অভিযোগপত্র দাখিল:: সরাইলে আ’লীগ সন্ত্রাসীদের হাতে যেভাবে খুন হন ইকবাল আজাদ

সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) / ২০ ডিসেম্বর (কুমিল্লাওয়েব ডটকম)——
জনপ্রিয় নেতা ইকবাল আজাদের গলার নীচের অংশে বল্লম দিয়ে ঘাই মেরেছিল সরাইল আওয়ামীলীগের (সদ্য বহিস্কৃত) সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রফিক উদ্দিন ঠাকুর। বুকে ঘাই দেয় উপজেলা আওয়ামীলীগের (সদ্য বহিস্কৃত) সাংগঠনিক সম্পাদক মাহফুজ আলী। ইকবাল আজাদের পিঠের বাম পাশে ঘাই মারে যুবলীগ ক্যাডার মোকারম হোসেন সোহেল এবং পিঠের ডান পাশে বল্লম দিয়ে ঘাই দেয় সদর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের (সদ্য বহিস্কৃত) সাধারণ সম্পাদক ইসমত আলী। আর ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে নির্মম এ হত্যাকান্ডের হুকুম দিয়েছিলেন সরাইল আওয়ামীলীগের (সদ্য বহিস্কৃত) সভাপতি আবদুল হালিম ও সম্পাদক রফিক উদ্দিন ঠাকুর। এছাড়াও নৃশংস এ হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত বলে নতুন করে উঠে এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন (সরাইল-আশুগঞ্জ) থেকে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রকৌশলী মশিউর রহমান, সরাইল আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি মো. সাদেক মিয়া, আওয়ামীলীগ নেতা আনোয়ার হোসেন ওরফে আনব আলী, কামরুল ইসলাম ও আল এমরানের নাম। হত্যাকান্ডে আওয়ামী সমর্থিত শ্রমিক নেতা মিস্টার আলী অংশ নেয়। এসময় মিস্টার আলী ঘটনাস্থলে তার সিএনজি অটোরিকশা দিয়ে ইকবাল আজাদকে বহনকারী প্রাইভেটকারটির গতিরোধ করে এবং সড়কে ব্যারিকেড দেয়।
সরাইল আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এ.কে.এম ইকবাল আজাদ হত্যা মামলায় পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। হত্যা মামলার এজাহারনামীয় ২২ জনসহ মোট ২৯ জনের বিরুদ্ধে গত সোমবার কোর্ট পরিদর্শকের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ওই অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা ও সরাইল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাকির হোসেন। ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে মোট ৪২ জনের সাক্ষ্য-প্রমানে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ইকবাল আজাদের উপর হামলা ও হত্যা পরিকল্পনার সত্যতা পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানায়।
যেভাবে খুন হন ইকবাল আজাদ : গত ২১ অক্টোবর সন্ধ্যার দিকে সরাইল উপজেলা সদরের কুট্টাপাড়া গ্রামের বাড়ি থেকে ইকবাল আজাদ তার ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে সরাইল বাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই জাহাঙ্গীর আজাদ ও ছাত্রলীগ নেতা সানা উল্লা গিয়াস উদ্দিন সেলু। গাড়ির চালক ছিলেন (ব্যক্তিগত ড্রাইভার) আবদুর রউফ। সরাইল বিকাল বাজার এলাকায় স্থানীয় অন্নদা স্কুলের মোড় সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ডে গাড়িটি আসামাত্র মিস্টার আলী সিএনজি অটোরিকশা দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। এসময় (আওয়ামীলীগের সন্ত্রাসী) মামলার অন্যতম আসামি আবদুল হালিম ও রফিক উদ্দিন ঠাকুরের হুকুমে অভিযুক্ত সন্ত্রাসীরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ইকবাল আজাদের গাড়িতে হামলা করে এতে ভাঙচুর চালায়। এসময় ইকবাল আজাদ গাড়ি থেকে নেমে পড়লে রফিক ঠাকুর বল্লম দিয়ে ঘাই মারে। তিনি (ইকবাল) দৌড়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করলে সন্ত্রাসীরা তাকে ঝাপটে ধরে। তখন মাহফুজ আলী বল্লম দিয়ে ইকবাল আজাদের বুকে ঘাই মারে এবং আবদুল হালিম, আব্দুল জব্বার, ইদ্রিছ আলী ও ছাত্রলীগ ক্যাডার সিজার দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি মারপিট করে। সোহেল তার হাতে থাকা বল্লম দিয়ে ইকবালের পিঠে ঘাই মারে এবং ইসমত আলীও বল্লম দিয়ে পিঠে ঘাই দেয়। এসময় জাহাঙ্গীর আজাদ ও ছাত্রলীগ নেতা সেলু সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের কবল হতে রক্তাক্ত ইকবাল আজাদকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে সন্ত্রাসী মিজান ধাড়ালো দা দিয়ে জাহাঙ্গীর আজাদকে কুপ মারে এবং সন্ত্রাসী আব্দুল্লা বল্লম দিয়ে সেলুকে বাম চোখের নীচের অংশে ঘাই মারে। এসময় ক’জন সন্ত্রাসী গুরুতর আহত ইকবাল আজাদের গলায় ও বুকে পা দ্বারা পারা দিয়া ধরে রাখে এবং অন্যান্য সন্ত্রাসীরা বাইরাইয়া তার মৃত্যু নিশ্চিত করে বীরদর্পে চলে যায়। পরে স্থানীয়রা ইকবাল আজাদের নিথর দেহ হাসপাতালে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
যে কারণে খুন : সরাইল সদর ইউনিয়নের জনপ্রিয় ইউপি চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট ঠিকাদার ও পশ্চিম কুট্টাপাড়া গ্রামের বাসিন্ধা ছিলেন ইকবাল আজাদের বাবা আব্দুল খালেক। তিনি সমাজে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে গেছেন। ৭০’র জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামীলীগের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন তিনি। ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর এলাকার কিছু উছৃঙ্খল যুবক জনপ্রিয় নেতা আব্দুল খালেককে গুলি চালিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। মরহুম ধনাঢ্য পিতার রেখে যাওয়া বিশাল সম্পত্তি ও ব্যবসাকে কাজে লাগিয়ে শিল্পপতি বনে যান এ কে এম ইকবাল আজাদ। একসময় এগিয়ে আসেন সমাজ সেবায়। গরীব অসহায় মানুষদের নানাভাবে উপকার করতে থাকেন তিনি। ১৯৯০-৯১ সালে ইকবাল আজাদ আওয়ামীলীগ রাজনীতির সাথে জড়িত হন। ওই সালেই তিনি সরাইল উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হন। ২০০৩ সালে দলীয় পদ নিয়ে তার সাথে দূরত্ব বেড়ে যায় আব্দুল হালিম ও রফিক উদ্দিন ঠাকুর গংদের। এক সময় উভয় গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। সম্প্রতি ইকবাল আজাদ সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষনা দেন। তাছাড়া আগামি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন ইকবাল আজাদ। এছাড়াও দুর্নীতিবাজদের নানা অনৈতিক কর্মকান্ডে বাধা হয়ে দাঁড়ান তিনি। এসবই ইকবাল আজাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন বলেন, ’তদন্ত করতে গিয়ে মামলার বর্ণনা অনুযায়ি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। খুনের ঘটনার সঙ্গে এজাহারনামীয় সবাই জড়িত ছিল। এর বাইরেও সাক্ষ্য প্রমানে সাতজনের নাম উঠে আসায় তাদেরকে চার্জশিটে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ইঞ্জিনিয়ার মশিউর রহমান ছাড়া বাকি সবাই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তবে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়নি। আমরা আসামীদের গ্রেফতারে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি’।
মামলার বাদী ইকবাল আজাদের ছোট ভাই মো. জাহাঙ্গীর আজাদ বলেন, ’পুলিশ চার্জশিট দিয়েছে বলে জেনেছি। আমরা চাই মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করে আসামীদের শাস্তি দেওয়া হোক। পাশাপাশি আসামীদের গ্রেফতারের জোর দাবি জানাচ্ছি।
প্রসঙ্গত, গত ২১ অক্টোবর সন্ধ্যায় দলীয় কোন্দলের জেরে খুন হন এ কে এম ইকবাল আজাদ। পরদিন তার ছোট ভাই এ.কে.এম জাহাঙ্গীর আজাদ বাদী হয়ে আওয়ামীলীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ২২ জনকে আসামী করে সরাইল থানায় মামলা করেন। পুলিশ শুধুমাত্র এজাহারনামীয় আসামী সোহেলকে গ্রেফতার করতে পেরেছে। প্রধান আসামীরা ধরা না পড়ায় সরাইলে প্রায় প্রতিদিন সভা-সমাবেশ হচ্ছে।

আরিফুল ইসলাম সুমন, স্টাফ রিপোর্টার

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply