মাদক ব্যবসা ছেড়ে তারা আলোর পথে ফিরেছেন

আরিফুল ইসলাম সুমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেঃ
নূরুল ইসলাম। বয়স ৩০। ৬ মাস ধরে ধান, মরিচ চাষ, বাড়ির চারপাশে শাকসবজি ও পুকুরে মাছ চাষ নিয়ে ব্যস্ত তিনি। তার প্রতিবেশী জজ মিয়া (৪৫)। তারা দু’জনই ছিলেন মাদক ব্যবসায়ী। এখন তারা ফিরে এসেছেন স্বাভাবিক জীবনে।
মাদক ব্যবসায়ীদের স্বার্গরাজ্য খ্যাত বিজয়নগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে এমন ১২ ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া গেছে। বছর তিনেকের মধ্যে যারা বদলে ফেলেছেন নিজের পেশা। মাদক ছেড়ে আলোর পথে ফিরেছেন তারা। যাদের বেশিরভাগই এখন ব্যস্ত কৃষি কাজে। উপজেলার হরষপুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের জজ মিয়া বলেন, আগে দিনরাত শুধু বাঘ (আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্য) দেখতাম। একদিনও শান্তিতে খাইতে-শুইতে পারতাম না। এখন আমাদের কোন টেনশন নেই। ডাল ভাত খেলেও ভালো আছি। তিনি বলেন, একবার বাড়িতে র‌্যাব সদস্যরা অভিযান চালায়। কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতাম। এই বুঝি র‌্যাব এলো। একসময় সিদ্ধান্ত নিলাম র‌্যাব, বিজিবি, ডিবি পুলিশকে আর সুযোগ দেওয়া যাবে না। তাই নিজেই ছেড়ে দিলাম মাদক ব্যবসা। বর্তমানে ৩-৪ কানি জমিতে ধান চাষ করছি। এছাড়া ৪ টি গরু পালন করে এ থেকে দৈনিক ৭ লিটার দুধ বাজারে বিক্রি করছি। বাড়ির আশপাশে করেছি সবজি বাগান। এ দিয়ে চলে যাচ্ছে সংসার। ৩ মেয়ে ও ২ ছেলের ভরণপোষণে তেমন বেগ পেতে হচ্ছে না। জজ মিয়া আরো বলেন, ‘আগে রোজগার ছিল বেশি তবে সম্মান ছিল কম। ছেলে-মেয়েরা আমাকে নিয়ে লজ্জা পেত।’ চান্দুরা ইউনিয়নের আলাদাওদপুর গ্রামের ঝাড়– মিয়ার (৪৫) বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল গরুর খাবার দিতে ব্যস্ত তিনি। কেমন আছেন জানতে চাইলে একগাল হেসে বলেন, শান্তিতে আছি। কৃষি কাজের পাশাপাশি স্থানীয় একটি ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করেন তিনি। ৪ মেয়ে আর ৫ম শ্রেণীতে পড়–য়া একমাত্র ছেলে তার। বছর তিনেক আগে ঝাড়– মিয়া এ ব্যবসা ছেড়েছেন। এরই মধ্যে ২টি গরু কিনেছেন। ৩ কানি জমিতে করেন ধান চাষ।
শুধু তারই নন উপজেলার চান্দুরা ইউপির আলাদাওদপুর গ্রামের বাছির মিয়া (৪০), কালাসীমা গ্রামের তারা মিয়া (৫৫), আবুল কালাম (৩৫), আব্দুল কাইয়ুম (২৫), সভা চাঁন মিয়া (৫৫), চান্দুরা এলাকার শংকর রায় পোদ্দার (৫০)। সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামের রাকিব হোসেন (৪২), নয়াবাদী গ্রামের মাতু মিয়া (৫৫), পাহাড়পুর ইউনিয়নের কামাল মোড়া গ্রামের শাহআলম (৪২) সবাই এখন মাদক ব্যবসা ছেড়ে ফিরে এসেছেন স্বাভাবিক জীবনে। সভা চাঁন মিয়া বলেন, আগে নিজের বাড়িতে রেখে ফেন্সিডিল বিক্রি করতাম। রোজগার ভালই ছিল, তবে সব চলে যেত মামলার মধ্যে। এখন জমিজমা চাষ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে শান্তিতে আছি। দু’চার পায়সা জমাতেও পারি। আবুল কালাম বলেন, বছর ছ’য়েক আগে সুদের বিনিময়ে টাকা নিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলাম। কিন্তু ৩ মাস পর খালি হাতে দেশে ফিরে কোন কাজের সন্ধান পাচ্ছিলাম না। একসময় কতিপয় কয়েকজনের উৎসাহে এ পেশায় জড়িয়ে পড়ি। এখন সামাজিক অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এ জঘন্য ব্যবসা করলে মানুষ ধিক্কার দেন। নিজের কাছেও খারাপ লাগে। তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছি। নিজের মাদক ব্যবসা ছেড়ে দেওয়া প্রসঙ্গে আব্দুর বাছির বলেন, “ছেলে-মেয়েরা এখন বড় হয়েছে। তারা এসব ভালোবাসেনা। বড় মেয়ে কলেজে পড়ে। মেয়ে সাফ জানিয়ে দেয় ফেন্সিডিল বিক্রি না ছাড়লে গলায় দঁড়ি দিবে। এক সময় সে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল।”
বাছির মিয়া, আবুল কালাম, আব্দুল কাইয়ুম তিনজনই জানান, তারা মাদক ব্যাবসা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহযোগিতা করেছেন স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক। তাদেরকে পুলিশ সুপারের কাছে আত্মসমর্পনের ব্যবস্থাসহ এই সর্বনাশা ব্যবসা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত অনেককেই সাংবাদিকরা বুঝান।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই উপজেলার আরো অনেকেই আছেন যারা মাদক ব্যবসা ছাড়তে চান। কিন্তু অন্য ব্যবসায়ীদের চাপ এবং ভয়ে থাকেন তারা। তারপরও আত্মসমর্পনকারিদের দেখে আরো অনেকেই এই পথে আসার জন্য চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। বিজয়নগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রসুল আহামেদ নিজামী বলেন, বিজয়নগরের একটি বিশেষ এলাকা ছাড়া অনেকেই মাদক ব্যবসা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন পুলিশ সুপারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। তবে অনেকেই ভয়ে আমাদের কাছে আসতে চান না। আমরা তাদের আশ্বস্ত করতে চাই কেউ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চাইলে আমরা সব রকমের সহায়তা করবো। এ ব্যাপারে ১২ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্ণেল মাকসুদুল আলম বলেন, সীমান্তবর্তী বিজয়নগরে মাদক ব্যবসায়ীদের প্রভাব অনেক বেশি। সেখানে আমরা বিশেষ অভিযানের কথা ভাবছি। এ অবস্থায় যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে তাদের জন্য বিজিবির পক্ষ থেকে কর্মসংস্থানের চেষ্টা করা হবে। তাছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকা গুলোতে মাদক পাচার বন্ধে বিশেষ কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply