‘‘বাংলার পথে পথে ’’ (৮ম পর্ব)———-কাজী মোঃ মোস্তফা কামাল

ঢাকা বিভাগের ১৭টি জেলার মধ্যে শেরপুর আর পদ্মা নদীর ঐ পাড়ের ০৫টি জেলা ছাড়া বাকী ১১টি জেলায় আমার যাওয়া হয়েছে। কুষ্টিয়া থেকে মাগুরা হয়ে ফরিদপুরে রাত্রি যাপন করে গোপালগঞ্জ যাব। উদ্দেশ্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের স্মৃতি কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা ছাড়াও পদ্মা পার হয়ে মাওয়া দিয়ে ঢাকায় চলে আসা।

৫ই সেপ্টেম্বর/২০১২ খ্রিঃ সকালে হোটেল থেকে বেরিয়ে কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়াস্থ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজরিত টেগর লজের ছবি উঠিয়ে চলে যাই ফজলুল রহমান স্যারের বাসায়। স্যারের সাথে নাস্তা করে স্যারের গাড়ীতে করে ভাবীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যাই। সেখানে স্যার আমাকে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীর ০২টি ও জেলা প্রশাসন, কুষ্টিয়ার ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলা-২০১২ এর তথ্যাকাশ নামক ০১ টি স্মরনীকা প্রদান করেন। আবুল আহসান চৌধুরীর সম্প্রাদিত ‘‘রবীন্দ্রনাথ ও শিলাইদহ’’ যুগলবন্দী প্রেক্ষণ, ০২টি স্মরনিকা পড়ে আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলাদেশ কাব্য চর্চা সম্পর্কে আগের থেকে আরো বেশী জানতে পারি স্যার আমাকে কুষ্টিয়ায় আবারো বেড়ানোর আমন্ত্রন জানিয়ে আমাকে কুষ্টিয়ায় গাড়ী পাঠিয়ে হোটেলে পৌঁছে দেয়। হোটেলে যোহরের নামাজ আদায় করে ইজিবাইকে কুষ্টিয়া শহরের দক্ষিণপার্শ্বে কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী সড়কের পাশে অবস্থিত পৌর বাস টার্মিনালে চলে আসি। বাস টার্মিনালে নামতেই বিভিন্ন বাসের লোকজনের প্রশ্ন কোথায় যাব ? কোথায় যাব ? আমি উত্তর না দিয়ে পুরো টার্মিনাল একটা চক্কর দিয়ে কোথায় কোন গাড়ী আছে দেখে নেই। আমাদের বহনকারী বাসটি বেলা ২টার কিছু পড়ে যাত্রা শুরু করে। গাড়ী ছাড়তেই জেলা পরিষদের ডাক বাংলোতে একটি রুম রাখার জন্য ফোন দেই ফরিদপুর পৌরসভার সচিব জনাব মোঃ তানজিলুর রহমানকে। এক ঘন্টা পরে তানজিলুর রহমান ভাই জানলেন, ‘‘জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর সবগুলি রুমই বরাদ্দ হয়ে গেছে, আপনি বরং যেখানে বাস থামবে অর্থ্যাৎ গোয়ালচমেট মোড়ে অবস্থিত হোটেল রাজস্থানে উঠে যান। নতুন হোটেল, সেবার মান ভাল, পরিবেশ ভাল।

গাড়ী টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে চৌড়হাস মোড় হয়ে ঝিনাইদহের দিকে এগিয়ে চলছে। চৌড়হাস মোড়ে একটি মুক্তিযুদ্ধের নির্মাণাধীন ভাস্কর্য দেখতে পেলাম। এ রাস্তাটা আমার জন্য নতুন। আমি গাড়ীর বাম পাশে একটি সিটে বসা। কিছু দূর যাওয়ার পর বিসিক শিল্প নগরী কুষ্টিয়ায় বি আর বি ক্যাবল ইন্ডাষ্টিজ লিঃ এর কারখান দেখতে পেলাম। সাথে আছে কিয়াম মেটাল ইন্ডাষ্টিজ লিমিটেড। এর প্রতিষ্ঠাতা জনাব মজিবুর রহমান। তিনি শুধু একজন শিল্পপতি না, সমাজসেবকও বটে। ফজলুল রহমান স্যার আমাকে জানান যে, জনাব মজিবুর রহমান প্রতিবছর ১০০ জন লোককে নিজ খরচে হজ্জ্ব করতে পাঠান। তাছাড়া যে সমস্ত দরিদ্র টাকার অভাবে চিকিৎসা করতে পারে না, মেয়ে বিয়ে দিতে পারে না তাদেরও তিনি সহায়তা করেন। তিনি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য তাঁর কারখানাগুলো কুষ্টিয়াতেই স্থাপন করেন। তার দক্ষ হাতের পরিচালনায় বর্তমানে বি.আর.কি ক্যাবলস আর্ন্তজাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। কুষ্টিয়ার যেকোন সরকারী-বেসরকারী অনুষ্ঠানে জনাব মজিবুর রহমানের অবদান আছেই। কুষ্টিয়া শহর থেকে ১৫ কিঃ মিঃ দূরে কুষ্টিয়া সদর থানার অর্ন্তগত ঝাউদিয়া গ্রামে শাহী মসজিদ মোঘল সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে ঝাউদিয়া জমিদার শাহ সূফী আহমদ আলী ওরফে আদারী মিয়া নির্মাণ করেন। এটি মোঘল শিল্পকলার এক অপূর্ব নিদর্শন। মসজিদটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এবং চার কোনায় বড় মিনার আছে। ১৯৮০ সাল থেকে প্রতœতত্ব বিভাগ এটি সংরক্ষণ করে আসছে। কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের বৃত্তিপাড়া থেকে হেঁটেও এ মসজিদে যাওয়া যায়। আজও এর স্থাপত্যকলা ও নির্মাণকৌশল দেশি-বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণ করে।


মুক্ত বাংলা ভাস্কর্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক

গাড়ী চলতে চলতে একসময় কুষ্টিয়া জেলার শেষ সীমান্তে চলে আসে। এখানেই রাস্তার ডান পাশে দেশের প্রথম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর কুষ্টিয়ায় প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়। ২২শে নভেম্বর ১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়া শহর থেকে ২৪ কিঃ মিঃ দক্ষিণে ও ঝিনাইদহ শহর থেকে ২২ কিঃ মিঃ উত্তরে। কুষ্টিয়া ঝিনাইদহ মহাসড়কের পার্শ্বে শান্তিডাঙ্গা-দুলালপুর নামক স্থানে ১৭৫ একর জমিতে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয। ১৯৮০ সালের ১৮ই জুলাই সরকারী আদেশে গাজীপুরের বোর্ডবাজারে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৯০ সালে ২৪শে ফেব্র“য়ারী এক আদেশে বিশ্ববিদ্যালয় গাজীপুর থেকে কুষ্টিয়া শহরের পুনরায় স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে ০৫টি অনুষদ ও ২২টি বিভাগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের জন্য ০৬টি আবাসিক হল রয়েছে। সৌদি সরকারের অর্থানুকুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাদশা ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ছাড়াও ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, ষ্টেডিয়াম, জিমনেসিয়াম, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় মসজিদ, শহীদ মিনার, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য মুক্ত বাংলা, ল্যাবরেটরী স্কুল এন্ড কলেজ এবং নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে।

কুষ্টিয়া জেলার আরেকটি দর্শণীয় স্থান হচ্ছে স্বস্তিপুর শাহী মসজিদ। সুবেদার শায়েস্তা খাঁর আমলে নির্মিত সদর উপজেলার স্বস্তিপুর গ্রামে চারটি পিলার ও চারটি মিনার বিশিষ্ট এ মসজিদটি বহুদিন ধরে জঙ্গলে ঢাকা ছিল। জনশ্র“তি আছে যে এ গ্রামের আদি নাম ছিল শায়েস্তাপুর। শায়েস্তা খাঁর আমলে এ গ্রামের পাশ দিয়ে একটি শাহী সড়ক ছিল যা পশ্চিম বাংলার কৃষ্ণনগর থেকে চূয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা হয়ে ফরিদপুরের ভিতর দিয়ে ঢাকা পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ প্রান্তেই ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার শেখপাড়া বাজার। এখান থেকেই ঝিনাইদহ জেলা শুরু। দক্ষিণ বঙ্গের প্রবেশদ্বার ঝিনাইদহ। মরমী কবি লালন শাহ, পাগলা কানাই, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, বিপ্লবী বীর বাঘা যতীন, শ্রীকান্ত ক্ষ্যাপা, আর্ন্তজাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বীজগণিত প্রনেতা কে.পি.বসু, প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা, ইতিহাস খ্যাত রাজা ইন্দ্রনারায়ন, রাজা মুকুট রায়, মোবারক আলী, ইদু বিশ্বাস, বীর প্রতীক সিরাজুল ইসলাম-এর শৌর্যময় খেজুর গুড়, কলা-পানের প্রাচুর্য মন্ডিত কপোতাক্ষ, বেগবতী, নবগঙ্গার ঝিনুকদহ এক কথায় নাম তার ঝিনাইদহ। ঝিনাইদহ জেলার আয়তন ১২১২.৮০ বর্গকিলোমিটার। উপজেলা ০৬ টি- ঝিনাইদহ সদর, কালিগঞ্জ, কোটচাঁদপুর, মহেশপুর, শৈলকুপা ও হরিণাকুন্ডু। এই জেলার প্রধান নদী বেগবতী, ইছামতী, কোদলা, কপোতাক্ষ, নবগঙ্গা, চিত্রা ও কুমার নদী। ঝিনাইদহ জেলার দর্শণীয় স্থানগুলো হলো ঃ- ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় মরমী কবি পাগলা কানাই-এর মাজার, নলডাংগা সিদ্ধেশ্বরী কালি মন্দির, কে, পি বসুর বাসভবন, মিয়ার দালান, মুরারীদহ, ঢোল সমুদ্র দীঘি, শৈলকূপা উপজেলার শৈলকুপ শাহী মসজিদ, কবি গোলাম মোস্তফার বাড়ী, কামান্না মুক্তিযুদ্ধ শহীদ মিনার, রামগোপাল মন্দির রাজা হরিশ চন্দ্রের বাড়ী, কাঁচের কোল জমিদারবাড়ী। হরিণাকুন্ডু উপজেলায় সিরাজ সাঁই-এর মাজার, হরিশপুর, জোড়াদহ, মরমী কবি ফকির লালন সাঁই-এর ভিটা, হরিশপুর, জোড়াদহ,পাঞ্জু শাহ-এর মাজার, হরিশপুর, জোড়াদহ। কালীগঞ্জ উপজেলায় গাজী কালু চম্পাবতীর মাজার বাদুরগাছা, বারবাজার, ঐতিহাসিক গোড়ার মসজিদ বেলাট, দৌলতপুরগলাকাটা মসজিদ, বাারবাজার, জোড় বাংলা মসজিদ, বারবাজার, জাহাজমারী বন্দর, হাসিলবাগ, বারবাজার ঐতিহাসিক সাতগাছিয়া মসজিদ, সাতগাছিয়া, কাষ্টভাঙ্গা, ঐতিহাসিক বলু দেওয়ান-এর মাজার, ধোপদি, কাষ্টভাঙ্গা, মহেশপুর উপজেলার হাট খালিশপুর কাচারী বাগান, এস,বি,কে, দত্তনগর কৃষি ফার্ম, স্বরূপপুর, শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান গ্রন্থাগার ও স্মৃতি যাদুঘর। শেখপাড়া থেকে গাড়ী সামনে যেতে চোখে পড়ে গাড়াগঞ্জ বাজার। এখান থেকে শৈলকুপা উপজেলা সদরে যেতে হয়। ঝিনাইদহ শহর থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তরে রাস্তার বামপার্শ্বে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ অবস্থিত।
একসময় গাড়ী ঝিনাইদহের আরাপপুর মোড়ে এসে থামে। আরাপপুর মোড় থেকে পশ্চিম দিকে চুয়াডাঙ্গা, দক্ষিণে ঝিনাইদহ শহর হয়ে যশোর-খুলনা, পূর্বদিকে মাগুরা-ফরিদপুর মহাসড়ক। এখান থেকে মাগুরা ২৮ কিঃ মিঃ। গাড়ী ১০ মিঃ বিরতি দিয়ে আবার যাত্রা শুরু করল। ঝিনাইদহ মাগুরা সড়কের পাশে ঝিনাইদহ পলিটেকনিক্যাল কলেজ। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হাটগোপালপুর বাজার ও আশেপাশে অনেক অটো রাইছ মিল রয়েছে। এখানে চাউলের অনেক আড়ত রয়েছে এবং এসব আড়ত থেকে দেশের বিভিন্নস্থানে চাউল সরবরাহ করা হয়।

হাটগোপালপুরের একটু সামনে থেকেই মাগুরা জেলা শুরু। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সকলের নবগঙ্গা, কুমার, গড়াই ও মধুমতি নদী বিধৌত মাগুরা জেলা। প্রখ্যাত লেখক ফররুখ আহমদ, ডাঃ লুৎফর রহমান, সৈয়দ আলী আহসান, কবি কাদের নেওয়াজ, সাংবাদিক শহীদ সিরাজউদ্দিন সহ অসংখ্য কবি, সাহিত্যিকদের জন্মভূমি এই জেলা। আজকের যেখানে মাগুরা জেলা শহর গড়ে উঠেছে প্রাচীনকাল থেকে এর গুরুত্ব অত্যধিক ছিল। মাগুরা এককালে সমতটের অধীন ছিল। মাগুরা জেলার আয়তন ১০৪৯ কিলোমিটার। উপজেলা ০৪ টি- মাগুরা সদর, শালিখা, শ্রীপুর ও মহাম্মদপুর। মাগুরা শহরে প্রবেশের মুখে রয়েছে জেলা কারাগার, হার্টিক্যালচার কেন্দ্র, পরমাণু শক্তি গবেষণাকেন্দ্র, জেলা পুলিশ লাইন, এল.জি.ই.ডি ভবন, সার্কিড হাউজ, জেলা পরিষদ ভবন, সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় ও ফায়ার সার্ভিস। শহরের এ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান সড়কে ভায়না মোড় থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যাওয়া যায়। মাগুরা এসে গাড়ী আবার যাত্রা বিরতি করে।


মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ , গোয়ালচামট মোড়, ফরিদপুর

মাগুরার ওয়াপদা কালনী ব্রীজের পরেই ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলা শুরু। পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ, মধুমতি, ভুবননেশ্বর, কুমার নদী বিধৌত হযরত শাহ ফরিদ (রহ:) এর পূর্ণ্য স্মৃতিতে ভাস্কর এ ফরিদপুর জেলা। এজেলার প্রতিষ্ঠা ১৭৮৬ সালে। মতান্তরে এজেলা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮১৫। এর আয়তন ২০৭২.৭২ বর্গ বর্গকিলোমিটার। এ জেলার পূর্বনাম পূর্বনাম ফতেহবাদ। প্রখ্যাত সাধক এবং দরবেশ খাজা মাইনউদ্দিন চিশতী (রহ:) এর শিষ্য শাহ ফরিদ (রহ:) এর নামানুসারে এ জেলার নামকরণ করা হয়। ফরিদপুর জেলায় মোট ০৯টি উপজেলা- ফরিদপুর সদর, মধুখালী, বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, সালথা, নগরকান্দা, ভাঙ্গা, সদরপুর, চরভদ্রসন। মধুখালী উপজেলার কামারখালী, বাগাট বাজার পেরিয়ে মধুখালী উপজেলা সদর। ফরিদপুর জেলা শহরে সেসমস্ত মিষ্টির দোকান রয়েছে সেগুলোতে বাগাটের তৈরী মিষ্টির নাম রয়েছে। মধুখালী উপজেলায় রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ যাদুঘর ও মিউজিয়াম। মহান মুক্তিযোদ্ধের বীর সেনানী বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ। ১৯৪৩ সালের পহেলা মে ফরিদপুর জেলার মধুখালী থানার আওতাধীন সালামতপুর (বর্তমানে রউফ নগর) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মুন্সী মেহেদী হোসেন এবং মাতার নাম মোছাঃ মকিদুননেছা। পিতা মসজিদের ইমামতি করতেন। মুন্সী আব্দুর রউফ ১৯৬৩ সালের ৮ মে তারিখে তৎকালীন ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস বাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুন্সী আব্দুর রউফ চট্টগ্রামের ই.পি.আর এ কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হলে তার উইং এর কর্মরত সকল সৈনিক ৮ম ইষ্ট রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ কোম্পানির মেশিনগানার হিসেবে রাঙ্গামাটি-মহালছড়ি নৌপথে প্রহরারত ছিলেন। ৮ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে শত্র“পক্ষ প্রতিরক্ষা এলাকায় ঢুকে পড়ে এবং গোলাবর্ষণ শুরু করে। একমাত্র শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ নিজের মেশিনগান দিয়ে শত্র“র উপর গোলাবর্ষণ অব্যাহত রাখেন এবং বিপক্ষেও মর্টারের গোলায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তিনি অদম্য সাহস, কর্তব্য পরায়নতা দৃঢ় সংকল্প ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। সরকার তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা রীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করেন। ফরিদপুর জেলার মধুখালী থানা সদর হতে ১০ কিঃ মিঃ পশ্চিমে কামারখালী ইউনিয়নভূক্ত বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ-এর জন্মস্থান রউফ নগর গামে ১.০০ একর জমিতে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ যাদুঘর ও মিউজিয়াম অবস্থিত। মাঝকান্দি, কানাইপুর বাজার পেরিয়েই রাজবাড়ীর মোড়। মাঝকান্দি থেকে একটা রাস্তা বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, কাশিয়ানী দিয়ে গোপালগঞ্জ হয়ে টুঙ্গীপাড়া চলে গেছে। মাঝকান্দী থেকে টুঙ্গীপাড়ার দূরত্ব ৯৬ কিঃ মিঃ।


হোটেল রাজস্থান, ফরিদপুর

গাড়ী সন্ধ্যার কিছু আগে এসে থামে ফরিদপুরের গোয়ালচামট মোড়ে। গাড়ী থেকে নামতেই হোটেল রাজস্থান দেখতে পাই। হোটেলে গিয়ে আসরের নামাজ পড়ার একটু পড়েই মাগরিবের আযান শুনতে পাই। মাগরিবের নামাজ পড়ে গত দুই দিনের ব্যবহৃত কাপড়গুলো ধৌত করে ফরিদপুর শহর দেখতে বেরিয়ে পরি। জেলা শহর কুমার নদের তীরে অবস্থিত। ফরিদপুর বাসষ্ট্যান্ড হতে ২ কিঃ মিঃ দূরে পল্লী কবি জসীম উদ্দীনের বাড়ী ও কবরস্থান। ফরিদপুর সদর উপজেলার আম্বিকাপুর রেলষ্টেশনের উত্তরে কুমার নদীর দক্ষিণে গোবিন্দপুর গ্রামে পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের বাড়ী। বাড়ীতে ০৪ টি পুরাতন টিনের চার চালা ঘর রয়েছে। কবির ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্রাদি ঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। কবির বিভন্ন লেখা বাড়ীর চত্বরে প্রদর্শন করা আছে। বাড়ীর পূর্ব ও পশ্চিমে পোর্শিদের বসতবাড়ী এবং দক্ষিণে ছোট একটি পুকুর রয়েছে। বাড়ীর উত্তরে কবরস্থান। কবরস্থানের পাশে পাকা রাস্তা ও কুমার নদী আছে। কবি ১৪/০৩/১৯৭৬ খ্রিঃ তারিখ হতে ডালিম গাছের তলে চিরতরে শায়িত রয়েছেন। কবির কবর স্থানটি পাকা উচু করণ এবং চর্তুদিকে গ্লীলের বেষ্টুনী দ্বারা নির্মিত। কবরস্থানে চিরতরে শায়িত আছেন- (১) কবির পিতা- মৌঃ আনছার উদ্দিন মোল্লা (মৃত্যুর তারিখঃ ২৬/১১/১৯৪৩) (২) মাতা- আমেনা খাতুন (রাঙ্গা ছোটু) (মৃত্যুর তারিখঃ ১৫/১০/১৯৫৩) (৩) কবির পতœী- বেগম মমতাজ জসিম উদ্দিন (মৃত্যুর তারিখঃ ১৪/০১/২০০৬) (৪) বড় ছেলে- কামাল আনোয়ার (হাসু) (মৃত্যুর তারিখঃ ০৩/০৬/১৯৯০), (৫) বড় ছেলের স্ত্রী- জরীনা (মৃত্যুর তারিখঃ ৩০/০৬/১৯৬৩), (৬) কবির বড় ভাই- আলহাজ্ব মফিজ উদ্দিন মোল্লা (মৃত্যুর তারিখঃ ১৪/০৪/১৯৬৩), (৭) কবির সেজো ভাই- সাঈদ ইদ্দন আহম্মদ মোল্লা(মৃত্যুর তারিখঃ ২৪/০৩/১৯৭৫), (৮) কবির ছোট ভাই- প্রফেসর নুরুদ্দীন আহম্মদ (মৃত্যুর তারিখঃ ০১/০৭/১৯৬৪), (৯) কবির ছোট বোন- নুরুন নাহার (সাজু) (মৃত্যুর তারিখঃ ১০/১১/১৯৫০), (১০) কবির নাতনী- আসিফ (মৃত্যুর তারিখঃ ৩০/০৩/১৯৮০), (১১) কবির সেজো ভাইয়ের মেয়ে- মোসাঃ হোসনে আরা (দোলন) (মৃত্যুর তারিখঃ ২১/০৪/১৯৭৩), (১২) কবির সেজো ভাইয়ের নাতনী- মনজুরা শাহরীন (চাঁদনী) (মৃত্যুর তারিখঃ ০৮/০৬/২০০৭) এবং (১৩) কবির শিশু ভাগিনীর কবর। শহরের ১ টি হোটেলে হাসের গোশত দিয়ে ভাত খেয়ে স্থানীয় মসজিদে এশার নামাজ পড়ে যাই ফরিদপুর পৌরসভা কার্যালয়ে। ফরিদপুর পৌরসভা সৃষ্টি হয় ১৮৬৯ সালে। ০৯ ওয়ার্ড ও ৩৫টি মহল্লা নিয়ে জেলা শহর গঠিত। আয়তন ২০.২৩ বর্গকিলোমিটার। ফরিদপুর পৌরভবনের সামনে ১টি সুন্দর ফুলের বাগান রয়েছে। রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়ি, পরের দিন সকালে টুঙ্গীপাড়ায় যাওয়ার জন্য। চলবে —–

লেখকঃ সচিব, কটিয়াদী পৌরসভা, কিশোরগঞ্জ।
quazikamal2012@gmail.com

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply