একটি মৃত্যু ও কিছু কথা —— কাজী মোঃ মোস্তফা কামাল


আমি ২১/০৪/২০০৫ হতে ২৫/০৩/২০০৯ খ্রিঃ পর্যন্ত কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার পৌরসভায় সচিবের দায়িত্ব পালন করে বদলী হয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী পৌরসভায় চলে আসি। দেবিদ্বার থেকে চলে আসলেও এখনো সেখানকার যে কয়েকজন মানুষের সাথে যোগাযোগ আছে তাদের মধ্যে দেবিদ্বার পৌরসভার প্রশাসক সহায়তা কমিটির সদস্য ০৪ নং ওয়ার্ডের জনাব ইউনুস ও ০৫ নং ওয়ার্ডের জনাব হাসান ভাই অন্যতম। আমাদের এই দেশের অধিকাংশ মানুষই অতীতকে ভুলে বর্তমানকে নিয়ে আছে। একজন কর্মকর্তা যখন কোন কর্মস্থলে থাকে তখন তার কাছ থেকে স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তাঁর কোন শুভাকাংখী, হিতকারীর অভাব থাকে না। যখনই বদলী হয়ে অন্য কোন কর্মস্থলে চলে যায় তখন আর পূর্বের শুভাকাংখী, সহকর্মী এমনকি নিজের অধীনে কর্মরত অনেক কর্মচারীরাও মনে রাখে না। এই দিক থেকে হাসান ভাই ও ইউনুছ ভাই ব্যতিক্রম। আমি চলে আসার পর অন্তত প্রতি ঈদের পূর্ব সন্ধ্যায় প্রথমেই হাসান ভাই ফোন দিয়ে ঈদ মোবারক জানিয়ে আমার পরিবার পরিজনের খোঁজ-খবর নেয়। পরবর্তীতে একই সময় ইউনুছ ভাইয়ের সাথেও আমার কথা হয়। দেবিদ্বারের অন্যান্য কয়েকটা নাম্বারের সাথে হাসান ভাই ও ইউনুছ ভাইয়ের মোবাইল নাম্বার এখনো আমার মোবাইলে সেভ আছে।

২৩/১১/২০১২ খ্রিঃ সকাল ১০.৩০ মিঃ আমার মোবাইলে হাসান ভাইয়ের ফোন নাম্বার ভেসে উঠে। আমি রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে দুঃসংবাদটি শুনতে পাই। ইউনুছ ভাই আর এই দুনিয়াতে নেই (ইন্ন লিল্লাহে ——– রাজিউন)। হাসান ভাই জানান, সকাল ৯.৩০ মিঃ তিনি ইন্তেকাল করেন। আমার বাসা সিদ্দিরগঞ্জের চিটাগাং রোডের পশ্চিমে হযরত মাওলানা ইদ্রীস সন্বীপী রহ. এর প্রতিষ্ঠিত আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানীনগর মাদ্রাসার দক্ষিণ পাশে। আমি চিটাগাং রোডের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত মিনার মসজিদে প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজ আদায়ের চেষ্ঠা করি। বর্তমানে বাংলাদেশে যে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় আলেম আছেন তাঁদের মধ্যে মুফতী ওমর ফারুক সন্দ্বিপী (দাঃবাঃ) অন্যতম। তিনি মিনার মসজিদের খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জুম্মার খোতবার পূর্বে বাংলায় যে বয়ান রাখেন তা শুনার জন্য অনেক দূর থেকে মুসুল্লী আসেন। তাঁর বয়ান/আলোচনা থেকে অনেক না জানা বিষয় জানতে পারি। তিনি রমজান ও যাকাতের এর ফাযায়িল ও মাসায়িল, কুরবানীর ফাযায়িল ও মাসায়িল, শবে বরাত এর ফাযায়িল ও মাসায়িল লিফলেট আকারে ছাপিয়ে মুসুল্লীদের মাঝে বিতরণ করেন। এছাড়া মুসুল্লীদের কাছ থেকে কম্বল, পুরাতন কাপড় সংগ্রহ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দরিদ্র জনগণের মাঝে বিতরণ ছাড়াও মুসুল্লীদের সহযোগীতায় নামাজের কার্পেট কিনে যে সব মসজিদের কার্পেট কেনার সামর্থ্য নেই সেসব মসজিদের মুসুল্লীদের জন্য পাঠিয়ে দেন। জুম্মার আজানের পূর্বেই ০৪ তলা বিশিষ্ট মিনার মসজিদের ১ম তলা পূর্ণ হয়ে যায়। পবিত্র আশুরার পূর্বের শুক্রবার হওয়াতে মসজিদের যাওয়ার প্রস্তুতির মুহুর্তে হাসান ভাইয়ের ফোন পেয়ে আমি ইউনুস ভাইয়ের জানাযায় যাওয়ার জন্য বাসা থেকে সাথে সাথেই বের হয়ে দেবিদ্বারের বাগুর মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করে বেলা ২.৪০ মিঃ দেবিদ্বার উপস্থিত হই। আসর বাদে ইউনুছ ভাইয়ের জানাযা হয় দেবিদ্বার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট মাঠে। জানাযা পূর্ব বক্তব্য দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ জনাব এস.এম বদিউজ্জামান বলেন, মরহুম ইউনুছ একজন অভিজ্ঞ লোক ছিলেন, বিশেষ করে জায়গা-জমির পুরাতন কাগজগুলো তিনিখুবই বুঝতেন, তার মধ্যে কোন অহংকার ছিল না। তাঁর মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি আমি।’’ দেবিদ্বার উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান জনাব শরিফুল ইসলাম কামাল বলেন, মরহুম ইউনুছ ভাইয়ের কর্মময় জীবনে ভুল-ত্র“টির জন্য উপস্থিত মুসুল্লীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে তিনি উপস্থিত মুসুল্লীদের ঈমান, নামাজ ও রোজার প্রতি জোর দেওয়ার অনুরোধ করেন। দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব হারুন-অর-রশীদ কবরের যে ০৩ টি প্রশ্ন করা হবে তা আলোচনা করে উপস্থিত মুসুল্লীদের উদ্দেশ্যে বলেন যে, মরহুম ইউনুস সাহেব দেবিদ্বার পৌরসভার প্রশাসক সহায়তা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁকে তখনো রাগ করে কোন কথা বলতে দেখিনি। জনাব হাসানও ইউনুস একটা জুটি ছিলেন। যেখানেই গেছে তারা দুজন একসাথেই গেছে। কিছুদিন পূর্বে পৌরসভার লাইটের জন্য তারা দুজন একসাথে আমার বাসায় গিয়েছিলেন’’। দেবিদ্বার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব রাজি মোঃ ফখরুল মুন্সী বলেন, জানাযায় এত মানুষের উপস্থিতিই প্রমাণ করে তিনি ভাল লোক ছিলেন এবং আমিও তাকে ভাল লোক বলে জানি। কেন্দ্রিয় মসজিদের ঈমাম উপস্থিত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বোখারী শরীফ থেকে ০২টি হাদীস বলে জানাযার ইমামতি করেন।

দেবিদ্বার পৌরসভার প্রধান সহকারী জনাব রফিকুল ইসলাম আমাকে জানান যে, ইউনুছ সাহেব গতকাল বৃহষ্পতিবার অফিসে গিয়েছে। অনেকের সাথে আলাপ করে জানতে পারি জনাব ইউনুছ ভাই বৃহষ্পতিবার সারাদিনই কর্মব্যস্ত দিন পার করেছেন। জনাব হাসান ভাই বলেন, ‘‘ বৃহষ্পতিবার বিকাল থেকেই একটু কথা কম বলেছেন এবং আমার সাথে এশার নামাজ পড়ে বাড়িতে চলে যায়। শুক্রবার সকালে গ্রামের কিছু মানুষ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার কারণে রবিবার দিন সোনালী ব্যাংকের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেবিদ্বারে আসবে বলে ঋণ গ্রহীতাদের কাছে যান। ফিরে এসেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তিনি মৃত্যু বরণ করেন।

মরণ কি এবং তার কি রূপ রয়েছে ? এ বিষয়ে হযরত রাসূল্লাহ (সাঃ) ফরমায়েছেন ঃ আল্লাহ পাক অসীম কষ্টদায়ক মরণকে পয়দা করে সকলের দৃষ্টি হতে অন্ধকারাচ্ছন্ন শত আবরণের ভেতরে গোপনভাবে রেখে দেন। আসমান ও যমীন হতে বিরাটাকারে মরণকে পয়দা করে সত্তরটি শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন। প্রত্যেকটি শিকল লম্বায় প্রায় সহস্র বছরের পথের দূরত্বের সমতুল্য। ফেরেশতামন্ডলী মৃত্যু কাছ দিয়ে কখনো কখনো চলাচল করলেও তার অস্তিত্বের বিষয়ে কিছুই জানতেন না। এ প্রকারে অনেকদিন গুজারিত হবার পর আল্লাহ্ তায়ালা যখন আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)-কে পয়দা করে প্রাণীর জান কবজ করার কার্যে হযরত জিব্রাইল (আঃ)-কে নিয়োজিত করেন, তখন হযরত জিব্রাইল (আঃ) আল্লাহ্ তায়ালার কাছে আরজ করলেন, হে মহান প্রভু ! মৃত্যু বস্তু আবার কি ? আল্লাহ পাক তখন শত আবরণ উন্মুক্ত করে ফেরেশতাগণকে মৃত্যুর প্রতি দৃষ্টিপাত করতে হুকুম করলেন। ফেরেশতামন্ডলী মৃত্যুকে দর্শনের জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলে আল্লাহ পাক মৃত্যুকে হুকুম করলেন, হে মৃত্যু ! তোমার সকল পাখা মেলে এদের উপর উড়ে বেড়াও এবং তোমার সকল চোখ উন্মুক্ত করে এদের প্রতি নজর কর। সৃষ্টিকর্তা মহান রাব্বুল আলামীনের হুকুম মতে তার সমুদয় পাখা ও চক্ষু উন্মুক্ত করে ফেরেশতাদের মস্তকের উপর দিয়ে চক্কর দিতে শুরু করল। তখন ফেরেশতামন্ডলী তার ভয়ানক আকৃতি দর্শন করে বেহুশ হয়ে পড়লেন। সহস্র বছর পর তারা চেতনা ফিরে পেলেন। তৎপর তারা আরজ পেশ করলেন, হে প্রভু ! আপনি মৃত্যু অপেক্ষা ভয়ানক কিছু পয়দা করেছেন কি ? মহান রাব্বুল আলামীন বললেন, আমি স্বয়ং এ ভয়ানক মৃত্যুর সৃষ্টিকারী। আমি এর চেয়ে মহিমান্বিত, মহিয়ান, গড়িয়ান। প্রতিটি প্রাণীকেই এ মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। অতঃপর মহান আল্লাহ পাক হযরত আজরাঈল (আঃ)-কে বললেন, জীবের জান কবজের জন্য তোমাকে নিযুক্ত করলাম। হযরত আজরাইল (আঃ) বললেন, হে মহান প্রভু ! এ কাজ সমাধা করা আমার পক্ষে সম্ভবপর নয়। মৃত্যু আমার চেয়ে অনেক শক্তিমান। তখন আল্লাহ্ তায়াআ আজরাইল (আঃ)-কে মৃত্যুর চেয়ে অনেক শক্তিমান করে দিলেন।

এমন মৃত্যুকে কেউ কি ভয় না করে থাকতে পারে ? যখন মানুষ মরণের চিন্তা-ভাবনা করে তখন সর্বপ্রকার সাধ-আহলাদ বিস্বাদে পর্যবসিত হয় এবং সে আখেরাতে নাজাত প্রাপ্তির পাথেয় যোগাড় করতে হাজারো চেষ্টা চালাতে থাকে। সুতরাং হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ফরমায়েছেন ঃ তোমরা ভোগ-বিলাস বিনাশকারীকে (মৃত্যুকে) বেশী মাত্রায় ভয় কর।

একজনের মৃত্যু আমাদের সাময়িক ব্যথিত করে কিন্তু পরক্ষনেই আমরা মৃত্যুকে ভুলে গিয়ে দুনিয়ার গোনাহর কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ি। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কবরের উপরে প্রদত্ত একটি ভাষণে বলেন, ‘‘উপস্থিত লোক সকল, আমাদের অমনোযোগিতার অবস্থা এই যে, মৃত্যু যেন আমদের জন্য নয়, বরং অন্যান্য লোকের জন্যই নির্ধারিত। ’’

জনাব ইউনুছ ভাই চলে গেছেন না ফেরার দেশে, যেখান থেকে আর কোন দিন আসবে না আমাদের মাঝে। আমার মোবাইলে আর ভেসে উঠবে না ইউনুছ ভাইয়ের নাম্বার, বলবে না, কেমন আছেন? আমাদেরও সেখানে যেতে হবে। আমরা কি সেখানকার জন্য প্রস্তুত না-কি, দুনিয়াধারী নিয়ে মহাব্যস্ত ? নিজের মনকে প্রশ্ন করুন। উত্তর পেয়ে যাবেন। আমি মরহুম ইউনুছ ভাইয়ের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাই।

মৃত্যু সকলের জন্যই অবধারিত। এতে কোনরূপ সন্দেহের অবকাশ নেই। কোরআন ও হাদীসে এ সমন্ধে বিশদ বিবরণ বিদ্যমান রয়েছে। মৃত্যু চি›তা মানুষকে আল্লাহ্মুখী করে। অনন্ত জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভের কাজে বান্দাকে সর্বদা নিয়োজিত রাখে। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে ঃ জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। (সূরা আলে ইমরান, ৩ ঃ ১৮৫) অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে ঃ তোমরা যেখানে থাক না কেন মৃত্যু তোমাদেরকে নাগালে পাবেই; এমনকি সুউচ্চ সুদৃঢ় দূর্গে অবস্থান করলেও। (সূরা নিসা, ৪ ঃ ৭৮) আরো ইরশাদ হয়েছে ঃ বলুন, তোমরা যে মৃত্যু হতে পলায়ন কর সেই মৃত্যুর সাথে তোমাদের সাক্ষাত হবেই। তারপর তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর নিকট। তখন তোমরা যা করতে এ সন্বন্ধে তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন। (সূরা জুমু’আ, ৬২ ঃ ৮)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন ঃ সকল প্রকার স্বাদ বিনষ্টকারী মৃত্যুকে তোমরা স্মরণ কর। (মিশকাত শরীফ পৃঃ ৪৫৭) অপর এক হাদীসে আছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, চতুষ্পদ জন্তু যদি তোমাদের মত মৃত্যু জানতে পারত তবে তোমরা তাদের মধ্যে কোন একটিকেও মোটাতাজা দেখতে পেতে না। আলমে বরযখ সন্বন্ধে আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে ঃ তাদের সামনে বরযখ থাকবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত। (সূরা মু’মিনূন, ২৩ ঃ ১০০)

এ আলমে বরযখে মৃতব্যক্তির সাথে কিরূপ আচরণ করা হবে এ সন্বন্ধে হাদীসে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। হযরত বারা ইবন আয়িব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, (কবরে মু’মিন) বান্দার নিকট দু’জন ফিরিশতা আসেন এবং তাকে বসান। তারপর জিজ্ঞাসা করেন, তোমার রব কে ? সে বলে আমার রব আল্লাহ্। তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার দীন কি ? সে বলে, আমার দীন ইসলাম ? পুনরায় প্রশ্ন করেন, এই ব্যক্তি যাঁকে তোমাদের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল, তিনি কে, উত্তরে সে বলবে, তিনি আল্লাহর রাসূল (সা.)। তখন ফিরিশতা বলেন, তুমি কিরূপ বুঝতে পারলে ? সে বলে, আমি আল্লাহর কিতাব পড়েছি, তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাঁকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, এটাই হল আল্লাহর কালাম-যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদেরকে ‘‘শাশ্বত বাণী’’ (কলেমা তায়্যিবা ) এর উপর অবিচল রাখবেন। (সূরা ইব্রাহীম, ১৪ ঃ ২৭) নবী করীম (সাঃ) বলেন, এরপর আসমান থেকে এক ঘোষণাকারী এ মর্মে ঘোষণা করবে যে, আমার বান্দা সত্য বলেছে। তাই তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দাও। সুতরাং তার জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়। ফলে তার দিকে জান্নাতের স্নিগ্ধ হাওয়া এবং সুবাস বইতে থাকে। তারপর তার কবরকে তার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত করে দেওয়া হবে।

তারপর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কাফিরের মৃত্যু প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, তার শরীরে তার রুহকে ফিরিয়ে আনা হয়। তারপর দু’জন ফিরিশতা তার নিকট এসে তাকে বসান এবং জিজ্ঞাসা করেন, তোমার রব কে সে ? উত্তরে বলে, হায়! আমি কিছুই জানি না। এরপর তাঁরা জিজ্ঞাসা করেন, তোমার দীন কি ? সে বলে হায় হায় ! আমি কিছুই জানি না। তাঁরা পুনরায় জিজ্ঞাসা করেন, এই লোক যাকে তোমার নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল তিনি কে ? এবারও সে বলে হায় হায় ! আমি কিছুই জানি না। এ অবস্থায় আসমান থেকে এক ঘোষণাকারী এ মর্মে ঘোষণা করেন যে, সে মিথ্যা বলেছে, তার জন্য জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও। তাকে জাহান্নামের পোশাক পরিয়ে দাও এবং তার জন্য জাহান্নামের একটি দরজা খুলে দাও। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, তারপর তার কবরে জাহান্নামের উত্তাপ ও লু-হাওয়া আসতে থাকে। নবী (সাঃ) বলেন, এরপর তার কবরকে এমন সংকীর্ণ করে দেওয়া হয় যে, তার এক দিকের পাঁজরের হাড় অপর দিকের পাঁজরের হাড়ের মধ্যে ঢুকে যায়। এরপর তার কবরে একজন ফিরিশতা মোতায়েন করা হয় যার নিকট লোহার একটি হাতুড়ি থাকে। যদি এ হাতুড়ি দ্বারা পাহাড়ের উপর আঘাত করা হয় তবে নিশ্চয়ই পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। এ হাতুড়ি দ্বারা ঐ ফিরিশতা তাকে সজোরে আঘাত করতে থাকেন, ঐ আঘাতের আওয়াজ মানুষ ও জিন ছাড়া পূর্ব হতে পশ্চিমের সমস্ত মাখলুক শুনতে পায়। ঐ আঘাতে ঐ ব্যক্তি ধূলিতে পরিণত হয়ে যায়। তারপর তার মধ্যে রুহ পুনরায় ফেরত দেওয়া হয়। (এভাবে আযাব চলতে থাকে)

উপরোক্ত হাদীস থেকে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, পূর্ণবানদের রুহসমূহ দেহ হতে পৃথক হওয়ার পর তাদের জন্য জান্নাতের সুখ শান্তির সৌন্দর্য ও অবস্থান প্রদর্শন করা হয়। অনুরূপভাবে অপরাধী ব্যক্তিদেরকে আযাবের কিছু না কিছু স্বাদ গ্রহণ করানো হয়। এটাই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের আকীদা। শায়খ উমর ইবন মুহাম্মদ নাসাফী (রাঃ) তৎপ্রণীত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, কবরে কাফির ও কোন কোন অবাধ্য মু’মিনদেরকে শাস্তি প্রদান করা এবং অনুগত দীনদার বান্দাদেরকে নি’আমত দান করার বিষয়টি কোরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। কোরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে ঃ সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে উপস্থিত করা হয় আগুনের সামনে। (সূরা মুমি’ন, ৪০ ঃ ৪৬ ) আল্লামা তাফতাযানী (রহঃ) এর মতে আয়াতটি কবরের আযাবের সাথে সম্পর্কিত। পার্থিব জগতে অবস্থান করে আলমে বরযখের বিষয়ে সম্যক ধারণা হাসিল করা দুষ্কর। সে জগতের অনেক কথা মানুষের ধারণার অতীত। কাজেই মৃত ব্যক্তিকে কেমন করে বসানো হয়, কেমন করে ফিরিশতা তাকে শাস্তি প্রদান করে এবং কিভাবে কবর সংকীর্ণ বা প্রশস্ত করা হয় এনিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা অর্থহীন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, মানুষ ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের অবস্থায় অনেক কিছু দেখে এবং সুখ বা দুঃখ অনুভব করে। কিন্তু তার পাশ্ববর্তী ব্যক্তি কিছুই অনুভব করতে পারে না। তাই বলে স্বপ্ন অবাস্তব এ কথা বলা যায় না। কবরের আযাবের বিষয়টিও ঠিক অনুরূপই। এতে সংশয়ের কোন অবকাশ নেই। কোন মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর কবরস্থানে দাঁড়িয়েই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এই ভাষণ প্রদান করে তিনি মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুসলমানদের নেক আমলের উপদেশ দিয়েছেন। উপস্থিত লোক সকল, আমাদের অমনোযোগিতার অবস্থা এই যে, মৃত্যু যেন আমাদের জন্য নয়, বরং অন্যান্য লোকের জন্যই নির্ধারিত। ’’ বিভিন্ন প্রকার হক ও অধিকার আদায়ের দায়িত্ব যেন আমাদের উপর নয়, বরং অন্যান্য লোকের উপর অর্পিত। যে সব লোকের (মৃতদেহের) সাথে আমরা কবরস্থান পর্যন্ত আসি, যেন তারা মাত্র কয়েক দিনের সফরে যাচ্ছে এবং শ্রীঘ্রই ফিরে এসে আমাদের সাথে মিলিত হবে। আমরা তাদেরকে কবরে দাফন করে এসে তাদের পরিত্যক্ত ধন-সম্পদ এমন শান্তি ও স্বস্তির সাথে ভোগ করতে থাকি, যেন আমরা চিরদিন এই দুনিয়ায় থাকব। নসীহতের সব কথাই আমরা ভুলে বসেছি। প্রত্যেকটি বিপদ আপদ থেকে যেন আমরা মুক্ত। ধন্য সেই ব্যক্তি যে বৈধভাবে অর্জিত ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে খরচ করে, আলিম ও বিজ্ঞজনের সংসর্গে থাকে এবং গরীব ও নিঃস্বদের সাথে মেলামেশা করে। ধন্য সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র ও অন্তর পবিত্র এবং যার অনিষ্ট থেকে লোকেরা নিরাপদ। ধন্য সেই ব্যক্তি যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাল আল্লাহর পথে খরচ করে এবং অনর্থক কথাবার্তা থেকে নিজেকে দূরে রাখে। এমন ব্যক্তির পক্ষেই শরীয়তের উপর আমল করা এবং বিদ’আত থেকে দূরে থাকা সম্ভব। ঢাকার ফরিদাবাদ মাদ্রাসার মুহতামিম হযরত মাওলানা আঃ কুদ্দস (দাঃ বাঃ) এক ওয়াজ মাহফিলে মৃত্যুর সময় ঈমান নসীব হওয়ার জন্য ০৭টি আমলের কথা বলেন। যথা ঃ- ১। মেছওয়াক করা, ২। অজুর পর কালেমা শাহাদাত পাঠ করা, ৩। আজানের পর দোয়া পড়া, ৪। ০৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, ৫। ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পড়া, ৬। নিয়মিত কোরআন পড়া ও ৭। পিতা-মাতার খেদমত করা।

মৃত্যুর পর তিনটি কাজ মৃত মানুষের উপকারে আসে এবং অন্যকোন কাজ তার উপকারে আসে না। কাজ ০৩ টি হলো ঃ-১। সদকাতুল জারিয়া, ২। ইলম বা জ্ঞান যা মানুষকে শিখিয়েছে ও ৩। নেক সন্তান।

জনাব ইউনুছ ভাই শুক্রবার দিন মৃত্যু বরণ করেন। আলেম-উলামায়েরা বলেন, শুক্রবারের মৃত্যু বড়ই ভাগ্যের ব্যাপার। আসুন আমরা বেশী বেশী মৃত্যুর চিন্তা করে দুনিয়ার পিছনে বেশী মেহনত না করে দ্বীনের পিছনে বেশী বেশী মেহনত করি এবং আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সুন্নাত মোতাবেক জীবন পরিচালনা করি। মহান আল্লাহ তায়ালা ইউনুস ভাইয়ের সমস্ত গোনাহ মাফ করে তাঁকে জান্নাত নসীব করুক, এই দোয়াই করি এবং আমাদেরকে পরিপূর্ণ মুসলমান বানিয়ে মৃত্যু বরণ করান। আমীন!

লেখকঃ সচিব, কটিয়াদী পৌরসভা, কিশোরগঞ্জ।
quazikamal2012@gmail.com

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply