান্দি গ্রামের এক শিশুকে গুম করার অভিযোগ উঠে।
গত বছর জুড়ে আলোচনায় ছিল উপজেলায় ভারতীয় নিষিদ্ধ পণ্য ফেনসিডিল, বিয়ার, ইয়াবা, গাঁজার বিস্তার এবং বিক্রেতা ও সরবরাহকারীদের অবাধ বিচরণ। ২২ ফেব্র“য়ারি কলাকান্দি বাজারস্থ মোতালেবের ওয়ার্কসপের সামনে থেকে ১২ বোতল ফেন্সিডিল ও ৫ কেজি গাঁজাসহ আটক করা হয় ৩ মহিলা ও মোটরসাইকেলসহ এক ভূয়া পুলিশকে। ১১ এপ্রিল মাছিমপুর গ্রামের মাদক সম্রাট হাবিব (২৫) কে থানা পুলিশ বাতাকান্দি বাজারের মা বস্ত্রবিতান থেকে আটক করে দিনভর নাটকীয়তা শেষে সন্ধ্যায় মাদকসেবী হিসেবে মোবাইল কোর্টে ৪ হাজার টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দেয়। ১৩ মে রাতে বাতাকান্দি বাজার সংলগ্ন মধ্য আকালিয়া থেকে ৮০ বোতল ফেন্সিডিলসহ মাদক ব্যবসায়ী মিলন (৩০) আটক হয়। ১৯ মে বাতাকান্দি বাজারে মায়ের দোয়া মোবাইল এন্ড গিফট কর্ণার থেকে ৩০ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার করা হয়। ২৬ জুন হাড়াইকান্দি অভিযান চালিয়ে ৮ গাঁজাসেবীকে আটক করে পুলিশ। জুন মাসেই র‌্যাব-১১ একটি টিম পৃথকভাবে অভিযান চালিয়ে জিয়ারকান্দি নোয়াগাঁও গ্রামের মোঃ হান্নান মিয়ার স্ত্রী নাজমা বেগমকে ৮৫ পিস ইয়াবা এবং কড়িকান্দি গ্রামের আঃ রাজ্জাকের ছেলে আবুল হোসেন আবুকে ৩০ ক্যান বিয়ারসহ আটক করে। ১৩ অক্টোবর চরকুমারীয়া বাজারে স্থানীয় লোকজন ১ কেজি গাঁজাসহ আটক হয় বুড়িচং থানার মোঃ রব খাঁনের ছেলে মোঃ শাহিন খাঁন (২৯)। ১৮ অক্টোবর অপহরকারীসহ ৬ মাদকসেবীকে আটক করা হয়। ২৬ অক্টোবর বাতাকান্দি বাজার সংলগ্ন কাঠ পট্টি থেকে দক্ষিণ বলরামপুর গ্রামের মোঃ জামাল হোসেনের ছেলে সাইদুল ইসলাম (২৪) কে ৩০ বোতল ফেন্সিডিলসহ আটক করা হয়। ২১ নভেম্বর গাজীপুর থেকে আটক করা হয় ৫ মাদকসেবীকে। ২৩ ডিসেম্বর শাহপুর গ্রামের মাদক ব্যবসায়ী সেকান্দর আলীকে ৪৮ ক্যান বিয়ারসহ আটক করে র‌্যাব-১১। সর্বশেষ অবৈধ সিএনজি কেনার দায়ে ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করে কড়িকান্দি গ্রামের সাইদুর রহমান ভূঁইয়াকে।
এছাড়াও ২৫ ফেব্র“য়ারি দিবাগত রাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় তলার ষ্টোর রুম থেকে তালা আটকানোর আংটা কেটে ২ লক্ষ ৭০ হাজার টাকার ঔষধ চুরি হয়। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পোড়াকান্দি চকের বাড়ীতে নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের নির্মাণ সামগ্রী চুরি হয়। কড়িকান্দি বাজার থেকে ডাকাতি হওয়া প্রায় ৩ লাখ টাকার মালামাল নরসিংদীর পলাশ থেকে উদ্ধার এবং ৬ জনকে গ্রেফতার করে থানা পুলিশ। গৌরীপুর-হোমনা সড়কের কেশবপুর নামকস্থানে ২৯ মার্চ ডাকাতি করে লুন্ঠুনকৃত মালামাল ভাগাভাগিকালে দাউদকান্দি উপজেলার বানিয়াপাড়া নাথ বাড়ীর সামনের রাস্তার ডান পার্শ্বে ফসলী জমি থেকে ১৩টি মোবাইল সেট, ২টি হাতঘড়ি, ২৫ ইউরো বৈদেশিক মুদ্রা, নগদ ১২ হাজার টাকাসহ ডাকাত দলের ৫ সদস্যকে আটক করে তিতাস থানায় হস্তান্তর করে। ডিসেম্বর মাসে একই দিনে কড়িকান্দির ৫টি বাড়ীতে চুরিসহ বছর জুরে পুরো উপজেলায় আরো প্রায় ২০টি চুরির ঘটনা ঘটে।
বিশেষ করে ৮ এপ্রিল মাছিমপুর আর আর ইনিষ্টিটিউশন থেকে দুস্কৃতীকারীরা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে হুমকি দেয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি নামিয়ে ফেলতে। ২০১২ সালে উপজেলার আতংক হিসেবে জনমনে স্থান করে নেয় শাহপুর, কলাকান্দি, শোলাকান্দি, জিয়ারকান্দি (পাওয়ার প্লান্ট), গোপালপুর, দাসকান্দি ও হরিপুর গ্রাম। এছাড়াও রাজনীতি অঙ্গণে বিরাজ করে অস্তিরতা। বছর জুড়ে আওয়ামীলীগ বিএনপির সমাবেশস্থলে ১৪৪ ধারা জারি, বিএনপির গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পুলিশের বাঁধা, উপজেলা জামায়াতের আমির ইঞ্জি শামীম সরকার বিজ্ঞকে গ্রেফতারসহ সর্বশেষ বিএনপি-জামাতের অবরোধ হরতাল কর্মসূচী পালন নিয়ে উত্তাপ বিরাজ করে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply