সরাইলে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির ৮১ লাখ টাকার বরাদ্দ লোপাট

আরিফুল ইসলাম সুমন, সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) থেকেঃ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির প্রকল্পে লুটপাটের মহোৎসব চলছে। আর এ লুটপাটের সাথে সরাসরি জড়িত উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাবাবুরা। এ অভিযোগ করেছেন উপজেলার একাধিক জনপ্রতিনিধি, প্রকল্পে নিয়োজিত শ্রমিকসহ এলাকার লোকজন। তাদের অভিযোগ, প্রায় প্রকল্পকাজে তালিকা অনুযায়ী শ্রমিক উপস্থিতি কম। কিন্তু কাগুজে-কলমে শতভাগ শ্রমিক উপস্থিতি দেখিয়ে মজুরি উত্তোলনের পর তা বাগভাটোয়ারা করছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। নানা অজুহাতে শ্রমিকদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে টাকা-পয়সা। অনেক প্রকল্পে শিশুদের দিয়ে মাটি কাটার কাজ করানো হচ্ছে। সরকারি ছুঁটির দিন ছাড়া সপ্তাহে পাঁচ দিন প্রকল্পে কাজ করানোর কথা থাকলেও মাঝে মধ্যে কাজ বন্ধ রেখে শ্রমিক মজুরি উত্তোলনের পর বাগভাটোয়ারা করে নেওয়া হচ্ছে। সরাইল উপজেলা পরিষদ মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাহমুদা পারভীন বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম-লুটপাটের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এই উপজেলায় কর্মসূচির শুরু থেকেই অনিয়ম চলে আসছে। এখন কর্মসূচির কাজ প্রায় শেষের দিকে। তিনি বলেন, উপজেলার বিভিন্ন প্রকল্পে শ্রমিক তালিকায় অনেক ধনাঢ্য পরিবারের সদস্যদের নাম রয়েছে। তারা কখনো কাজে আসে না। কিন্তু দৈনিক ১৭৫ টাকা হারে প্রত্যেক সপ্তাহে সেইসব শ্রমিকদের মজুরির টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। আমি নিজে কয়েকটি প্রকল্প পরিদর্শন করেছি। সেখানে শ্রমিক উপস্থিতি ছিল খুবই কম। বিষয়টি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) জানানো হয়। পরে জানতে পেরেছি সেই প্রকল্পগুলোর শ্রমিক হাজিরা কাগুজে-কলমে শতভাগ দেখিয়ে মজুরির টাকা উত্তোলন করা হয়। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দফতর সূত্রে জানা গেছে, এ উপজেলায় অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচীর প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৮১ লাখ ৪১ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। শ্রমিক সংখ্যা ১১৬৩জন। কাজ শুরু হয়েছে গত ১৭ নবেম্বর থেকে। প্রত্যেক শ্রমিক দৈনিক মজুরি পাচ্ছেন ১৭৫ টাকা করে। ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে শ্রমিক মজুরি প্রদান করা হচ্ছে। এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুইজন ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, শতভাগ স্বচ্ছতার মধ্যে কাজ করালেও সপ্তাহে বিল উত্তোলনের সময়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের কর্তাবাবুদের চাহিদা অনুযায়ী তাদের কমিশনের টাকা দিতে হয়। অপরদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রকল্প সভাপতি (ইউপি সদস্য) জানান, পিআইও অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে টাকা না দিলে তারা বিল ভাউচার ছাড় দেন না। নানাভাবে ইউপি সদস্যদের হয়রানি করেন তারা। প্রকল্পে যা-ই হচ্ছে তা সবই পিআইও’র পরামর্শে। সরেজমিন উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের “শাখাইতি আজিজ সর্দারের বাড়ি হইতে দেওবাড়িয়া চকবাজার ভায়া ঈদগাহ পর্যন্ত রাস্তা পুনঃ নির্মান” প্রকল্পে গেলে কর্মরত শ্রমিক হেলাল, শামীম, জোবায়েদসহ অনেকে জানান, এ প্রকল্পে ১৪ থেকে ১৭ জন শ্রমিক কাজ করছে। এদের মধ্যে অনেকেরই ব্যাংক হিসাব নেই। তারা এ প্রকল্পে চুক্তিভিত্তিক মজুরিতে কাজ করছেন বলে শ্রমিকেরা জানিয়েছেন। অপরদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ প্রকল্পে ৩৬ জন শ্রমিক কাজ করার কথা। ব্যাংক থেকে ৩৬ শ্রমিকের মজুরিই উত্তোলন করা হচ্ছে। তবে প্রকল্প সভাপতি স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আকবর আলী দাবি করেন নিয়ম অনুযায়ী কাজ করানো হচ্ছে। পিআইও সব অবগত আছেন। “রসুলপুর-আজবপুর রাস্তা পুনঃ নির্মাণ ও ঈদগাহ মাঠ ভারাট” প্রকল্পে ৩০ জন শ্রমিক। কিন্তু কাজ করানো হচ্ছে মাত্র ২৩ জন দিয়ে। অথচ টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে ৩০ শ্রমিকেরই। কর্মরত শ্রমিকেরা জানান, পানি সেচের কথা বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা তাদের কাছ থেকে ১শত ৮০ টাকা করে নিয়েছেন। তাছাড়াও প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে সপ্তাহে ৫০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি পিআইওকে জানানো হয়। তিনি উল্টো শ্রমিকদের শাসিয়েছেন। প্রকল্প সভাপতি মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, এখানে কাজ ভালোভাবে করানো হচ্ছে। কালীকচ্ছ ইউনিয়নের “শাহপুর আহাদ মেম্বারের বাড়ি হইতে জিনু মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত” প্রকল্পে ৩০ শ্রমিক। কাজ করানো হচ্ছে মাত্র ১২ থেকে ১৬ শ্রমিক দিয়ে। মজুরি উত্তোলন করা হচ্ছে ৩০ শ্রমিকের। এছাড়াও শাহজাদাপুর, অরুয়াইল, সরাইল সদর ইউনিয়নে কর্মসূচীর প্রকল্পে চরম অনিয়ম ও লুটপাট হচ্ছে বলে এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে। এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. রইছ উদ্দিন মুকুল বলেন, উপজেলায় কর্মসূচীর সব প্রকল্পে নিয়মমাফিক কাজ চলছে। কোথাও কোন অনিয়ম-লুটপাট হচ্ছে না। কিছু ছোটখাটো অনিয়ম ধরা পড়েছে তা আমরা সংশোধন করে ফেলেছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিছুজ্জামান খাঁন বলেন, কিছু অনিয়মের কথা আমি জেনেছি। তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

Check Also

কুমিল্লায় তিন গৃহহীন নতুন ঘর পেল

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ– কুমিল্লা সদর উপজেলায় গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে ৪নং আমড়াতলী ইউনিয়নের গৃহহীন নুরজাহান বেগম, ...

Leave a Reply