চান্দিনা মুক্ত দিবস পালনে দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন ——- মাসুমুর রহমান মাসুদ


১২ ডিসেম্বর চান্দিনা মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সাল। দেশজুড়ে যুদ্ধের ভয়াল দামামা। চারিদিকে বুলেট আর বোমার তাম্র শাসন। নিরীহের বুক চিড়ে বুলেটের হুঙ্কার। মানবতা ভূলুণ্ঠিত। মানবিকতা চরম অপমানিত। শম্ভ্রম হারা মায়েরা তখনও তন্দ্রাহীন। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর এত বেশি রক্তক্ষরণ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশেই হয়েছে। তারপর বিশ্ব মানচিত্রে আমাদের দেশের একটি নির্দিষ্ট ভুখন্ড চিত্রায়িত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ। গণপ্রজাতন্ত্রের এই দেশ ধর্মনিরপেক্ষতার মূলমন্ত্র নিয়ে স্বাধীন পথ চলা শুরু করে।
১৯৭১ সালের এই দিনে চান্দিনা উপজেলা পাকিস্তানী হানাদার ও তাদের দোশরদের হাত থেকে মুক্ত হয়। একাধিক স্থানে মুক্তিবাহিনী’র সাথে পাকবাহিনীর শান্ত্রি কাপুরুষদের সম্মুখ যুদ্ধ হয়।
কথা হয় উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হাজী আবদুল মালেক এর সাথে। তিনি জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাক বাহিনী চান্দিনা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের খুজে অভিযান চালাত। সন্ধান না পেলে গ্রামবাসীর বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হত। ১২ ডিসেম্বর পাকবাহিনী চান্দিনা উপজেলার মাইজখার ইউনিয়নের ফাঐ করতলা এলাকায় পৌঁছলে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের সম্মুখিন হয়। এসময় মিত্রবাহিনীর সাথে পাকবাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আহমদ, ইউপিআর সদস্য কাজী আব্দুল লতিফসহ ৩ মুক্তিযোদ্ধা ও ৩ জন বীর জনতা শহীদ হয়। গোলাগুলির এক পর্যায়ে পাক হানাদারদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে যায়। ঘৃণা ও ক্রোধে মুক্তিযোদ্ধা এবং উত্তেজিত জনতার আক্রমণের ফলে নিহত হয় বহু পাকসেনা।
উপজেলার বেলাশ্বর কচুয়ারপাড় গ্রামের মুক্তিযোদ্ধার আবদুল হান্নান মুন্সী জানান, ওই দিন চান্দিনা উপজেলার হারং উদালিয়া এলাকায় পাকসেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ হয়। ওই দিন প্রায় এগার’শ পাকিস্তানী সৈন্য মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করে।
চান্দিনা উপজেলার ফাঐ নামক স্থানে ওই ৩ মুক্তিযোদ্ধা ও ৩ বীর জনতার স্মৃতি ধরে রাখতে একটি স্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এর কার্যালয় চত্বরে মুক্তিযুদ্ধে নিহত যোদ্ধাদের নামের তালিকা সম্বলিত শ্বেতপাথর যুক্ত আরও একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। তবে, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যেসব গণ কবর রয়েছে সেগুলোকে সংরক্ষণ ও স্তম্ভ নির্মাণের কোন উদ্যোগ আজও দেখা যায়নি।
সাংবাদিকতা করার সুবাদে পেশাগত দায়িত্ব পালনে গিয়েছিলাম উপজেলার মাধাইয়া ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামে। সাথে ছিলেন আমার বন্ধবর কলমযোদ্ধা সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা ও আবদুল বাতেন। সেখানে কথা হয় বয়োবৃদ্ধ একাধিক মানুষের সাথে।
কথা হয়েছিল কাশিমপুর গ্রামের বায়ান্ন বছর বয়সী প্রত্যক্ষদর্শী স্বপন দাস এর সাথে। তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এক রাতে পাশ্ববর্তী জোড়পুকুরিয়া গ্রামের রাজাকার আ. রহিম এর নেতৃত্বে দেড়শতাধিক পাকিস্তানি সৈন্যের একটি বাহিনী কাশিমপুর পশ্চিম পাড়ায় হামলা চালায়। ওই গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বেশি। গভীর রাত পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে সশস্ত্র পাকহানাদাররা গ্রামের মাতব্বর মাধাইয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষক জগবন্ধু সরকার এবং তার ছেলে সুধীর চন্দ্র সরকারসহ প্রায় ২৫-৩০ ব্যক্তিকে আটক করে পাশ্ববর্তী একটি খালের কাছে নিয়ে আসে । ভোর ৬টার দিকে ৮ হিন্দু ব্যক্তিকে বর্বরোচিত নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করা হয়। এসময় আটককৃত মুসলিম ব্যক্তিদেরকে ছেড়েদেয় পাকবাহিনী। স্বাপন দাস আরও জানায় এসময় তার বয়স ছিল ১৪ বছর। শিশু বলে তার আরও কয়েকজন বন্ধুসহ তাদেরকে হানাদার বাহিনী একটি ঘরে বন্দি করে রাখে। ওই রাতে গ্রামের যুবতী হিন্দু মেয়ে ও নতুন বৌ দের অনেকেই সম্ভ্রম হারায়। ওই রাতে গ্রামের ৮০টিরও বেশি ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেয় পাকবাহিনী। হানাদার বাহিনী চলে যাওয়ার পর আগুন নিভাতে ব্যস্ত হয়েপড়ে এলাকাবাসী। আবার অনেকেই পালিয়ে যায়। ওই বিভীষিকাময় অবস্থায় এলাকাবাসী নিহতদের ২টি কবর খুড়ে পুঁতে ফেলে।
নিহত জগবন্ধু মাষ্টারের ভাই রাখাল চন্দ্র সরকার (৬৫) এর সাথে কথা বলে জানাগছে, বাংলা ১৯ আষাঢ়, শনিবার ভোরে ওই ঘটনা ঘটে। কবর গুলো সংরক্ষণ করেননি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওই সময় নিজের জীবনের চিন্তা করে আমরা বিভিন্নস্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। দেশ স্বাধীন হলে ওই ঘটনার প্রায় ১১ মাস পরে আমরা লাশগুলো তুলে ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী পোড়ানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ততদিনে লাশগুলো গলে গিয়েছিল। ফলে কবরগুলো গণ-কবরই রয়েগেছে। নিহত যোগেশ চন্দ্র সরকার এর স্ত্রী প্রিয় বালা সরকার স্বামী হারিয়ে এখন অসহায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪০ বছর পূর্ণ হলেও কেউ তাদের স্বান্তনা দিতেও আসেনি।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে চান্দিনার কংগাই গ্রামে আরও ৭ জন নিরপরাধ মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী। পরে তাদেরকে গণকবর দেওয়া হয়। জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে চান্দিনার উপজেলার কংগাই গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান করছিলেন, খবর পেয়ে পাক বাহিনীর শতাধিক সৈন্য কংগাই গ্রামে প্রবেশ করে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা এ পাক বাহিনীকে মোকাবেলা করার মতো প্রস্তুতি না থাকায় মুক্তিযোদ্ধরা পিছু হটে যায়। এ সুযোগে পাক বাহিনীরা দ্রুতগতিতে গ্রামে প্রবেশ করে নিরস্ত্র লোকদের হত্যা করে।
পরে কংগাই গ্রামে ৭ জনের লাশ পড়ে থাকতে দেখে এলাকাবাসী ৭ শহীদের লাশ একই স্থানে গণ কবর দেয়। গন হত্যার শিকার সেই ৭ শহীদরা হলেন, আবব্দুস সামাদ, ধনু মিয়া, বজলুর রহমান, মুসলেহ উদ্দিন, আবিদ আলী, আয়েত আলী, আফসর আলী। অথচ মুক্তিযোদ্ধের ৪১ বছর পরও চান্দিনার সেই গণকবরটি এখনো বাঁশ ঝাড়। স্মৃতি রক্ষায় কোন উদ্যোগ নেই কারো। শহীদদের স্মরণে ওই স্থানে এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোন স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে উঠেনি।
এখনও গণকবরটি অবহেলায় পড়ে আছে। গণকবরটিতে যাওয়ার নেই কোন রাস্তা। ময়লা আবর্জনা আর জঙ্গলে ছেয়ে গেছে গণকবরটির পুরো এলাকা। দীর্ঘদিন ধরে অযতœ আর অবহেলায় পড়ে আছে এ গণকবরটি। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে নানা ক্ষোভ। গণকবরটি সংরক্ষণ ও এখানে একটি স্মৃতি ফলক নির্মাণের দাবী জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা।
সরকারের তরফ থেকে দ্রুত গণকবরটিকে ঘিরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হলে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে কিভাবে এখানে পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা নিরীহ লোকজনকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। চান্দিনার মুক্তিযোদ্ধাসহ আপামর জনগণের দাবী মুক্তিযোদ্ধের সময়ে এখানে নৃশংসভাবে যাদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের নামের তালিকাসহ একটি স্মৃতিফলক নির্মিত হোক।
এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গণকবর রয়েছে। সব স্থানে যাওয়া সম্ভব হয় নি। এটি আমার ব্যর্থতা বলে স্বীকার করছি। তবে ‘‘যে মূলমন্ত্র নিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে তা সত্যিই পরম শ্রদ্ধাযোগ্য। তখন দল-মত নির্বিশেষে বাংলার আপামোর জনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে। সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি বেসামরিক জনতাও অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। কি মুসলিম, কি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান; জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অস্ত্র হাতে স্বদেশ ও এর সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে।’’ এখন দেশে অস্থির অবস্থা সৃষ্টি ঘৃণ্য অপচেষ্টা চালাচ্ছে কতিপয় সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে ইতোপূর্বে অনেক ঘটনাই ঘটেছে। যা আমাদের হৃদয় পটে ও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। দেশ-বিভাজন হয়েছে। বহু রক্ত ঝড়েছে। তাই সাম্প্রদায়িক কলহ সৃষ্টির অপচেষ্টা নিপাত যাক- এই হোক পত্যাশা। আর চান্দিনা মুক্ত দিবসে ওই প্রত্যাশা নিয়ে দল-মত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আরও একবার জেগে ওঠা প্রয়োজন। দিবসটি পালন করতে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা প্রয়োজন। বর্ণাঢ্য আয়োজনে চান্দিনা মুক্ত দিবস পালিত হবে এই আশার আলো জ্বলে উঠুক নতুন প্রজন্মের মাঝে।

লেখক:
মাসুমুর রহমান মাসুদ (সাংবাদিক)
বিএ (অনার্স), এম.এ (বাংলা)
প্রভাষক, লক্ষ্মীপুর আলিম মাদ্রাসা
কৈলাইন, চান্দিনা, কুমিল্লা।
E-mail: masud599@gmail.com

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply